শিক্ষক দিবস/অবসরের ছয় বছর পরও চক-ডাস্টার হাতে শ্রেণিকক্ষে ইলা বড়ুয়া

সকালের ব্যস্ততা পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই বিদ্যালয়ের পথে হাঁটা শুরু করেন ইলা বড়ুয়া। বয়সের কারণে হাঁটার গতিও আগের মতো নেই। তাই সময় মতো বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে বাড়ি থেকে তাড়াতারি বের হন তিনি। কিন্তু বিদ্যালয়ের ফটক পেরিয়ে শ্রেণিকক্ষে ঢুকতেই সেই বয়সের ভার কোথায় যেন পালিয়ে যায়। শিক্ষার্থীদের সামনে চক-ডাস্টার হাতে শুরু করেন পাঠদান। প্রতিদিনের তার এই প্রাণবন্ত উপস্থিতি দেখে বোঝার উপায় নেই, ছয় বছর আগে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরে গেছেন তিনি।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির হাইদচকিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষক এখনো প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আসেন। খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে নেন তিন থেকে চারটি ক্লাস। নবম ও দশম শ্রেণিতে হিসাববিজ্ঞান পড়ান। প্রয়োজন হলে অষ্টম শ্রেণির বাংলা ক্লাসও নেন। অবসর তার চাকরিজীবনের সমাপ্তি টেনেছে, কিন্তু শ্রেণিকক্ষের সঙ্গে সম্পর্কের নয়।
ইলা বড়ুয়ার কাছে শিক্ষকতা শুধু জীবিকার একটি মাধ্যম ছিল না। দীর্ঘ কর্মজীবনে এই পেশার সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে পড়েছেন যে অবসরের পরও শিক্ষার্থীদের থেকে দূরে থাকতে পারেননি।
তার শিক্ষক হওয়ার গল্পের শুরু আরও অনেক আগে। চার ভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয় সন্তান ইলা বড়ুয়া ছোটবেলায় বাবার কাছ থেকেই শিক্ষকতার প্রতি আকৃষ্ট হন। তার বাবা ভূপেন্দ্র লাল বড়ুয়া সিলেটের একটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করতেন। বাবাকে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পড়াতে দেখেই কিশোরী ইলা বড়ুয়ার মনে তৈরি হয় একই পেশায় আসার স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন পূরণে বেশি সময় লাগেনি।
১৯৮১ সালে হাইদচকিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। পরের বছর স্বামীর চাকরির কারণে ঢাকায় চলে যান। সেখানে ১৯৮২ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত খিলগাঁও গভর্নমেন্ট কলোনী স্কুলে এবং ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত মাদারটেক বাসাবো বাগানবাড়ী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। ১৯৮৮ সালে আবারও ফিরে আসেন চিরচেনা হাইদচকিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। কয়েক দশকের শিক্ষকতা জীবনে দায়িত্ব পালন করেছেন সিনিয়র সহকারী শিক্ষক হিসেবে। হিসাববিজ্ঞান ছিল তার মূল বিষয়।
দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে কত শিক্ষার্থী যে তার সামনে বসেছে, তার হিসাব নেই। কেউ এসেছে, পড়াশোনা শেষ করে চলে গেছে। আবার এসেছে নতুন প্রজন্ম। সময়ের সঙ্গে বদলেছে শিক্ষার্থীদের মুখ, বদলেছে পাঠদানের ধরন, বদলেছে বিদ্যালয়ের পরিবেশ। কিন্তু শিক্ষার্থীদের শেখানোর আগ্রহে ভাটা পড়েনি তার।
২০১৯ সালে অবসরের পর বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও তাকে পুরোপুরি বিদায় জানাতে চায়নি। তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা শিক্ষার্থীদের কাজে লাগবে—এই বিবেচনায় তাকে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে আবারও শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনা হয়।
সেই থেকে প্রতিদিনের রুটিনে যুক্ত হয়েছে বিদ্যালয়। তিন-চারটি ক্লাস, শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন, খাতা দেখা আর বোঝানোর ব্যস্ততায় কেটে যায় তার দিন। কখনো হিসাববিজ্ঞানের জটিল অঙ্ক নিয়ে বসেন, কখনো বাংলা ক্লাসে শিক্ষার্থীদের পড়ান। বয়সের ছাপ শরীরে থাকলেও শ্রেণিকক্ষে ঢোকার পর তার মনোযোগে যেন তার কোনো প্রভাব পড়ে না।
শিক্ষার্থীদের কাছেও তিনি শুধু একজন শিক্ষক নন কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা নিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন অভিভাবকের মতো।
ইলা বড়ুয়ার এই পথচলা যেন প্রমাণ করে, কিছু পেশার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক চাকরির মেয়াদে শেষ হয় না। নির্দিষ্ট বয়সে কর্মজীবনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটলেও ভালোবাসা থেকে যায় নিজের জায়গায়, নিজের মানুষগুলোর কাছে।
ইলা বড়ুয়া বলেন, ‘শিক্ষকতার বাইরে আমার চাওয়া-পাওয়ার আর কিছু নেই। সহকর্মী শিক্ষকদের সহযোগিতা এবং প্রিয় শিক্ষার্থীদের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সম্মান আমাকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে। তাদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েই অবসরের পরও এ বিদ্যালয় ছেড়ে যেতে পারিনি। এ বিদ্যালয়, এখানকার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মায়ায় আমি আজও আবদ্ধ।’
ইলা বড়ুয়ার সাবেক ছাত্র ও বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুনব বড়ুয়া বলেন, ‘ম্যাডামের অবসরের পরও আমরা তাকে আমাদের কাছ থেকে দূরে যেতে দেইনি। তিনি আমাদের কাছে একটি বটবৃক্ষের মতো। তার ছায়ায় থেকেই আমরা এই প্রতিষ্ঠানকে সুনামের সঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি।’
বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী সালাহউদ্দিন জিকু বলেন, “ছোটবেলা থেকেই কোমল হৃদয়ে ইলা ম্যাডামকে দেখে আসছি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তিনি শিক্ষার্থীদের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন। তিনি শিক্ষকতাকে কখনো শুধু পেশা হিসেবে নেননি বরং শিক্ষার্থীদের শিখিয়েছেন কীভাবে একজন ভালো ও আদর্শ মানুষ হয়ে উঠতে হয়। তার কাছ থেকে আমরা শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানই পাইনি, পেয়েছি জীবন গড়ার শিক্ষাও।”
source: Asia Post







