জার্মানির রাজ্য নির্বাচনে কট্টরপন্থি এএফডির জয় কি ইউরোপের জন্য সতর্কবার্তা?

জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থি অলটারনেটিভ ফর জার্মানির (এএফডি) ঐতিহাসিক জয় শুধু দেশটির রাজনীতিতেই বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে না, বরং ইউরোপের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও তা হয়ে উঠেছে সতর্কবার্তা। ধীরগতির অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, অভিবাসন নিয়ে উদ্বেগ এবং প্রচলিত রাজনীতির প্রতি মানুষের হতাশা— যে বিষয়গুলো ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ডানপন্থি দলগুলোর উত্থান ঘটাচ্ছে, স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফলাফলেও তার প্রতিফলন দেখা গেছে।
রোববারের নির্বাচনে প্রায় ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রথম হয়েছে এএফডি। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ) পেয়েছে ১৭ শতাংশের সামান্য বেশি ভোট। ৮৩ আসনের পার্লামেন্টে ৩৯টি আসন পেয়ে এএফডি সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে মাত্র তিন আসন দূরে রয়েছে।
এই ফলাফল সিডিইউয়ের জন্য বড় ধাক্কা। ২০২১ সালের নির্বাচনে রাজ্যটিতে দলটি ৩৭ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছিল। মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে তা অর্ধেকেরও বেশি কমে যাওয়ায় মের্ৎসের নেতৃত্ব ও নীতির প্রতি ভোটারদের অসন্তোষের মাত্রা স্পষ্ট হয়েছে।
মের্ৎসের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা
নির্বাচনের আগে ইনফ্রাটেস্ট ডিম্যাপের জরিপে স্যাক্সনি-আনহাল্টের ৮৭ শতাংশ ভোটার মের্ৎস সরকারের কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছিলেন। আরেক জরিপে প্রায় অর্ধেক সিডিইউ সমর্থকসহ তিন-চতুর্থাংশ ভোটার মনে করেন, মের্ৎসের কর্মকাণ্ড দলটির নির্বাচনি ফল খারাপ করেছে।
নির্বাচনের পর সিডিইউর নির্বাহী বোর্ডের বৈঠকে মের্ৎস নিজেও ফলাফলকে দলের জন্য গভীর ধাক্কা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে এএফডির সঙ্গে সহযোগিতার সম্ভাবনা আবারও নাকচ করে দিয়েছেন তিনি।
এটাই এখন মের্ৎসের অন্যতম বড় রাজনৈতিক সমস্যা। এএফডি সবচেয়ে বড় দল হয়ে উঠলেও জার্মানির মূলধারার দলগুলো দলটির সঙ্গে জোট করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। ফলে বিপুল ভোট পেয়েও এএফডির সরকার গঠনের পথ কঠিন।
কিন্তু সরকার গঠন করতে না পারলেও নির্বাচনের ফলাফল এএফডিকে জার্মানির রাজনীতিতে আরও শক্তিশালী বিরোধী শক্তিতে পরিণত করেছে। দলটি এরই মধ্যে ২০২৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্যের কথা বলেছে।
কেন এএফডির দিকে ঝুঁকলেন ভোটাররা?
