News

ইউরোপে ‘শরতের বিক্ষোভ’ কি সত্যিই আনবে রাজনৈতিক পরিবর্তন?

ফ্রান্সে স্কুলের প্রবেশপথে সারি করে রাখা ময়লার বিনগুলোই প্রথম জানান দিয়েছিল, শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং শিক্ষকের সংকট নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ কতটা গভীর। স্পেনে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকা তাঁবুর ক্যাম্পটি জানান দিচ্ছিল আবাসন ব্যয় আকাশছোঁয়া হয়ে ওঠায় বাসিন্দাদের ক্ষোভের মাত্রা।

এরপর একই ধরনের দৃশ্য দেখা গেছে বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালেও। আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় সংঘর্ষ পর্যন্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে ইউরোপ জুড়ে যেন শরতের এক বিক্ষোভমুখর সময়ের ইঙ্গিত মিলছে।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সংবাদমাধ্যমের বড় অংশের মনোযোগ ছিল ফ্রান্স ও ইতালির বিক্ষোভের প্রান্তে ঘটে যাওয়া সহিংসতার দিকে। কিন্তু বিক্ষোভগুলোর মূল চিত্রটি বলছে ভিন্ন কথা। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন কারণে শুরু হওয়া এসব আন্দোলনের পেছনে রয়েছে একটি অভিন্ন সংকটের প্রতিক্রিয়া— বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বাড়তে থাকা এই ধারণা যে সাশ্রয়ী আবাসন, সামাজিক সমতা ও কার্যকর সরকারি সেবা নিশ্চিত করতে সরকারগুলো হয় অক্ষম, অথবা অনিচ্ছুক।

‘আজ ফ্রান্সসহ পুরো ইউরোপে ক্ষুব্ধ তরুণদের কাছ থেকে এটি সবচেয়ে শক্তিশালী সতর্কবার্তা,’— বলেন নীতিবিশ্লেষক আলবের্তো আলেমান্নো।

তবে তার এই ব্যাখ্যার সঙ্গে তীব্রভাবে সাংঘর্ষিক অবস্থান নিয়েছে ইউরোপের বিভিন্ন ডানপন্থি ও উগ্র ডানপন্থি মহল। ফ্রান্স ও ইতালির বিক্ষোভে ঘটে যাওয়া সহিংসতাকে তারা অভিবাসনের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছে, যদিও এর পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। একই সঙ্গে তারা বিক্ষোভকারীদের মূল দাবিগুলোকে আড়াল করে রাখছে।

ফ্রান্সের কর্মকর্তারাও সহিংসতার সঙ্গে অভিবাসনের কোনো যোগসূত্রের কথা নাকচ করেছেন। দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ রোববার বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণহীন সহিংসতা’ চালিয়েছে ফরাসিরাই।

প্যারিসের এইচইসি বিজনেস স্কুলের ইউরোপীয় ইউনিয়ন আইনের অধ্যাপক আলেমান্নো বলেন, গত কয়েক দিনে ডানপন্থি ও বিদেশিবিদ্বেষী বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম থেকে তিনি নজিরবিহীনসংখ্যক ফোন পেয়েছেন। তাদের অনেকেরই লক্ষ্য ছিল বিক্ষোভকে কোনো ধরনের ‘প্যান-ইউরোপীয় বিদ্রোহ’ হিসেবে তুলে ধরা।

আলেমান্নোর মতে, এটি একটি বিভ্রান্তিকর বয়ান। চলতি সপ্তাহে তিনি লিখেছেন, ‘বিক্ষোভগুলোর কারণ ভিন্ন এবং এগুলোর রাজনৈতিক লক্ষ্যও এক নয়। কিন্তু এত দ্রুত এগুলোর ছড়িয়ে পড়া একটি অভিন্ন দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়— অনেক তরুণ ইউরোপীয় মনে করেন, বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রত্যাশিত নিরাপত্তা, সুযোগ এবং নিজেদের কথা বলার অধিকার নিশ্চিত করতে পারছে না।’

ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের প্যারিস কার্যালয়ের প্রধান সেলিয়া বেলিনও মনে করেন, ফ্রান্সে তরুণদের এই হতাশা আরও গভীর হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তার কোনো উত্তর সরকারের কাছে নেই।’ এর কারণ হিসেবে তিনি দেশটির বড় বাজেট ঘাটতি ও ঋণ-জিডিপি অনুপাতের কারণে সরকারের আর্থিক সংকট এবং অচল সংসদের কারণে রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেন।

‘মূলত সরকারের উত্তর হলো— টাকা নেই, কিছু করারও নেই। আর এটাই বড় সমস্যা,’— বলেন বেলিন।

ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় ট্রেড ইউনিয়নগুলোর একটি সিজিটির মহাসচিব সোফি বিনে শনিবারের বিক্ষোভের পর একই ধরনের কথা বলেছেন। ওই বিক্ষোভে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি সেবার অবনতির প্রতিবাদে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিল।

