‘গণ-অভ্যুত্থানকে নস্যাৎ করার জন্য সংবিধানকে ব্যবহার করা হয়েছে’

চব্বিশের ৮ আগস্ট শেখ হাসিনার সংবিধানকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে, পুরোনো ব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার।
তিনি বলেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান ছিল গাঠনিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করার। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানকে নস্যাৎ করার জন্য বাংলাদেশের সংবিধানকে ব্যবহার করা হয়েছে। ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থা এবং সংবিধান বহাল রেখে সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব ঘটানো হয়েছে গণ-অভ্যুত্থানের পর। এর মাধ্যমে দেশে হাসিনাহীন হাসিনা-ব্যবস্থা কায়েম রয়েছে।
নিজের ৮০তম জন্মদিনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে কবি ও বুদ্ধিজীবি ব্রাত্য রাইসুর প্রশ্নের জবাবে ফরহাদ মজহার এসব কথা বলেন।
রোববার (৯ আগস্ট) রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয় ‘মুখোমুখি ফরহাদ মজহার’ শীর্ষক আলাপচারিতার এই আয়োজন। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন লেখক ও সংগঠক মোহাম্মদ রোমেল।
অনুষ্ঠানে ফরহাদ মজহার বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়েছে’, এটা হাসিনা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বয়ান। গণ-অভ্যুত্থান সফল হয়েছে। তবে তার আকাঙ্ক্ষার পূর্ণতা পায়নি। ছাত্র-জনতা বুকের রক্ত দিয়ে হাসিনাকে তাড়িয়েছে, কিন্তু এখন তাদের ‘মব’ বলা হচ্ছে।
নিজের সমালোচনা প্রসঙ্গে ফরহাদ মজহার বলেন, পৃথিবীর সব চিন্তাবীদই তাদের সময়ে নিন্দিত হয়েছে।
চিন্তাবীদ আহমদ ছফার সঙ্গে তার হৃদ্যতা নিয়ে ফরহাদ মজহার বলেন, ঝগড়া-বিবাদের মধ্যে ছফার সঙ্গে আমার হৃদ্যতা হয়। আহমদ ছফার টাইফয়েড হওয়ার পর সে ঠিকমতো কথা বলতে পারত না। কিন্তু সে মানুষ হিসেবে ভালো ছিল। ঢাকা শহরে আমার খ্যাতি যখন তুঙ্গে ছিল, তখন সবাই জানত আহমদ ছফা আমার বন্ধু। সে লিবিয়ার কাছ থেকে কিছু টাকাপয়সা নিয়েছিল বলে আমার সঙ্গে ঝগড়া হয় কিন্তু মনোমালিন্য হয়নি। ছফা এনজিওর কাছ থেকে টাকা নেওয়ায় তার সঙ্গে আমার মনোমালিন্য হয়।
তিনি আরও বলেন, শাহবাগীরা প্রচার করে আহমদ ছফার ডায়েরিতে লেখা আছে, ‘আমি নাকি হুমায়ুন কবীরকে হত্যা করেছি’। এটা আহমদ ছফার ডায়েরিতে আছে কি না সেটা আমার জানা নেই। ছফাকে আমি বলতাম, ‘আওয়ামী লীগ, ভালো হয়ে যান’। বঙ্গীয় রেনেসাঁর মডেলটা তিনি দেখতে চেয়েছিলেন। তখন আমরা সবাই জাতীয়তাবাদী চিন্তার ছিলাম। ছফার মধ্যে আওয়ামী লীগের চিন্তা ছিল।
ইসলাম প্রসঙ্গে এই চিন্তক বলেন, ইসলামের প্রচারে দেওবন্দের ঐতিহাসিক অবদান আছে। দেওবন্দের আলেমরা না থাকলে এ দেশে ইসলাম প্রচার হতো না। ইসলামের ইতিবাচক দিকটা আমাদের ইতিহাসে তুলে ধরা হয়নি।
ফরহাদ মরজহার বলেন, আহমদ ছফার ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বইতে সেসব নাই। ছফা ছিল ‘মধুর মিথ্যুক’। তার সঙ্গে দেখা হলে বলত আপনার একটা কবিতা পড়েছি, অসাধারণ হয়েছে। সে চাইত আমি যেন কবিতা লিখি। ছফাকে ভালো না বেসে আপনি কিছুই করতে পারবেন না। সে একজন ভালো মানুষ ছিল। সে নিজে না খেয়েও তার টাকা মানুষকে দিয়ে দিত। ছফা একজন সাহিত্যিক মানুষ। তাকে বুদ্ধিজীবী বানানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। ছফার গদ্যের আমি হিংসা করি।
ফরহাদ মজহার বলেন, ছফাকে আমার বিরুদ্ধে যারা ব্যবহার করে, তারা ভুল করছে। আমার ওপর সবচেয়ে বড় প্রভাব আমি ছফাকে ভালোবাসি। আমি যদি মেয়ে হতাম, তাহলে ছফাকে বিয়ে করতাম। ছফার লাশ তুলে যখন অন্য জায়গায় নেওয়া হচ্ছিল, তখন আমি কেঁদেছিলাম। ছফাকে আমার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে।
কবি শামসুর রাহমানের বিষয়ে তিনি বলেন, শামসুর রাহমানকে কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আহমদ ছফা। বাংলাবাজারে গিয়ে প্রকাশকদের কাছে আকুতি-মিনতি করতেন। ষাটের দশকে ঢাকা শহরের শোভা ছিলেন আহমদ ছফা।
আনু মুহাম্মদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ফরহাদ মজহার বলেন, আনু আমাদের সমালোচনা করেছে। সে সমালোচনার নামে আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করেছে। পাবলিক ফিগার বলে আমাকে অনেক কিছু সহ্য করতে হয়।
অনুষ্ঠানে ফরহাদ মজহারকে নিয়ে কথা বলেন ফরহাদ মজহারের সহধর্মিণী ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার।
তিন সেশনের এই আয়োজন রোববার বিকাল ৩টায় শুরু হয়, চলে রাত ১০টা পর্যন্ত।
প্রথম সেশনে ফরহাদ মজহারের মুখোমুখি হন লেখক ও নকশাবিদ উদয় হাসান, দ্বিতীয় সেশনে এই রাষ্ট্রচিন্তক ও বুদ্ধিজীবীর মুখোমুখি হন লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা তাসমিয়াহ আফরিন মৌ এবং তৃতীয় ও শেষ সেশনে ফরহাদ মজহারের মুখোমুখি হন কবি ব্রাত্য রাইসু।
source: Asia Post