স্যাক্সনি-আনহাল্টের ভোটের পেছনে শুধু অভিবাসনবিরোধী মনোভাব কাজ করেছে— এমনটা মনে করছেন না বিশ্লেষকেরা। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক নিরাপত্তা, ইউরোপের যুদ্ধ এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ও ভোটারদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
জার্মানির অর্থনীতি কয়েক বছর ধরে স্থবিরতার সঙ্গে লড়ছে। উচ্চ জ্বালানি ব্যয় দেশটির শিল্প খাতের ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। ইউক্রেন ও ইরানের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতাও এএফডিকে মের্ৎস সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণের সুযোগ দিয়েছে।
দলটি দাবি করছে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে জার্মানির কঠোর অবস্থান এবং ইউক্রেনকে সমর্থন দেশটির জ্বালানি সংকটকে আরও বাড়িয়েছে। পূর্বাঞ্চলের ভোটারদের একটি অংশের মধ্যে এই যুক্তি যে প্রভাব ফেলেছে, নির্বাচনের ফলাফল তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এর সঙ্গে রয়েছে অভিবাসন প্রশ্ন। এএফডি কঠোর অভিবাসননীতি এবং ‘নিরাপদ, পুরোনো জার্মানি’ ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচারণা চালিয়েছে। দলের ৩৫ বছর বয়সী প্রার্থী উলরিশ জিগমুন্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে টিকটক ব্যবহার করে তরুণদের মধ্যেও ব্যাপক প্রচার চালান।
পূর্ব জার্মানির পুরোনো ক্ষত
স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফলাফলে জার্মানির পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজনের ছাপও রয়েছে। ১৯৯০ সালে দুই জার্মানি এক হওয়ার পর পূর্বাঞ্চলের অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। ব্যাপক কর্মসংস্থান হারায় অঞ্চলটি এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ পশ্চিমাঞ্চলে চলে যায়। গত কয়েক দশকে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হলেও পূর্বাঞ্চলের মানুষের মধ্যে পশ্চিম জার্মানির তুলনায় পিছিয়ে থাকার অনুভূতি পুরোপুরি দূর হয়নি।
তবে শুধু অর্থনৈতিক বঞ্চনাকে দায়ী করলেও পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। গত এক-দেড় দশকে স্যাক্সনি-আনহাল্টের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। রাসায়নিক শিল্প পুনর্গঠিত হয়েছে, লজিস্টিকস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো নতুন খাতও গড়ে উঠেছে। বেকারত্বের হারও জাতীয় গড়ের খুব বেশি ওপরে নয়।
তারপরও ভোটারদের বড় অংশ প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর বদলে এএফডিকে বেছে নিয়েছেন। অর্থাৎ সমস্যা শুধু অর্থনীতিতে নয়, প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকটও এখানে বড় ভূমিকা রাখছে।
ইউরোপের জন্য সতর্কবার্তা কেন?
স্যাক্সনি-আনহাল্টের ঘটনা জার্মানির সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা কম। কারণ ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশে প্রায় একই ধরনের রাজনৈতিক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
ফ্রান্সে আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডানপন্থি ন্যাশনাল র্যালির জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। দেশটির অর্থমন্ত্রী রোলাঁ লেসক্যুর স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফলকে ‘খুব, খুব উদ্বেগজনক সংকেত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষায়, বিশ্ব জুড়েই একটি ‘পপুলিস্ট ঢেউ’ তৈরি হচ্ছে।
জার্মানির মতো ইউরোপের সবচেয়ে বড় অর্থনীতিতেও যদি মূলধারার একটি ঐতিহ্যবাহী দল মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে অর্ধেকের বেশি ভোট হারায় এবং কট্টর ডানপন্থি দল প্রায় অর্ধেক ভোট পায়, তাহলে ইউরোপের অন্যান্য সরকারের জন্য এর বার্তা স্পষ্ট।
বার্লিনের ফ্রি ইউনিভার্সিটির রাজনৈতিক বিজ্ঞানী থর্স্টেন ফাসের মতে, এএফডি এখন এমন একটি দৃশ্যমান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যারা অন্য দলগুলোর তুলনায় নিজেদের বার্তা ভোটারদের কাছে অনেক বেশি কার্যকরভাবে পৌঁছে দিতে পারছে।
এটাই মের্ৎসের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন জার্মানির অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা খাতে বিপুল সরকারি বিনিয়োগের পরিকল্পনাও করেছেন। কিন্তু ভোটারদের বড় অংশ এখনো সেই পরিকল্পনার বাস্তব সুফল দেখতে পাচ্ছেন না।
ফলে স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচন মের্ৎসের জন্য শুধু একটি রাজ্য হারানোর প্রশ্ন নয়। এটি জার্মানির রাজনীতিতে মানুষের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার একটি বড় সংকেত।
আর ইউরোপের অন্য নেতাদের জন্য বার্তাটি আরও সরাসরি— অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও রাজনৈতিক হতাশার জায়গা যদি মূলধারার দলগুলো পূরণ করতে না পারে, সেই শূন্যস্থান দখল করতে প্রস্তুত কট্টর ডানপন্থিরা।
সূত্র: রয়টার্স, ডয়েচে ভেলে
source: Rajneete







