News

২৫০ ব্যক্তিকে গুমের অভিযোগে প্রস্তুত হচ্ছে মামলা

আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলের বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়ার পর আর হদিস নেই—এমন আড়াইশ অভিযোগের ভিত্তিতে একটি মামলা প্রস্তুত করা হচ্ছে। এসব অভিযোগের মধ্যে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমের গুমের ঘটনাও রয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয় জানিয়েছে, আড়াইশ অভিযোগ তদন্তের জন্য গুম বিশেষজ্ঞ পাঁচজন তদন্তকারী কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি তদন্তদল গঠন করা হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম নিজে এই তদন্তদলের তত্ত্বাবধান করছেন। আগামী মাসের (সেপ্টেম্বর) মধ্যে তদন্ত শেষ করে ট্রাইব্যুনালে ‘আনুষ্ঠানিক অভিযোগ’ দাখিলের চেষ্টায় আছে প্রসিকিউশন।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ গুমসংক্রান্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের তিনটি মামলা বিচারাধীন।

আড়াইশ গুম গুম অভিযোগের (মিস কেস বা বিবিধ মামলা) মামলাটি নিয়ে তদন্ত পর্যায়ে আছে ১১টি মামলা। অচিরেই এসব মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়।

‘গুম’ যেভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধ

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করে। এর মধ্যে ৯২টি অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিদ্যমান আইনে সংশোধন আনা হয়।

সম্পূর্ণ নতুন অধ্যাদেশ জারি করা হয় ৩৮টি। আর পূর্ববর্তী আইন রহিত করে তিনটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ওই বছর ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে তিনবার সংশোধন আনে অন্তর্বর্তী সরকার। তিনটি সংশোধনই অধ্যাদেশ আকারে জারি করা হয়, যা পরে আইনে পরিণত হয়। ২০২৪ সালের ২৫ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে প্রথম সংশোধন এনে অধ্যাদেশের গেজেট জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার।

ওই সংশোধনীতে অপহরণ, দাসত্ব, আটক, নির্যাতন, জোরপূর্বক নির্বাসন, যৌন নিপীড়ন, জোরপূর্বক গুম, মানবপাচার, যৌন দাসত্ব, জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তি, গর্ভধারণ, বন্ধ্যত্বকরণকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে যুক্ত করে সরকার। আন্তর্জাতিক রোম সংবিধি সনদ অনুসারে এই অপরাধকে সংজ্ঞায়িত করা হয় অধ্যাদেশে। ২০১৩ সালের ২৩ মার্চ বাংলাদেশ রোম সংবিধি সনদে স্বাক্ষর করে এসব অপরাধকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে।

অধ্যাদেশে বলা হয়, কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ, সংগঠন বা সংস্থার কোনো সদস্য, যেকোনো শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনী, সহায়ক বাহিনী বা গোয়েন্দা সংস্থা, যারা বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ভেতরে বা বাইরে এসব অপরাধ করবে তাদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি দিতে পারবেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এই সংশোধনীর পরই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে ও তদন্ত সংস্থায় একের পর এক গুমের অভিযোগ আসতে শুরু করে।

ব্যাপক মাত্রায় পদ্ধতিগত গুমের বিচার ট্রাইব্যুনালে

সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে গুমের বিচার নিয়ে ৪ ধারায় বলা হয়েছে, তবে শর্ত থাকে যে, ব্যাপক (ওয়াইডস্প্রেড) বা পরিকল্পিত পদ্ধতিতে (সিস্টেমেটিক) সংঘটিত কোনো গুম এই আইনের অধীন ‘গুম’ হিসাবে গণ্য হইবে না; উহা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীন মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসাবে গণ্য হইবে এবং উক্ত আইনের অধীনে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার্য হইবে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, খসড়া আইনটি বিল আকারে আগামী সংসদে উত্থাপিত হবে বলে আমরা মাননীয় আইনমন্ত্রী মাধ্যমে জানতে পেরেছি।

