চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডেঙ্গুর প্রকোপ, হাসপাতালে বাড়ছে চাপ

অব্যাহত বৃষ্টিপাত ও এডিস মশার বংশবিস্তারের ফলে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডেঙ্গু পরিস্থিতির আশঙ্কাজনক অবনতি ঘটেছে। প্রতিদিনই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্ত ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় নতুন করে ৯৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। এর আগের দিন আক্রান্ত হয়েছিলেন ১০৫ জন।
বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা তিন হাজার ৫০০ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে ইনডোরে চিকিৎসা নিয়েছেন ২ হাজার ৮৬ জন। অন্যদিকে, শুধু ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের বহির্বিভাগে রক্ত পরীক্ষা করিয়ে ১ হাজার ৪১৬ জনের শরীরে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে।
সোমবার স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে ইনডোরে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ৫৫ জন রোগী। তাদের মধ্যে ২৯ জন পুরুষ ও ২৬ জন নারী। এই ৫৫ জনের মধ্যে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালেই ভর্তি হয়েছেন ৪৩ জন। এছাড়া উপজেলা হাসপাতালগুলোর মধ্যে শিবগঞ্জে দুইজন, গোমস্তাপুরে ছয়জন, নাচোলে দুইজন এবং ভোলাহাটে দুইজন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
ইনডোরে ভর্তি রোগীদের পাশাপাশি জেলা হাসপাতালের বহির্বিভাগে রক্ত পরীক্ষা করিয়ে আরও ৪৪ জনের শরীরে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। এ দুই হিসাব মিলিয়ে একদিনে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৯ জনে।
পরিসংখ্যানে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে মোট ১১২ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের মধ্যে জেলা হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন ৮৯ জন। এদের মধ্যে ৪৯ জন পুরুষ ও ৪০ জন নারী। উপজেলা হাসপাতালগুলোর মধ্যে শিবগঞ্জে ৮ জন, গোমস্তাপুরে ৮ জন, নাচোলে ২ জন এবং ভোলাহাটে ৫ জন রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত জেলা হাসপাতালেই ভর্তি হয়ে সেবা নিয়েছেন ১ হাজার ৮০১ জন রোগী। উপজেলার মধ্যে শিবগঞ্জে ১০৫ জন, গোমস্তাপুরে ৬৫ জন, নাচোলে ৪৬ জন এবং ভোলাহাটে ৬৯ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন।
সরকারি হিসাবে জেলায় এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে দুজনের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। জেলা হাসপাতাল থেকে ১ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত উন্নত চিকিৎসার জন্য ১১৫ জন গুরুতর রোগীকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে। সেখান থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রামেকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জেলার অন্তত ছয়জন ডেঙ্গু রোগী মারা গেছেন।
স্থানীয় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সচেতন নাগরিকদের মতে, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডেঙ্গু না কমার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে। বারবার বৃষ্টিপাতের ফলে বিভিন্ন নিচু এলাকা, বসতবাড়ির আশপাশ, নালা-নর্দমা, ডাবের খোসা কিংবা ফেলে রাখা পাত্রে পানি জমে থাকছে। এসব জমে থাকা পানি এডিস মশার বংশবিস্তারের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করছে।
ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরুর দিকে পৌরসভা ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ফগিং কার্যক্রম নিয়মিত ও কার্যকরভাবে না হওয়ায় এখন মশার প্রজনন ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না বলেও তারা মনে করছেন। এ ছাড়া ঢাকা ও রাজশাহীসহ অন্যান্য জেলা থেকে অনবরত যাতায়াত করা মানুষের মাধ্যমে ভাইরাসটি দ্রুত ছড়াচ্ছে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতার ব্যাপক অভাব দেখা যাচ্ছে। বাসাবাড়িতে তিন দিনের বেশি জমে থাকা পানি পরিষ্কার না করায় ঘরের ভেতরেই এডিস মশার লার্ভা তৈরি হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব মনিরুজ্জামান মুনির বলেন, ‘জেলায় ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে। একদিকে ঋতু পরিবর্তন, অন্যদিকে ডেঙ্গুর প্রকোপ—ফলে এখন প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই জ্বর-সর্দির রোগী। হাসপাতালেও ব্যাপক চাপ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে জেলায় জরুরি সেল গঠনের পাশাপাশি জরুরি ঘোষণা করতে হবে।’
এই সেলের কাজের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জেলার প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রতিদিনই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে হবে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে একটি টিম গঠন করতে হবে, যারা শুধু ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসা দেবে। এ ছাড়া জেলার প্রতিটি পাড়া-মহল্লার সামাজিক সংগঠনগুলোকে সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে হবে। তাহলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।’
এদিকে সার্বিক পরিস্থিতি সামাল দিতে মাঠে নেমেছে স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় সরকার বিভাগ। মশা নিয়ন্ত্রণে দুই বিভাগ যৌথভাবে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার বিভিন্ন এলাকা ডেঙ্গুর হটস্পট হওয়ায় আটটি টিম গঠন করা হয়েছে। বর্তমানে টিমের সদস্যরা প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র খুঁজে বের করছেন এবং তা ধ্বংস করছেন।
শুধু সচেতনতা সৃষ্টিই নয়, লার্ভা পাওয়ায় এখন পর্যন্ত অন্তত চারজন বাড়ির মালিককে প্রশাসনিকভাবে জরিমানা করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. একেএম শাহাব উদ্দীন বলেন, ‘শুধু স্বাস্থ্য বিভাগ একা কাজ করে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে না। এ জন্য আমরা স্থানীয় সরকার বিভাগকে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। এরই ধারাবাহিকতায় আমরা প্রতিদিনই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালাচ্ছি। বাড়ি বাড়ি গিয়ে মশার লার্ভার প্রজনন স্থানগুলো চিহ্নিত করে মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, এখন যার বাসাবাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে, সেই ভবন মালিককে জরিমানা করা হচ্ছে। ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব না কমা পর্যন্ত এই কঠোর তদারকি ও মোবাইল কোর্টের অভিযান অব্যাহত থাকবে।’
তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকায় একটি বিশেষ কীটতাত্ত্বিক জরিপ চালায় সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। জরিপের ফলাফল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পরীক্ষা করা ১৫০টি বাড়ির মধ্যে ৫৪টি বাড়িতেই ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, পৌর এলাকার ৩৬ শতাংশ বা প্রতি তিনটি বাড়ির একটিতে এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি হয়ে আছে। এ রোগে আক্রান্ত ও উপসর্গে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত ডেঙ্গু পরীক্ষা করানো এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. জমির মো. হাসিবুস সাত্তার। তিনি বলেন, ‘জেলায় ডেঙ্গুর অবস্থা খুবই ভয়াবহ। চারজনের পরীক্ষা করলে তিনজনেরই দেহে ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে। হাসপাতালে শয্যা নেই, অনেক রোগী ফ্লোরেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। এরপরও আমরা আমাদের সক্ষমতার মধ্য থেকে সর্বোচ্চটা দিয়ে যাচ্ছি।’
source: Asia Post







