ফরিদপুর/‘জুলাই যোদ্ধা’ সজীব এবার পুরনো মামলায় কারাগারে

ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে সজীব বেগ (৩০) নামে এক ‘জুলাই যোদ্ধাকে’ সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা একটি পুরনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ। পরিবারের দাবি, সজীব ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় ছিলেন এবং তৎকালীন পুলিশের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারেও গিয়েছিলেন। তাকে পরিকল্পিতভাবে হয়রানি করতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে পরিবার।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) দুপুরে আদালতের মাধ্যমে সজীবকে কারাগারে পাঠানো হয়। এর আগে সোমবার (১৭ আগস্ট) সন্ধ্যায় চরভদ্রাসন উপজেলার দক্ষিণ চরসুলতানপুর মোড় এলাকা থেকে তাকে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।
সজীব বেগ উপজেলার চরসুলতানপুর ধোপাডাঙ্গি গ্রামের হাবিবুর রহমান বেগের ছেলে।
পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, সোমবার সন্ধ্যায় বাড়ির পাশের দক্ষিণ চরসুলতানপুর মোড় এলাকায় সৈকতের চায়ের দোকানে বসেছিলেন সজীব। এ সময় ৬–৭ জনের একটি দল সিভিল পোশাকে মোটরসাইকেলে সেখানে আসে। তারা নিজেদের পুলিশ সদস্য পরিচয় দিয়ে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার কথা জানায়।
প্রত্যক্ষদর্শী শোয়াইব সরদার বলেন, পুলিশের পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে সজীব কথা বলেন এবং তাদের চা-বিস্কুট ও পানীয় খাওয়ান। পরে সজীবের সঙ্গে কথা আছে বলে তাঁকে দোকান থেকে ডেকে রাস্তার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর পুলিশের একটি গাড়ি সেখানে আসে।
শোয়াইবের দাবি, পুলিশ সদস্যরা সজীবকে বলেন, ওসি স্যার থানায় যেতে বলেছেন। এরপর তাকে জোর করে পুলিশের গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
পরিবারেরও একই অভিযোগ। তাদের দাবি, সজীবকে আটকের সময় কোনো মামলা বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কথা জানানো হয়নি। পরে চরভদ্রাসন থানায় নিয়ে গিয়ে একটি পুরনো সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, চরভদ্রাসন থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলাটি করেছিলেন তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) মো. রফিকুজ্জামান। মামলায় আওয়ামী লীগের ২৮ জন নেতাকর্মীর নাম উল্লেখের পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়।
মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মোজাম্মেল হক সজীবকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, রাজনৈতিক মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে সজীবের পরিবারের দাবি, সজীব একজন ‘জুলাই যোদ্ধা’। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে গণঅভ্যুত্থানের সময় সদরপুর উপজেলায় বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেওয়ার কারণে তাকে আটক করা হয়েছিল। পরে সদরপুর থানায় পুলিশের করা একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর তিনি ওই মামলায় কারামুক্ত হন।
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সদরপুর থানায় পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে এসআই মো. মামুনুর রশিদ বাদী হয়ে ওই মামলাটি করেছিলেন। এজাহারে বলা হয়, ১৭ জুলাই সদরপুর সরকারি কলেজের সামনে শিক্ষার্থীরা মিছিল বের করে পুলিশের কাজে বাধা দেন। ওই মামলায় সজীবকে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে ২১ জুলাই সজীবসহ পাঁচজনকে আদালতে সোপর্দ করে কারাগারে পাঠানো হয়।
পরিবারের আরও দাবি, আন্দোলনকালীন কারাবন্দি হওয়া ব্যক্তিদের স্মরণে আয়োজিত একটি স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য পরবর্তীতে সজীব ঢাকার বাংলা একাডেমিতে আমন্ত্রণও পেয়েছিলেন।
সজীবের চাচা মুরাদ হোসেন বেগ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার ভাতিজা জুলাই আন্দোলনের সময় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ছিল। গণঅভ্যুত্থানের পর ঢাকায় বাংলা একাডেমিতে জুলাইয়ে কারাবন্দিদের স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে দাওয়াত পেয়ে সে অংশগ্রহণও করেছিল। অথচ আজ তাকে কোনো কারণ ছাড়াই বাড়ির কাছ থেকে তুলে নিয়ে পুলিশের পুরনো একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা আওয়ামী লীগের সময় নির্যাতনের শিকার হয়েছি। এখন আমাদের আওয়ামী লীগ বানিয়ে গ্রেপ্তার করা হলো। আমরা সরকারের কাছে আমার ভাতিজার নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানাই।
তবে সজীবকে জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চরভদ্রাসন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সফর আলী। তিনি বলেন, ছেলেটি ‘জুলাই যোদ্ধা’ কি না, তা আমার জানা নেই। মূলত মাদক সংশ্লিষ্টতাসহ এলাকায় সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সঙ্গে তার যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এবং বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
source: Asia Post