ঠিক কতগুলো অভিযোগ জমা পড়েছে, সে বিষয়ে ঠিকঠাক তথ্য দিতে না পারলেও চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত প্রায় ৩০০ গুমের অভিযোগ জমা পড়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, আমাদের কাছে অনেক গুমের অভিযোগ আছে। আমরা প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনটিকে মাথায় রেখে আপাতত আড়াইশ ব্যক্তি, যাদের ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে গুম করা হয়েছে, এখন পর্যন্ত হদিস নেই, এমন অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করছি। এই আড়াইশ অভিযোগ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রতিটা গুম পদ্ধতিগতভাবে এক। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পরিচয়ে অথবা সাদা পোশাকে হয় বাড়ি থেকে মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়া হয়েছে, অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, পরে তাদের আর সন্ধান পাওয়া যায়নি। আর এসব গুম সারা দেশে ব্যাপক মাত্রায় সংঘটিত হয়েছে। ফলে এই গুমগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছি আমরা।

অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ২৫০ গুমের তদন্ত হচ্ছে

যে আড়াইশ অভিযোগ নিয়ে তদন্ত হচ্ছে, এসব অভিযোগের দেড় শ অভিযোগই এসেছে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গঠিত মানবাধিকার সংগঠন ‘মায়ের ডাক’ থেকে। ৬০টি অভিযোগ এসেছে ‘আমরা গুম পরিবার’ থেকে। বাকি ৪০টি অভিযোগ বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তির কাছ থেকে এসেছে বলে জানিয়েছে চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়।

এসব অভিযোগ তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ইনভেস্টিগেশন করছি। ইনভেস্টিগেশনের মধ্যে এরই মধ্যে আমরা যেটা করেছি, সেটা হচ্ছে—এই আড়াইশ ব্যক্তির কাকে কোথা থেকে কত তারিখে কিভাবে নিয়ে গেছে। এই বিষয়গুলো আমরা এরই মধ্যে চিহ্নিত করেছি। আমরা তাদের ফটোগ্রাফ সংগ্রহ করেছি। তাদের পরিবারের বক্তব্য আমরা শুনেছি। অনেকের বক্তব্য রেকর্ড করা হয়েছে। আলামত হিসেবে সিসি ক্যামেরা ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে।

আড়াইশ ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গণশুনানি হবে। এরই অংশ হিসেবে গত ২৫ আগস্ট গুম হওয়া ৬০ জনের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। আগামী ৬ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টায় ফের বৈঠক হবে বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর।

সেপ্টেম্বরে আসতে পারে তদন্ত প্রতিবেদন

তদন্তের অগ্রগতি তুলে ধরে আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তারা (আড়াইশ ব্যক্তি) গুমের শিকার হয়েছেন। ফলে সময়সাপেক্ষ তদন্তের ব্যাপার। তা ছাড়া তখনকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অপহরণের পর কিছু কিছু তথ্য-প্রমাণ অসাবধানতাবশত রেখে গেছে। এগুলো আমরা সংগ্রহ করছি। তদন্তে নেমে আমাদের সিডিআর (কল ডিটেইল রেকর্ড), ভিডিও ফুটেজ, ডিজিটাল অ্যাভিডেন্সের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, যাই হোক, গুম বিশেষজ্ঞ পাঁচজন বিশেষজ্ঞ ইনভেস্টিগেটিং অফিসার এ বিষয়ে কাজ করছেন। আমিসহ বেশ কয়েকজন প্রসিকিউটর এই ইনভেস্টিগেশনটা সরাসরি তত্ত্বাবধান করছি। এক সপ্তাহ পর পর আমরা বসছি। তদন্তের সব কাজ শেষ হলে মনে করছি আগামী এক মাসের মধ্যে অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করে মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দেওয়ার চেষ্টা করব।

