News

আলজাজিরার কলাম/শিক্ষিত-দক্ষ-উচ্চাকাঙ্ক্ষী? পাচারকারীরা আপনাকে খুঁজছে

ভালো বেতন। ভিসা স্পনসরশিপ। বিমানের টিকিটও দেওয়া হবে। আবেদনকারীদের শিক্ষিত হতে হবে, ইংরেজিতে সাবলীল হতে হবে এবং অনলাইনে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজ করতে জানতে হবে।

শুনতে তরুণ কোনো গ্র্যাজুয়েটের জন্য এটি দারুণ একটি সুযোগ মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এটি মানবপাচার চক্রের একটি ফাঁদ।

বিজ্ঞাপনে যে চাকরির কথা বলা হয়, সেটির কোনো অস্তিত্বই নেই। গন্তব্যে পৌঁছানোর পর চাকরিপ্রার্থীর পাসপোর্ট নিয়ে নেওয়া হয়। তাকে এমন একটি কম্পাউন্ডে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এরপর তাকে জোর করে অনলাইন প্রতারণায় যুক্ত করা হয়—অন্য মানুষের পরিচয় ধারণ করা, মিথ্যা সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থাকা মানুষকে অর্থ পাঠাতে প্ররোচিত করা।

যারা নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ করতে ব্যর্থ হয়, তাদের মারধর করা হতে পারে, না খাইয়ে রাখা হতে পারে কিংবা একাকী বন্দিত্বে রাখা হতে পারে। মুক্তিপণের টাকা জোগাড় করতে তাদের পরিবারকে জমি বিক্রি করতে হয় বা ঋণ নিতে হয়।

আরো পড়ুন

সম্প্রতি রুয়ান্ডা সফরের সময় আমি এই গল্পের বিভিন্ন দিক সরাসরি শুনেছি। সেখানে এমন দুইজন বেঁচে যাওয়া মানুষের সঙ্গে দেখা করেছি, যারা ভুয়া চাকরির প্রস্তাবের মাধ্যমে মানবপাচারের শিকার হয়েছিলেন। তারা ইংরেজিতে সাবলীল ছিলেন এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে স্বচ্ছন্দ ছিলেন। তারা অন্য লাখো তরুণের মতোই একটি ভালো চাকরি এবং উন্নত ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ খুঁজছিলেন।

আর এই গুণগুলোই তাদের পাচারকারীদের কাছে মূল্যবান করে তুলেছিল। তাদের স্ক্রিপ্ট দেওয়া হতো এবং জোর করে নারীদের পরিচয় ধারণ করতে বাধ্য করা হতো। এরপর ইউরোপের মানুষের সঙ্গে অনলাইনে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলে তাদের অর্থ পাঠাতে রাজি করানো হতো।

আজ তারা আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM)-এর সহায়তায় দেশে ফিরে এসেছেন এবং আমাদের সঙ্গে কাজ করে বিভিন্ন সম্প্রদায় ও তরুণদের সতর্ক করছেন। পাচারকারীরা যে একই প্ল্যাটফর্মগুলোতে নিয়োগের জন্য মানুষ খোঁজে, তারাও এখন সেসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অন্যদের বিপদ চিনতে সাহায্য করছেন।

তাদের অভিজ্ঞতা এমন এক অপরাধের চিত্র তুলে ধরে, যেখানে পর্দার দুই পাশেই মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একজন মানুষকে হুমকির মুখে আটকে রেখে প্রতারণা করতে বাধ্য করা হয়। আরেকজনের বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে তার সঞ্চয় হাতিয়ে নেওয়া হয়। অপরাধী চক্র উভয় দিক থেকেই লাভবান হয়।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে অন্তত ৩ লাখ মানুষকে স্ক্যাম কম্পাউন্ডে পাচার বা জোরপূর্বক আটকে রাখা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। অন্তত ৮০টি দেশ ও অঞ্চলের নাগরিকদের সেখানে পাওয়া গেছে।

এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ২০২৫ সালে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণায় আনুমানিক ৮৮ বিলিয়ন থেকে ১১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি হয়েছে। এই পরিসংখ্যানের মধ্যে সব ধরনের প্রতারণা রয়েছে, তবে এটি সেই অপরাধী অর্থনীতির ব্যাপকতা সম্পর্কে ধারণা দেয়, যার একটি অংশ হিসেবে এসব স্ক্যাম কম্পাউন্ড পরিচালিত হয়।

এই হুমকি এখন আফ্রিকাতেও আরও বিস্তৃত হচ্ছে। IOM এবং তাদের সরকারি অংশীদাররা ইথিওপিয়া, কেনিয়া, উগান্ডা ও তানজানিয়ার মতো দেশ থেকে ক্রমবর্ধমান সংখ্যক ভুক্তভোগী শনাক্ত করছেন। সম্প্রতি তানজানিয়া ও রুয়ান্ডা সফরের সময় দেশগুলোর নেতারা আমাকে জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে তরুণ গ্র্যাজুয়েট ও অন্যান্য চাকরিপ্রার্থীদের কাছে ভুয়া চাকরির প্রস্তাব পৌঁছে যাচ্ছে।