বিনে বিক্ষোভের সহিংসতার নিন্দা করলেও বলেন, আন্দোলন দমনে সরকারের সামনে খুব বেশি বিকল্প ছিল না। তিনি বলেন, ‘আজকের এই গণসমাবেশ ক্ষোভের গভীরতা নিশ্চিত করেছে। এই সংকট থেকে বের হওয়ার একটাই পথ— দাবিগুলোর জবাব দেওয়া।’

আলবেনিয়াতেও গত এক সপ্তাহ ধরে বড় ধরনের ছাত্রবিক্ষোভ চলছে। শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবারের সমর্থনে একটি রিসোর্ট নির্মাণের প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ শুরু হলেও পরে তা আরও বিস্তৃত হয়েছে।

মিলানে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন মানুষ। শহরটির গভীর অর্থনৈতিক বৈষম্যও এতে সামনে এসেছে। ধারণা করা হয়, মিলানের প্রতি ১২ জন বাসিন্দার একজনই কোটিপতি।

পর্তুগালের রাজধানী লিসবনের রসিও স্কয়ারে শনিবার আবাসন অধিকারকর্মীরা তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান নেন। তাদের চারপাশে টাঙানো ছিল— ‘গৃহহীন প্রজন্ম’ এবং ‘আমি শুধু থাকার মতো একটি বাড়ি চাই’— এমন স্লোগানের ব্যানার। যত দিন সম্ভব সেখানে অবস্থান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পোর্তোতেও একই ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে। আবাসনের দাম বেড়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে সেখানকার বাসিন্দারা আন্দোলনে নেমেছেন। ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে শহরটির আবাসনের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় বৃদ্ধির প্রায় দ্বিগুণ গতিতে।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়া গ্রুপের ইউরোপবিষয়ক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজতবা রহমান বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো কোনো একক, সমন্বিত ইউরোপীয় আন্দোলনের বহির্প্রকাশ নয়। বরং ভিন্ন ভিন্ন দেশে চলমান আলাদা আন্দোলনগুলো একই সময়ে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

মুজতবা রহমানের ভাষায়, এটি ‘স্বতন্ত্র জাতীয় বিক্ষোভ আন্দোলনগুলোর মধ্যে এক ধরনের সাদৃশ্য।’ প্রতিটি আন্দোলনের পেছনে রয়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে আলাদা কারণ।

তবে এসব আন্দোলনের মধ্যে যে বিষয়টি যোগসূত্র তৈরি করেছে তা হলো— বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই ধারণা বাড়ছে যে ইউরোপের সরকারগুলো সাশ্রয়ী আবাসন, কার্যকর সরকারি সেবা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না।

মজতবা রহমান বলেন, জনসাধারণের প্রত্যাশা এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। রাজনৈতিক দাবি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার এই অমিল সময়ের সঙ্গে থেকে যাবে এবং আরও বাড়তে পারে। ফলে মধ্যমেয়াদে আরও অসন্তোষ ও বিক্ষোভের সম্ভাবনা রয়েছে।

স্পেনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্যারিস স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের ডিন আরানচা গনজালেস এ মাসে স্পেনের আবাসনবিরোধী বিক্ষোভ ও ফ্রান্সের স্কুলশিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে মিল নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আরও এক ধাপ এগিয়েছেন।

ইতালির সংবাদপত্র কোরিয়েরে দেলা সেরাকে গনজালেস বলেন, ‘কারণগুলো ভিন্ন, কিন্তু স্ফুলিঙ্গ একই— সামাজিক চুক্তির ভেঙে পড়া।’

‘তরুণ ফরাসিরা শিক্ষা নিয়ে, তরুণ স্প্যানিশরা আবাসন নিয়ে বিক্ষোভ করছে। কিন্তু ইউরোপজুড়ে মানুষের সেই বিশ্বাস ভেঙে গেছে যে অর্থনীতি তাদের কল্যাণ ও সামাজিক সমতা নিশ্চিত করবে,’— বলেন গনজালেস।

পর্তুগালে আবাসন আন্দোলনকারীদের তাঁবু মঙ্গলবার সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর পরই আরও বড় আবাসনবিরোধী বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছে। আগামী কয়েক দিনে ফ্রান্স, স্পেন ও ইতালিতেও নতুন বিক্ষোভের আহ্বান শোনা যাচ্ছে।

আলেমান্নোর মতে, ইউরোপের সরকারগুলোর সামনে এখন বিশাল চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, ‘তাদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের সুরক্ষা দিতে হবে, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং একই সঙ্গে মূল সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হবে— আবাসন ব্যয়, অনিরাপদ কর্মসংস্থান, চাপের মুখে থাকা সরকারি সেবা থেকে শুরু করে প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা পর্যন্ত।’

‘ইউরোপের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা জোরালোভাবে বিশৃঙ্খলার নিন্দা করেছে, তা দিয়ে নয়; বরং তারা প্রজন্মের ক্ষোভকে বাস্তব রাজনৈতিক পরিবর্তনে রূপ দিতে পেরেছে কি না, তা দিয়েই তাদের শেষ পর্যন্ত বিচার করা হবে,’— বলেন আলেমান্নো।

গার্ডিয়ান অবলম্বনে

source: Rajneete

Back to top button