News

তেহরান কখনো মাথা নোয়াবে না: জাতিসংঘে পেজেশকিয়ান

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে ইরান কখনো আত্মসমর্পণ করবে না বলে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তবে যুদ্ধের অবসানে কূটনীতির পথ খোলা রাখার কথাও বলেছেন তিনি।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও এপির খবরে বলা হয়েছে, জাতিসংঘে দেওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষণে ‘ইরানকে ধ্বংস করে দেওয়া’র হুমকির জবাবে তিনি এ কথা বলেন। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের উচ্চ পর্যায়ের বিতর্কে যোগ দিয়ে ইরানি প্রেসিডেন্ট ভাষণ দেন।

পেজেশকিয়ান বলেন, ‘তারা বুঝে গেছে, ইরানকে আত্মসমর্পণ করানো যায় না। ইরান কখনোই আগ্রাসী ছিল না, কখনো যুদ্ধ শুরু করেনি এবং আলোচনার টেবিলে বসার ব্যাপারে সবসময়ই তার প্রতিশ্রুতি দেখিয়েছে।’

ইরানের প্রেসিডেন্ট এ সময় দৃঢ় প্রত্যয় জানিয়ে বলেন, ‘আমরা কখনো মাথা নোয়াব না, হাঁটু গেড়ে বসব না।’

এর আগে ট্রাম্প মঙ্গলবার জাতিসংঘের ভাষণে ইরানের সঙ্গে চুক্তি না হলে দেশটিকে ‘ধ্বংস করে দেওয়া’র হুমকি দেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করাই যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা হয়। ট্রাম্প পরে সেই আলোচনাকে ‘খুব ভালো’ ও ‘ফলপ্রসূ’ বলে বর্ণনা করেন।

পরে বুধবার ভাষণের শুরুতেই পেজেশকিয়ান ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছবি তুলে ধরেন। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরুর প্রথম দিনেই তেহরানে হামলায় খামেনি নিহত হন। ওই হামলায় খামেনির পরিবারের কয়েকজন সদস্যও নিহত হন। পরে তাদের মরদেহসহ খামেনির পরিবারের সদস্যদের ছবি ইরানের রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে প্রকাশিত হয়।

জাতিসংঘে পেজেশকিয়ান আরও কয়েকটি ছবি দেখান, যার মধ্যে ইরানের হরমুজগান প্রদেশের মিনাব শহরের শাজারেহ তাইয়্যেবাহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলায় নিহত শিশুদের ছবিও ছিল। এসব ছবি দেখিয়ে তিনি যুদ্ধের বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরেন।

জাতিসংঘের ইরানবিষয়ক একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন জানিয়েছিল, ইরানের একটি স্কুল ও একটি ক্রীড়া স্থাপনায় দুটি সামরিক হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত থাকার ‘যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি’ রয়েছে এবং এসব হামলা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। পেজেশকিয়ান মিনাবের যে স্কুলে হামলার ছবি দেখান, জাতিসংঘ মিশনের উল্লেখ করা দুটি হামলার একটিতে স্কুলে হামলার কথাই বলা হয়েছে।

‘আমরা সন্ত্রাসবাদের শিকার’

পেজেশকিয়ান তার ভাষণের শুরুতেই ট্রাম্পের আগের দিনের বক্তব্যের প্রসঙ্গ তোলেন। ট্রাম্প জাতিসংঘে ইরানকে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত করে বক্তব্য দিয়েছিলেন।

এর জবাবে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘আমি গতকাল আপনাদের সামনে একটি ভাষণ দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আমাদের সন্ত্রাসী হিসেবে বর্ণনা করলেন। আমরা সন্ত্রাসবাদের শিকার।’

ইরান কখনো যুদ্ধ শুরু করেনি এবং চলমান সংঘাতে তারা আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করছে— ভাষণে এমন অবস্থানও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।

পারমাণবিক বোমা নয়, শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তির পক্ষে ইরান

পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও ইরানের অবস্থান স্পষ্ট করেন পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, ইরানের প্রয়োজন শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি, পারমাণবিক বোমা নয়। আমাদের দেশের জন্য শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি আমাদের অগ্রগতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমরা স্পষ্ট করে বলছি— পারমাণবিক অস্ত্র নয় এবং শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তির ওপর কোনো সীমাবদ্ধতাও নয়।’

ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার অন্যতম প্রধান বিরোধের জায়গা। ওয়াশিংটন তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার পাশাপাশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছেড়ে দেওয়ার দাবি করে আসছে। অন্যদিকে ইরান বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত এবং শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তির অধিকার তারা ছাড়বে না।

হরমুজ নিয়ে ইরানের শর্ত

ভাষণে কৌশলগত হরমুজ প্রণালির বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেন পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, ইরান চায় প্রণালির আশপাশে ‘শক্তিশালী প্রতিবেশী’ থাকুক। কিন্তু যারা ইরানের জন্য অনিরাপত্তা তৈরি করতে চায়, তাদের অবাধে এই জলপথ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া যায় না।

পেজেশকিয়ান বলেন, ‘এটা হতে পারে না যে সবাই হরমুজ প্রণালি থেকে সুবিধা নেবে, অথচ এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলে আমাদের বঞ্চিত করা হবে। শত্রুতাপূর্ণ নৌবহরের স্থায়ী মোতায়েন এবং যুদ্ধের বিস্তার শান্তি বয়ে আনবে না।’

যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের পরিবহন হরমুজ প্রণালি দিয়ে হতো। যুদ্ধ শুরুর পর বৈশ্বিক জ্বালানির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত এই প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেয় ইরান দেশটি সবশেষ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমালে এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ তুলে নিলে কয়েক দিনের মধ্যেই প্রণালিটি আবার খুলে দিতে পারে।

নিউইয়র্কে চলমান আলোচনায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ইরানের ওপর মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ কমানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কয়েক ঘণ্টা ধরে আলোচনা হওয়ার খবরও এসেছে।

source: Rajneete

Back to top button