তাবিজের ব্যবহার নিয়ে হাদিসে যা বলা হয়েছে

কেউ কেউ আছেন রোগমুক্তির আশায় তাবিজ-কবচ ব্যবহার করেন। প্রতারকরা তাবিজে বিভিন্ন আঁকিবুঁকি লিখে দেয়। নানা তন্ত্রমন্ত্র পড়ে ফুঁক দেয়। প্রশ্ন হলো, তাবিজ ব্যবহার করা জায়েজ কি না। তাবিজের ব্যবহার নিয়ে হাদিসে কী বলা হয়েছে।
অসুস্থতা মানুষের জন্য যেমন কষ্টের কারণ, তেমনি এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নেয়ামত ও পরীক্ষা। অসুস্থ ব্যক্তির ওপর আল্লাহর রহমত নাজিল হয়। তার গুনাহ মাফ হয়। তিনি মানুষকে এমন কোনো রোগ দেন না, যার প্রতিষেধক নেই। তিনিই রোগ দেন, তিনিই প্রতিষেধকের মাধ্যমে সুস্থ করেন। হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা যেখানে রোগ-ব্যাধি সৃষ্টি করেছেন, সেখানে তিনি প্রতিষেধকও সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১২৫৯৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘প্রতিটি রোগেরই প্রতিষেধক রয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২০৪)। তাই অসুস্থতায় পড়লে আল্লাহর কাছে দোয়া করার পাশাপাশি বৈধ পদ্ধতি চিকিৎসা নিতে হবে। অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
আত্মরক্ষা ও চিকিৎসার জন্য শরিয়ত-অনুমোদিত বৈধ পদ্ধতি অনুসরণ না করে ভিন্ন পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া ইসলামে নিষেধ। শিরকি শব্দ, কুফরি কালাম বা অনর্থক লেখা সম্বলিত তাবিজ ব্যবহার বৈধ নয়। দুর্বোধ্য বা কিছুই বোঝা যায় না- এমন শব্দে লেখা তাবিজ ব্যবহারও নাজায়েজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে শরীরে তাবিজ ঝোলায়, আল্লাহ যেন তার কাজ পূর্ণ না করেন। আর যে মাদুলি (কবচ) ঝোলায়, আল্লাহ যেন তাকে নিরাপদ না রাখেন।’ (মুসতাদরাকুল হাকিম, হাদিস: ৭৫১৫)
এক লোক রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে বাইয়াত (আনুগত্যের শপথ) নিতে আসেন। কিন্তু শুরুতে নবী (সা.) তার বাইয়াত নিতে অস্বীকৃতি জানালেন। কারণ, তার শরীরে তাবিজ লাগানো ছিল। উকবা ইবনে আমির (রা.) বলেন, ‘১০ জন লোকের একটি কাফেলা রাসুলুল্লাহর (সা.) কাছে বাইয়াত (আনুগত্যের শপথ) গ্রহণের জন্য এলো। তিনি নয়জনের বাইয়াত নিলেন। তারা জিজ্ঞেস করলেন, তার সমস্যা কী যে, আপনি তার বাইয়াত নিচ্ছেন না। তিনি বললেন, তার বাহুতে তাবিজ লাগানো আছে। লোকটি তাবিজ কেটে ফেলল। এরপর তিনি তার বাইয়াত গ্রহণ করে বললেন, যে এসব তাবিজ পরল, সে শিরক করল।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১৭৪২২)
শিরকি শব্দ, কুফরি কালাম বা অনর্থক লেখা সম্বলিত তাবিজ ব্যবহার হারাম। তাবিজের ওপর ভরসা করা মূলত আল্লাহর সঙ্গে অংশীদারিত্বের মতো। এটি ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
কোনো বৈধ প্রয়োজনে পবিত্র কোরআনের আয়াত, হাদিসে বর্ণিত দোয়া, জিকির বা সঠিক অর্থবহ কোনো দোয়া ইত্যাদি সংবলিত তাবিজ ব্যবহার যাবে। তবে তাবিজকে সত্তাগত শক্তিতে প্রভাব সৃষ্টিকারী হিসেবে বিশ্বাস করা যাবে না। পূর্ণ বিশ্বাস রাখতে হবে আল্লাহর ওপর। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২০০; ফাতাওয়ায়ে ফকিহুল মিল্লাত, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৬৪৩-৬৪৪)
হাদিসে যে তাবিজ-কবচকে শিরক বা নাজায়েজ বলা হয়েছে, সেটা তখন হবে যখন অন্তরে এ বিশ্বাস রাখবে যে, এসব তাবিজ-কবচ তার উপকার বা ক্ষতি করতে পারে। সুতরাং কেউ যদি বরকতের উদ্দেশ্যে এগুলো ব্যবহার করে, তাহলে কোনো সমস্যা নেই। (মাআলিমুস সুনান, খাত্তাবি, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ২২৬)
বিখ্যাত তাবেয়ি আতা ইবনে আবি রাবাহ, সাইদ ইবনে মুসাইয়াব, মুহাম্মদ ইবনে সিরিন ও মুজাহিদ (রহ.) প্রমুখ ফাতাওয়া দিতেন, কোরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম বা দোয়া মাসুরা দিয়ে তাবিজ হলে কোনো অসুবিধে নেই। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৪৩-৪৪)
রোগ থেকে আরোগ্য লাভে কেউ যদি চিকিৎসকের শরণাপন্ন না হতে চান, তার জন্য সর্বোত্তম ও সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি হলো, কোরআনের বিভিন্ন আয়াত ও হাদিসে বর্ণিত দোয়া পড়ে ঝাঁড়ফুক করা। এভাবে ঝাঁড়ফুক করার বিষয়টি বেশ কিছু বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। ঝাঁড়ফুক মূলত আল্লাহ তাআলার কাছে আরোগ্য লাভের দোয়া ও প্রার্থনা; এগুলো সত্যগত কোনো ওষুধ বা চিকিৎসা নয়। (ড. ইউসুফ আল কারজাবির হালাল-হারামের বিধান বই থেকে সংক্ষেপিত)।
source: Asia Post







