সমুদ্রের ঢেউয়ে শিশুকে রেখে রিল বানাচ্ছিল দম্পতি, ভাইরাল সেই ভিডিও’র ব্যাখ্যা দিল বাবা

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ঢেউয়ের ধাক্কায় চার বছরের এক শিশুর পানিতে পড়ে যাওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে শিশুটির পাশে এক দম্পতিকে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করতে দেখা যায়। এ নিয়ে শিশুর নিরাপত্তা ও অভিভাবকদের দায়িত্ববোধ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
ভিডিওতে থাকা শিশুটির বাবা রিপন হোসাইন এশিয়া পোস্টের প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে দাবি করেছেন, ঘটনাটি প্রায় এক মাস আগের। তারা সৈকতের কিনারার কাছেই ছিলেন। হঠাৎ ঢেউয়ের ধাক্কায় তার মেয়ে পানিতে পড়ে যায়। পরে সেখানে উপস্থিত এক ব্যক্তি শিশুটিকে উদ্ধার করেন।
রিপন হোসাইন ও তার স্ত্রী নুপুর খাতুনের বাড়ি রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের পাটবাড়ীয়া পোস্টের মহিষলুটিয়া গ্রামে। তাদের চার বছর বয়সি মেয়ের নাম রাইসা জান্নাত রাকা।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
রিপন হোসাইন এশিয়া পোস্টকে জানান, গত ২২ সেপ্টেম্বর ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের একটি শিক্ষা সফরে তারা কক্সবাজারে যান। সেখানে সমুদ্রসৈকতের কিনারার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে টিকটকের জন্য ভিডিও ধারণ করছিলেন। তাদের সঙ্গে ছিল মেয়ে রাকা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, সমুদ্রের পানির কাছাকাছি দাঁড়িয়ে এক নারী ও এক পুরুষ সেলফি স্টিক দিয়ে ভিডিও ধারণ করছেন। তাদের কাছেই থাকা শিশুটি ঢেউয়ের ধাক্কায় পানিতে পড়ে যায়। পরে এক ব্যক্তিকে এগিয়ে এসে শিশুটিকে উদ্ধার করতে দেখা যায়।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে শিশুটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ভিডিও ধারণে মনোযোগী থাকার কারণে শিশুটির প্রতি যথেষ্ট নজর রাখা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন কেউ কেউ।
যা বলছেন শিশুটির বাবা
রিপন হোসাইনের ভাষ্য, তারা সমুদ্রের গভীরে যাননি; সৈকতের কিনারার কাছেই ভিডিও করছিলেন। একপর্যায়ে তার স্ত্রী নুপুর খাতুনের হাত থেকে মেয়ের হাত ছুটে যায়। বিষয়টি তিনি দেখতে পান। এর মধ্যেই হঠাৎ একটি ঢেউ এসে মেয়েকে ধাক্কা দেয়। পরে সেখানে উপস্থিত এক ব্যক্তি এগিয়ে এসে রাকাকে পানি থেকে তুলে আনেন। রিপনের দাবি, এরপর তিনি ভিডিও ধারণ বন্ধ করে মেয়ের কাছে যান।

তিনি আরও জানান, ঘটনার পর তার মেয়ের কোনো শারীরিক সমস্যা হয়নি। শিশুটি বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
এক মাস আগের ভিডিও নিয়ে ক্ষোভ
রিপন হোসাইনের অভিযোগ, ঘটনাটি প্রায় এক মাস আগের হলেও সম্প্রতি ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এরপর তাদের নিয়ে নানা ধরনের সমালোচনা হচ্ছে। ঘটনার প্রেক্ষাপট বিবেচনা না করে তাদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে বলেও দাবি তার। রিপনের ভাষ্য, ঘটনাটি আকস্মিকভাবে ঘটেছিল। ঢেউয়ের ধাক্কায় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হলে এক ব্যক্তি এগিয়ে এসে শিশুটিকে উদ্ধার করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে আলোচনা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) মরিয়ম নামের এক ব্যবহারকারী ভিডিওটি প্রকাশ করেন। তার দাবি, স্বামীর সঙ্গে সমুদ্রসৈকতে যাওয়ার সময় তিনি ঘটনাটি দেখেছেন। ওই ব্যবহারকারীর অভিযোগ, দম্পতি রিল তৈরিতে এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে শিশুটির বিপদের বিষয়টি খেয়াল করেননি।
ভিডিওটি প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য কনটেন্ট তৈরিতে অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার বক্তব্য, রিল তৈরি কি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে যে মা-বাবাও সন্তানের নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষা করছেন?
ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি গত ২০ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ভিডিওটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার কথা তুলে ধরে। প্রতিবেদনে বলা হয়, অনেক ব্যবহারকারী শিশুটির নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার না দেওয়ার অভিযোগে দম্পতির সমালোচনা করেছেন। কেউ কেউ ভিডিওটি সাজানো কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তবে ভিডিওটির সত্যতা কিংবা ঘটনার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি এনডিটিভি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসেও গত ২০ অক্টোবর ভিডিওটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া এবং শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্কের বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
সমুদ্রসৈকতে ঢেউয়ের গতি ও শক্তি মুহূর্তেই পরিবর্তিত হতে পারে। পানির কিনারায় থাকা ছোট শিশুর জন্যও পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তাই শিশুদের নিয়ে সমুদ্রসৈকতে গেলে অভিভাবকদের সার্বক্ষণিক সতর্ক থাকা এবং শিশুর প্রতি নিবিড় নজর রাখা জরুরি।
একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে ঘটনার সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট যাচাই না করে কাউকে দোষারোপ করাও উচিত নয়। এই ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য কনটেন্ট তৈরির সময় শিশুদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার গুরুত্ব আবারও সামনে এনেছে।
source: Asia Post






