News

নেপালে উদ্ধার স্থগিত— কারিগরি সহায়তার আহ্বান, পুনর্গঠনে লাগবে ৫০০ কোটি ডলার

বৈরী আবহাওয়ার কারণে নেপালে উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। ভয়াবহ বন্যা-ভূমিধসে তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর উদ্ধার ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় বিদেশি কারিগরি সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে দেশটি।

একই সঙ্গে বন্যায় ধ্বংস হওয়া অবকাঠামো পুনর্গঠনে ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন (৪০০-৫০০ কোটি) ডলার প্রয়োজন হতে পারে বলে জানিয়েছেন নেপালের অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তিনি বলেছেন, এটি প্রাথমিক হিসাব। ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসানের প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণে এখনো কাজ চলছে।

ত্রিশূলীতে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এক ব্যক্তি। ২৯ আগস্ট ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

ত্রিশূলীতে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এক ব্যক্তি। ২৯ আগস্ট ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

হিমবাহ ধসে সৃষ্ট বিশাল পানির ঢল গত বুধবার পাহাড়ি নদীগুলো দিয়ে পাথর, বরফ, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ নিয়ে দ্রুতগতিতে নেমে আসে। এতে নেপালে অন্তত ৬২৬ জন এবং চীনের তিব্বতে সাতজন নিহত হয়েছেন। পানির তোড়ে ভবন, সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ পথে থাকা বিভিন্ন স্থাপনা ভেসে গেছে।

এখনো প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে নেপালে প্রায় ২ হাজার ৪২৬ জন এবং তিব্বতের গিয়েরং কাউন্টিতে অন্তত ৫৫৪ জন রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৫৪০ জন বিদেশি নাগরিক। তাদের অনেকেই ভারতের হিন্দু তীর্থযাত্রী।

পচে যাওয়া মরদেহ দাফনের সিদ্ধান্ত

বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নেপালের রাসুয়া জেলার শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা নরেন্দ্র পারিয়ার রয়টার্সকে বলেন, বৃষ্টি ও কুয়াশার কারণে শনিবার উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, উদ্ধার হওয়া তীর্থযাত্রীদের সড়কপথে রাজধানী কাঠমান্ডুতে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করাই এখন প্রধান লক্ষ্য।

বন্যার তিন দিন পরও কিছু মরদেহ উদ্ধার করা হচ্ছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এরই মধ্যে কিছু মরদেহ এতটাই পচে গেছে যে সেগুলো শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মহামারি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে এসব মরদেহ দাফন করা হবে।

নুয়াকোটের দেবীঘাটে ক্ষতিগ্রস্ত একটি বাড়ির পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক ব্যক্তি। ২৯ আগস্ট ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

নুয়াকোটের দেবীঘাটে ক্ষতিগ্রস্ত একটি বাড়ির পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক ব্যক্তি। ২৯ আগস্ট ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

চিতওয়ান জেলা প্রশাসন এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, মরদেহগুলোর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হবে। এরপর খোলা জায়গায় সেগুলো দাফন করা হবে।

রাজধানী কাঠমান্ডুতে নিখোঁজ স্বজনদের পরিবারের সদস্যরা মহারাজগঞ্জ মেডিকেল ক্যাম্পাসের বাইরে জড়ো হয়েছেন। সেখানে কয়েকটি মরদেহ নেওয়া হয়েছে। স্বজনদের অনেকে সেখানে আনা মরদেহের ছবি দেখে নিজেদের পরিবারের সদস্যদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন। হাসপাতালের ফটক ও সীমানাপ্রাচীরে এসব ছবি টাঙিয়ে বা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হাসপাতালে নেওয়া ৪৯টি মরদেহের মধ্যে মাত্র সাতটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

হ্রদের পানি উপচে পড়ার ঝুঁকি কমেছে

বন্যার পর নেপাল-চীন সীমান্তে একটি হ্রদের সৃষ্টি হয়। ওই হ্রদের পানি শুক্রবার নেপালের লেন্দে খোলা ও ত্রিশূলী নদীতে উপচে পড়তে শুরু করলে উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছিল।

চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শনিবার হ্রদটির পানি উপচে পড়ার ঝুঁকি কমেছে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, স্যাটেলাইটের ছবিতে দেখা গেছে, হ্রদের পানি ধীরে ধীরে বের হয়ে যাচ্ছে। ফলে জলাধারটির পানির পরিমাণও ক্রমে কমছে।

