ইরানের সঙ্গে সোমবার ফের আলোচনা, হামলা স্থগিত— জানালেন ট্রাম্প

ইরানের সঙ্গে সোমবার (৩ আগস্ট) নতুন করে আলোচনা শুরু হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই আলোচনার কারণেই আপাতত ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক হামলার পরিকল্পনা স্থগিত রাখা হয়েছে, যেন কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চলমান অচলাবস্থার সমাধান করা যায়।
অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে নতুন নৌ পথ নির্ধারণের বিষয়ে ওমানের সঙ্গে একটি সমঝোতার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে তারা। তবে তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, এমন কোনো সমঝোতা হলেও প্রণালিটি যুদ্ধ শুরুর আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না।
দ্য গার্ডিয়ান এবং বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও এএফপির খবরে বলা হয়েছে, ঘোষণাগুলো এমন সময়ে এলো, যখন হরমুজ প্রণালির কাছে একটি তেলবাহী জাহাজের পাশেই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, বিস্ফোরণের ঘটনায় জাহাজ ও এর নাবিকরা নিরাপদ থাকলেও ঘটনাটি প্রমাণ করছে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ এখনো অত্যন্ত অস্থিতিশীল।
এদিকে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক হামলার খবরের পর হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে ধীর হয়ে গেছে। তবে লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে হুতিদের হুমকি সত্ত্বেও সপ্তাহান্তে সৌদি আরবের তেলবাহী দুটি ট্যাংকার নিরাপদে অতিক্রম করেছে।
শনিবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ একটি সমঝোতা চূড়ান্ত করার জন্য সময় চেয়েছে। তার ভাষ্য, সেই সমঝোতা হলে হরমুজ প্রণালি ‘তাৎক্ষণিক, সম্পূর্ণ ও পুরোপুরি’ খুলে দেওয়া হবে।
একই সঙ্গে ‘ইরানের পারমাণবিক হুমকিরও অবসান’ ঘটবে উল্লেখ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, তেহরানকে দ্রুত এই চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে।
রোববার নিউ জার্সি থেকে ওয়াশিংটনে ফেরার পথে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প জানান, সোমবার বিকেলেই নতুন করে আলোচনা শুরু হবে। তবে বৈঠক কোথায় হবে কিংবা কারা এতে অংশ নেবেন— সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি।
সাংবাদিকরা তাকে জিজ্ঞাসা করেন, ইরানের সঙ্গে সমঝোতার জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে কি না। জবাবে ট্রাম্প কোনো সময়সীমা উল্লেখ করতে অস্বীকৃতি জানান। তবে বলেন, উপসাগরীয় ‘কয়েকটি মিত্র দেশের অনুরোধে’ তিনি ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলার নির্দেশ দেওয়া থেকে আপাতত বিরত থেকেছেন।
ট্রাম্প বলেন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের নেতারা তাকে সামরিক অভিযানের বদলে আলোচনার সুযোগ দিতে অনুরোধ করেছেন। বিশেষ করে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে ফোনালাপের কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, তিনি যুবরাজকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আপনারা কী চান? আমরা হামলা চালাই, নাকি না চালাই?’
ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, জবাবে সৌদি নেতৃত্ব জানিয়েছে, তারা সামরিক হামলার পরিবর্তে একটি সমঝোতাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়, কারণ নতুন হামলা পরিস্থিতিকে কোথায় নিয়ে যাবে, তা কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, হরমুজ প্রণালিতে নতুন নৌ পথ নির্ধারণে ওমানের সঙ্গে একটি সমঝোতার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে দুই দেশ।
তিনি বলেন, দুই দেশের সার্বভৌম অধিকার, জাতীয় স্বার্থ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এমন একটি গ্রহণযোগ্য রুট নিয়ে সমঝোতা হতে যাচ্ছে। এটি বর্তমান উত্তর বা দক্ষিণের রুটের কোনোটি হবে না, বরং উভয় পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য একটি নতুন পথ হবে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই মুখপাত্র আরও স্পষ্ট করে দেন, এই সমঝোতা মানেই হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়া নয়। তিনি বলেন, ‘২৮ ফেব্রুয়ারির আগে যে অবস্থা ছিল, কোনোভাবেই আমরা সেখানে ফিরে যাচ্ছি না।’
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ওমানের সঙ্গে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং খুব শিগগিরই তা সম্পন্ন হতে পারে। তবে ওমান সরকার এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সর্বশেষ অবস্থান তার সাম্প্রতিক নীতিরই ধারাবাহিকতা। গত কয়েক মাসে তিনি একাধিকবার ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছেন, কিন্তু শেষ মুহূর্তে আলোচনার জন্য অতিরিক্ত সময় দিয়েছেন। এখনো পর্যন্ত সেই আলোচনাগুলো কোনো পূর্ণাঙ্গ সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি।
চলমান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন হতো। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে।
তবে ট্রাম্প আলোচনার ঘোষণা দেওয়ার পর বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। সোমবার এশিয়ার বাজারে লেনদেন শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৪ শতাংশের বেশি কমে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮৩ ডলারে নেমে আসে।
ট্রাম্প বরাবরই দাবি করে আসছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখাই তার প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য। তার মতে, সে লক্ষ্য অর্জনের জন্য সাময়িকভাবে জ্বালানির দাম বাড়লেও তা মেনে নেওয়া উচিত। তবে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির উচ্চমূল্য তার ওপর রাজনৈতিক চাপও বাড়িয়ে তুলেছে, ফলে কূটনৈতিক সমাধান এখন তাঁর প্রশাসনের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কূটনৈতিক তৎপরতাও সমান্তরালে চলছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান ও পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে পৃথক টেলিফোনে পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
অন্যদিকে ইসরায়েলের জ্বালানিমন্ত্রী এলি কোহেন বলেছেন, গোটা অঞ্চল জুড়ে যা কিছু ঘটছে, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সমন্বয় রয়েছে। ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হোক বা না হোক, যদি তেহরান আবার পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত করার বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে ইসরায়েল সামরিক পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করবে না বলে জানান তিনি।
এর আগে গত মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বৈঠকেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। বৈঠক শেষে এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানান, কূটনীতি, অর্থনৈতিক চাপ ও সামরিক পদক্ষেপ— সব ধরনের বিকল্পই সেখানে আলোচনা হয়েছে।
তেহরান অবশ্য বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির উদ্দেশ্য সামরিক নয় এবং তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না।
source: Rajneete