এই মামলায় আড়াইশ ঘটনায় আড়াইশ অভিযোগ হতে পারে জানিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আমরা চেষ্টা করছি প্রত্যেক পরিবারের জন্য আলাদা চার্জ রাখতে। কিন্তু ট্রায়াল (বিচার) হবে এক সঙ্গে। আমরা মনে করি, আলাদা অভিযোগ গঠন করে বিচারের চেয়ে এক সঙ্গে বিচার হওয়াটা ভালো। এতে যেমন সময় বাঁচবে, তেমনি একটা বিচারের মধ্য দিয়ে সবার বিচারটা হয়ে যাবে। এমনটা হলে তা হবে এক ঐতিহাসিক মামলা।

তিন মামলায় বিচার চলছে

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমসংক্রান্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের তিনটি মামলার বিচার চলছে। তিনটি মামলাই ট্রাইব্যুনাল-১-এ বিচারাধীন। এর মধ্যে রয়েছে আওয়ামী লীগের শাসনামলে ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিতি পাওয়া প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) গোপন বন্দিশালা ‘জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার (জেআইসি)’ এবং র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে বিভিন্ন ব্যক্তিকে গুম-নির্যাতনের ঘটনার দুটি মামলা।

‘টিএফআই সেল’ মামলা হিসেবে পরিচিতি পাওয়া মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট আসামি ১৭ জন। এই ১৭ আসামির মধ্যে বর্তমানে কর্মরত ১০ জন সেনা কর্মকর্তাও আছেন। যারা অপরাধ সংঘটনের সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নে (র‌্যাব) ছিলেন। তাদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে রাখা হয়েছে। বাকিদের পলাতক দেখিয়ে বিচার চলছে। গত বছর ২৩ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে মামলার বিচার শুরু হয়। মামলাটিতে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। এ পর্যন্ত সাতজন সাক্ষী এ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন। আগামী ৩১ আগস্ট পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ রয়েছে।

‘জেআইসি মামলা’ মামলা হিসেবে পরিচিত মামলাতেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। আসামিদের মধ্যে সেনাবাহিনীর সাবেক ও বর্তমান ১২ জন সেনা কর্মকর্তা রয়েছেন। আসামিদের মধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে রাখা হয়েছে।

তারা হলেন—ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক (সিটিআইবি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিক, সাবেক পরিচালক (সিটিআইবি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভীর মাজাহার সিদ্দিক ও সাবেক পরিচালক (সিটিআইবি) মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন। গত বছর ১৮ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে মামলার বিচার শুরু হয়। এ পর্যন্ত সাতজনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে। আগামী ৩১ আগস্ট এ মামলায় পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য আছে।

বিচারাধীন অন্য মামলাটি সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগের শাসনামলে শতাধিক ব্যক্তিকে গুম ও হত্যার অভিযোগ রয়েছে এ মামলায়। এ মামলায় এ পর্যন্ত ৯ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। এ মামলারও পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণ ৩১ আগস্ট।

তদন্তে আরও ১০ মামলা

চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয় জানিয়েছে, ব্যাপক মাত্রায় ও পদ্ধতিগত গুমের অভিযোগের আরো ১০ মামলার তদন্ত চলছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর অধীনে তদন্ত চলছে সাতটি মামলার। বাকি তিনটি মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর অধীনে তদন্ত হচ্ছে। এসব মামলায় মোট আসামি ২২ জন। সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানকে তিন মামলায় আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া গ্রেপ্তার আছেন আরো আট আসামি। গ্রেপ্তার অন্য আসামিরা হলেন—র‌্যাব-১০-এর সাবেক কম্পানি কমান্ডার মো. মহিউদ্দিন ফারুকী, সাবেক র‌্যাব কর্মকর্তা মো. সোহাইল, মো. ফজলুর রহমান, কর্নেল আব্দুল্লাহ আল নোমান, সাবেক সেনা কর্মকর্তা শেখ মামুন খালেদ, সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা রিফাত নিলয় জোয়ারদার।

সূত্র: কালের কণ্ঠ

source: Asia Post

আরো দেখুন
Close
Back to top button