তিব্বত ও নেপালের বাগমতী প্রদেশের সীমান্ত এলাকায় ভূমিধসের পর সৃষ্ট প্রতিবন্ধক হ্রদের ড্রোনচিত্র। ২৭ আগস্ট ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

তিব্বত ও নেপালের বাগমতী প্রদেশের সীমান্ত এলাকায় ভূমিধসের পর সৃষ্ট প্রতিবন্ধক হ্রদের ড্রোনচিত্র। ২৭ আগস্ট ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

বন্যাকবলিত এলাকার উজানে থাকা দুটি হ্রদের মধ্যে এটি একটি, যেগুলোর ওপর নজর রাখছে নেপাল। এক কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, দুটি হ্রদের পানি পুরোপুরি নেমে না যাওয়া পর্যন্ত বন্যার ঝুঁকি থাকবে।

নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বলেন, তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযানের জন্য তাদের সহায়তার প্রয়োজন নেই। তবে সুড়ঙ্গে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধার, সেতু ধ্বংস হয়ে যাওয়া এলাকায় যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা চালু করা, মৃতদেহ শনাক্ত করা, ডিএনএ পরীক্ষা এবং দীর্ঘ সময় মরদেহ সংরক্ষণের জন্য সহায়তা প্রয়োজন।

রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেন, ‘যেসব ক্ষেত্রে আমাদের পর্যাপ্ত দক্ষতা ও কারিগরি জ্ঞান নেই, সেসব বিশেষায়িত সেবা ও কারিগরি সহায়তার জন্য আমরা ইতিমধ্যে অনুরোধ জানিয়েছি।’

আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান চীনের

নেপালে প্রায় ৬০ টন ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে ভারত। তিনটি উড়োজাহাজে করে এসব ত্রাণ পাঠানো হয়। এর মধ্যে কম্বল, ওষুধ, খাবার ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট রয়েছে। এ ছাড়া সুড়ঙ্গে উদ্ধারকারী একটি দল এবং একটি চিকিৎসক দলও পাঠানোর পরিকল্পনা করছে ভারত।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে দেশটি দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনী, অস্থায়ী সেতু এবং কারিগরি দল পাঠানোরও প্রস্তাব দিয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক চলাচলের উপযোগী হওয়ার অপেক্ষায় কাঠমান্ডুর কালাঙ্কি চেকপোস্টে আটকে থাকা পণ্যবাহী ট্রাক। ২৮ আগস্ট ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক চলাচলের উপযোগী হওয়ার অপেক্ষায় কাঠমান্ডুর কালাঙ্কি চেকপোস্টে আটকে থাকা পণ্যবাহী ট্রাক। ২৮ আগস্ট ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

চীনও নেপালের দুর্যোগকবলিত এলাকায় জরুরি সহায়তা এবং আন্তর্জাতিকভাবে উদ্ধার কার্যক্রমে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে। তবে নেপালে চীন কী ধরনের সহায়তা পাঠাচ্ছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

নেপালের অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে রয়টার্সকে বলেন, রাজধানী কাঠমান্ডুর প্রাথমিক হিসাবে পুনর্গঠনে ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। তিনি বলেন, ‘এটি কেবল একটি প্রাথমিক হিসাব। ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসানের পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে।’

এদিকে চীনের কর্তৃপক্ষও বন্যার পর নিখোঁজ ৫০০-এর বেশি মানুষকে খুঁজে বের করতে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

শুক্রবার উদ্ধারকারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গিয়েরং সীমান্ত পারাপার এলাকায় পৌঁছান। ওই এলাকায় যাওয়ার সড়কগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় উদ্ধারকারীদের খাড়া পাহাড় ও উপত্যকা পেরিয়ে যেতে হয়েছে। দড়ি ব্যবহার করে বন ও খাড়া পাহাড়ি এলাকায় চলাচল করে তারা সেখানে পৌঁছান।

সীমান্ত পারাপার এলাকার নজরদারি ক্যামেরার ভিডিওতে দেখা গেছে, বন্যার পানি ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল ঢল সেখানে থাকা ভবনগুলো গ্রাস করছে। এ সময় মানুষজন প্রাণ বাঁচাতে সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করছিলেন।

source: Rajneete

Back to top button