এই অপরাধী নেটওয়ার্কগুলো শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজ করার জন্য তৈরি। এক দেশে নিয়োগ, অন্য দেশ হয়ে যাত্রা এবং তৃতীয় কোনো দেশে শোষণ—এভাবেই পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হতে পারে। প্রতারণার শিকার হতে পারে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানুষ। কোনো একটি চক্রের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে সেটি অন্যত্র চলে যায় এবং আবার নতুন করে শুরু হয়।

সরকারগুলোর প্রতিক্রিয়া প্রায়ই বিচ্ছিন্ন থাকে। শ্রম কর্তৃপক্ষ দেখে অনিবন্ধিত কোনো নিয়োগদাতা বা রিক্রুটারকে। সীমান্ত কর্মকর্তারা দেখে সন্দেহজনক ভ্রমণ। পুলিশ দেখে অনলাইন প্রতারণা। কনস্যুলার কর্মকর্তারা দেখে বিদেশে আটকে পড়া নাগরিককে। আর পাচারকারীরা এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যকার সমন্বয়ের ঘাটতিকে কাজে লাগায়।

এই ফাঁকগুলো বন্ধ করতে হবে। বিদেশে চাকরির প্রস্তাব, নিয়োগদাতা, রিক্রুটার, চুক্তিপত্র ও ভিসা যাচাই করার জন্য সরকারকে নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। শ্রম, সীমান্ত, পুলিশ ও কনস্যুলার কর্তৃপক্ষকে দ্রুত সতর্কবার্তা বিনিময় করতে হবে এবং সমন্বিতভাবে অপরাধী নেটওয়ার্কগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত চালাতে হবে।

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং সেবা ও চাকরির প্ল্যাটফর্মগুলোতে প্রকাশ্যেই ভুয়া নিয়োগের বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন শনাক্ত করে সরিয়ে ফেলতে হবে, সহজে রিপোর্ট করার ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং অপরাধীদের শনাক্ত করতে সহায়ক প্রমাণ সংরক্ষণ করতে হবে। বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তৈরি সচেতনতামূলক প্রচারণাও একই প্ল্যাটফর্মে তরুণদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যারা জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণা চালাতে বাধ্য হয়েছেন, তাদের মানবপাচারের শিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কেউ কেউ এসব কম্পাউন্ড থেকে পালিয়ে আসার পরও অভিবাসন আইন লঙ্ঘন বা জোর করে করানো অপরাধের জন্য আটক কিংবা বিচারের মুখোমুখি হন। কোনো মানুষকে এমন কাজের জন্য শাস্তি দেওয়া উচিত নয়, যা তাকে মানবপাচারের শিকার হিসেবে হুমকি দিয়ে করতে বাধ্য করা হয়েছে।

২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত IOM দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জোরপূর্বক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার উদ্দেশ্যে পাচারের শিকার ৩৯টি দেশের ৩,৫০০-এর বেশি মানুষকে সহায়তা করেছে। বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের সুরক্ষা, চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা, নিরাপদে দেশে ফেরার ব্যবস্থা এবং নতুন করে জীবন গড়ে তোলার জন্য সহায়তা প্রয়োজন।

চাকরিপ্রার্থীরাও কিছু সতর্কতা অবলম্বন করতে পারেন। একজন বৈধ নিয়োগদাতার যাচাইযোগ্য ঠিকানা থাকা উচিত। চুক্তিপত্রে কাজের ধরন স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে এবং ভিসাটি যে চাকরির জন্য দেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। কোনো রিক্রুটারের উচিত নয় কাউকে দ্রুত ভ্রমণ করতে চাপ দেওয়া, চাকরির প্রস্তাব গোপন রাখতে বলা কিংবা পাসপোর্ট জমা দিতে বাধ্য করা।

কিন্তু নিখুঁতভাবে সাজানো প্রতারণার উদ্দেশ্যই হলো এগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা। অত্যাধুনিক আন্তর্জাতিক অপরাধী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পুরো দায় চাকরিপ্রার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না।

কেউ বিমানে ওঠার আগেই তার চাকরির প্রস্তাব যাচাই করার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা থাকতে হবে। মানবপাচারের সন্দেহ দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কোনো ভুক্তভোগী পালিয়ে এলে তাকে শাস্তি নয়, সুরক্ষা দিতে হবে।

অনেকের ক্ষেত্রে মানবপাচারের শুরু এখন একটি সাধারণ ফোনে আসা একটি সাধারণ বার্তা দিয়ে।

প্রত্যেক চাকরিপ্রার্থীর মনে যেন এই প্রশ্ন জাগে: এটি কি সত্যিই একটি চাকরি, নাকি কেউ আমাকে একটি ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করছে?


অ্যামি পোপ একজন আমেরিকান আইনজীবী ও কূটনীতিক, যিনি বর্তমানে জাতিসংঘের সংস্থা আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আওএম)-এর মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

source: Asia Post

Back to top button