News

টাইমস অব ইসরায়েলের বিশ্লেষণ/নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে আটকে গেল নেতানিয়াহু ও বিরোধীদের ভাগ্য?

ইসরায়েলে পরবর্তী সরকার গঠন করতে হলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসতে হতে পারে। শুধু তা-ই নয়, তাদের সম্ভাব্য রাজনৈতিক মিত্রদেরও একই পথ বেছে নিতে হতে পারে।

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে আসন পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ভোটসংখ্যার শর্ত পূরণ করেছে মোট ১১টি দল। এর মধ্যে নেতানিয়াহুর দল লিকুদ এবং আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টি অন্য নয়টি দলের চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে।

ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্টে সরকার গঠনে অন্তত ৬১টি আসন প্রয়োজন। তবে নেতানিয়াহু ও তাঁর সমমনা দলগুলো পেয়েছে মাত্র ৫৩টি আসন। অন্যদিকে আইজেনকোটের জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। বাকি ১৯টি আসন পেয়েছে দুটি আরব দল।

আইজেনকোটের সামনে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে তিনটি স্পর্শকাতর বিষয় রয়েছে। এগুলো নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে তাঁর জোটের মিত্ররা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভাঙতে বাধ্য হতে পারেন। বিষয়গুলো হলো আরব দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা করা, কট্টর অর্থোডক্স (হারেদি) পুরুষদের সামরিক সেবা বাধ্যতামূলক করা এবং নেতানিয়াহুর সঙ্গে ঐকমত্যের সরকার গঠন করা।

আরব দলগুলোর সমর্থন

আইজেনকোটের জোটে চারটি ইহুদি নেতৃত্বাধীন দল রয়েছে। এগুলো হলো তার নিজের দল ইয়াশার, সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের দল বিয়াচাদ, আভিগদোর লিবারম্যানের দল ইসরায়েল বেইতেনু এবং ইয়ার গোলানের দল ডেমোক্র্যাটস।

আইজেনকোট আরব দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে ৬৭ আসনের একটি জোট গড়ে প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। এই আরব দলগুলোর মধ্যে রাম পেয়েছে আটটি আসন এবং জয়েন্ট লিস্ট পেয়েছে ১১টি আসন।

কিন্তু এই সমীকরণ মেলানো একেবারেই সহজ নয়। কারণ আইজেনকোটের জোটের চারটি দলের মধ্যে তিনটি দলই আরবদের সঙ্গে সরকার না গড়ার অঙ্গীকার করেছিল। দল তিনটি হলো ইয়াশার, বিয়াচাদ এবং ইসরায়েল বেইতেনু।

তাছাড়া ইহুদি ভোটারদের কাছে নেতানিয়াহুর গ্রহণযোগ্যতা বেশি। ফলে আরবদের সমর্থনে সরকার গড়লে আইজেনকোট সরকারের বৈধতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠতে পারে।

নির্বাচনী প্রচারের সময় আইজেনকোট সরকারে যোগ দেওয়ার বিষয়ে চারটি শর্ত দেন। এর মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলকে ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, স্বাধীনতার ঘোষণার মূল্যবোধ মেনে চলা, সবার জন্য সামরিক বা জাতীয় সেবা বাধ্যতামূলক করা এবং হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করে তাদের নির্মূলের অঙ্গীকার করা।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক প্রধান আইজেনকোট গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে চ্যানেল ১২ কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট জানান, আরব দলগুলো এই শর্ত পূরণ করে না। তাই তারা সরকারের অংশ হতে পারবে না। নির্বাচনের রাতে এবং পরবর্তীতেও তিনি কেবল জায়নবাদী ইহুদি দলগুলোকে নিয়ে জোট গঠনের কথাই বলে আসছেন।

২০২১ সালে আরব দল রামের সমর্থনে সরকার গড়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট। এবার তিনিও আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকারে যাওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন। লিবারম্যানের দল পেয়েছে সাতটি আসন।

তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তার জোট কেবল জায়নবাদী দলগুলোকে নিয়েই হবে। কেবল বামপন্থী ডেমোক্র্যাট দলের নেতা ইয়ার গোলান নির্বাচনের আগে আরবদের সঙ্গে আলোচনায় বসার পক্ষে মত দেন। নির্বাচনের পরও তিনি জোটের অন্য তিন দলকে আরবদের সঙ্গে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।

এই সংকট এড়াতে আইজেনকোট একটি সংখ্যালঘু সরকার গঠন করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে রাম ও জয়েন্ট লিস্ট সরকারের বাইরে থেকে সমর্থন দেবে। আরেকটি পথ হতে পারে রাম দলকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করা এবং জয়েন্ট লিস্ট বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়া। তবে এই কৌশলটিও রাজনৈতিকভাবে ও সাধারণ জনগণের মধ্যে তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়তে পারে।

নির্বাচনের পর এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জয়েন্ট লিস্ট জানায়, তারা নেতানিয়াহুর সরকারকে হটাতে রাজনৈতিক সহযোগিতায় প্রস্তুত। তবে আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন সরকারকে তারা কোনো শর্তে সমর্থন দেবে কি না, তা স্পষ্ট করেনি। অন্যদিকে নির্বাচনের ঠিক আগে চ্যানেল ১২-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাম নেতা মনসুর আব্বাস বলেন, পার্লামেন্টে সরকার উপহার দেওয়ার কৌশল তার জানা আছে।

বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার সংকট

আরবদের সমর্থন না পেলে আইজেনকোটের জোট কট্টর অর্থোডক্স দলগুলোর ১৩টি আসন নিয়ে সরকার গড়ার চেষ্টা করতে পারে। এই দল দুটি হলো শাস এবং ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম।

কিন্তু আইজেনকোটের জোটের চারটি দলই কট্টর অর্থোডক্সদের সামরিক সেবা থেকে দেওয়া বিশেষ ছাড় বাতিলের বিষয়টিকে মূল নির্বাচনী এজেন্ডা করেছিল। অন্যদিকে হারেদি দলগুলো এই ছাড় বহাল রাখতে অনড়। ফলে এই দলগুলোর সঙ্গে জোট বাঁধার অর্থ দাঁড়াবে সরাসরি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা।

নেতানিয়াহুর সঙ্গে ঐক্যের সরকার

নেতানিয়াহুকে বাদ দিয়ে সরকার গঠনের বিকল্প পথগুলো অত্যন্ত দুর্বল। এ অবস্থায় বিরোধী জোটের সামনে আরেকটি বিকল্প হলো নেতানিয়াহুর সঙ্গে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করা।

তবে এই সিদ্ধান্তও হবে তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির চরম লঙ্ঘন। কারণ বিরোধী চারটি দলের মূল লক্ষ্যই ছিল ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করা। তাদের মতে, নেতানিয়াহু দেশের অস্তিত্বের জন্যই বড় হুমকি।

অক্টোবরের শেষের দিকে এক রেডিও সাক্ষাৎকারে আইজেনকোট বলেন, তিনি কোনো অবস্থাতেই নেতানিয়াহুর অধীনে সরকারে যাবেন না। এমনকি মেয়াদের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রিত্ব ভাগাভাগির সমঝোতাতেও যাবেন না।

বেনেট এক সাক্ষাৎকারে বলেন, নেতানিয়াহু ইসরায়েল রাষ্ট্রকে ধ্বংস করছেন, তাই তিনি তার সঙ্গে সরকারে বসবেন না। দুই সপ্তাহ আগে এক্স হ্যান্ডেলে লিবারম্যান লেখেন, পৃথিবী উল্টে গেলেও তারা কোনো পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুর সঙ্গে হাত মেলাবেন না।

গোলানের বক্তব্য ছিল স্পষ্ট, তারা নেতানিয়াহু ও তার সহযোগীদের সঙ্গে কোনো সমঝোতা করবেন না।

নেতানিয়াহুর সামনে চ্যালেঞ্জ

অপরদিকে নেতানিয়াহুর সামনেও সরকার গঠনের মসৃণ কোনো পথ নেই। তাঁর জোট ৫৩টি আসন পেয়েছে। নির্বাচনের আগে যে লক্ষ্য ছিল, সে তুলনায় এটি ভালো ফল হলেও আগের ৬৮ আসনের চেয়ে অনেক কম।

সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় বাকি আটটি আসন জোগাড় করা তার পক্ষে প্রায় অসম্ভব। প্রচারণার সময় বিরোধীদের ঘায়েল করতে নেতানিয়াহু আরবদের প্রসঙ্গ টেনে এনেছিলেন। নির্বাচনের প্রাক্কালে দেওয়া ভাষণে তিনি আরব দলগুলোর সঙ্গে বিরোধীদের সহযোগিতার সম্ভাবনাকে লজ্জাজনক বলে আখ্যা দেন।

তবে এসব বক্তব্যের পরও নেতানিয়াহু আরবদের একটি অংশের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা চালাতে পারেন। বিশেষ করে তিনি রামের সঙ্গে চেষ্টা করতে পারেন। রাম নেতা মনসুর আব্বাস নির্বাচনের রাতেই জানান, তিনি উভয় জোটের নেতাদের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছেন। এর আগে ২০২২ সালের নির্বাচনের সময়ও নেতানিয়াহু সরকার গঠনের লক্ষ্যে আব্বাসের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন।

নেতানিয়াহু যদি আরব দল রামের সঙ্গে কোনো বোঝাপড়ায় পৌঁছান, তবুও তার পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া কঠিন হবে। তার অতি ডানপন্থী মিত্র ইতমার বেন গিভির এবং বেজালেল স্মোট্রিচ আগেই সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে আরবদের সঙ্গে কোনো আপস তাঁরা মানবেন না। অন্যদিকে জয়েন্ট লিস্ট জোটে সরাসরি জায়নবাদবিরোধী দল রয়েছে। তাই তাদের সঙ্গে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

ইসরায়েলে সরকার গঠনের সব পথই এখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম। ফলে দেশটিতে নতুন জোট সরকার গঠন করতে হলে কোনো না কোনো পক্ষকে তাদের মূল নির্বাচনী অঙ্গীকার থেকে পুরোপুরি সরে আসতে হবে। এমন সিদ্ধান্ত দেশের পুরো রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। আর কোনো পক্ষই যদি ছাড় না দেয়, তবে শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলকে আরেকটি নতুন নির্বাচনের পথেই হাঁটতে হবে।


প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।]

source: Asia Post

Back to top button