ফ্রান্সে নতুন বিক্ষোভ ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার, মোতায়েন ৭০ হাজার পুলিশ

ফ্রান্স জুড়ে নতুন করে বিক্ষোভের প্রস্তুতির মধ্যে নিরাপত্তা জোরদার করেছে দেশটির সরকার। গত সপ্তাহের বিক্ষোভে সহিংসতা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে শনিবার ৭০ হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হবে। বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিটের পাশাপাশি হেলিকপ্টার, ড্রোন, সাঁজোয়া যান ও জলকামানও প্রস্তুত রাখা হচ্ছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ এ নিরাপত্তা পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, গত সপ্তাহের তুলনায় এবার ১০ হাজার বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হবে। উগ্র বামপন্থি গোষ্ঠীগুলো সহিংসতা ও লুটপাটে উসকানি দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষা ও সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষের জেরে গত সপ্তাহে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেয়। প্যারিস, মার্সেই, লিওঁ ও লিমোজসহ বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও দোকানপাটে লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগে কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা হয়। বিভিন্ন শহরে প্রায় তিন হাজার দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও লুটপাট হয়।
‘অ্যাক্ট-২’ কর্মসূচি ঘিরে উত্তেজনা
এবারের বিক্ষোভে বড় জমায়েতের ডাক দিয়েছে সরকারবিরোধী ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন। শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাজধানী প্যারিসে আন্দোলনটির কর্মসূচি ‘অ্যাক্ট-২’ নামে পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আন্দোলনকারীদের একটি অংশের দাবি, প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁকে ক্ষমতা ছাড়তে হবে।

২০১৮ সালে জ্বালানির দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। কয়েক বছর অনেকটা নিষ্ক্রিয় থাকার পর সাম্প্রতিক বিক্ষোভের মধ্যে আন্দোলনটির কর্মীরা আবার সক্রিয় হয়েছেন।
গত সপ্তাহের সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এর আগে কাতার সফরকালে বুধবার সাংবাদিকদের ম্যাখোঁ বলেছিলেন, বিক্ষোভে যারা বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতা তৈরির চেষ্টা করবে, তাদের থামানো হবে। গত সপ্তাহের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই হতে দেওয়া হবে না বলে জানান তিনি।
সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান
শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ, প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু ও জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ।
তিনি বলেন, “আমরা দাঙ্গাকারী, লুটপাটকারী এবং সহিংসতা চালানো সবার বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেবো না।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, উগ্র বামপন্থি গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকে অনলাইনে বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার আহ্বান জানানো হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানতে পেরেছে। এসব আহ্বানে সরকারি ভবন লক্ষ্যবস্তু করার কথাও বলা হয়েছে।

নুনেজ আরও বলেন, “আমরা কোনো সুন্দর, বন্ধুত্বপূর্ণ বিক্ষোভের কথা বলছি না।” তিনি আরও বলেন, “আমরা আগামীকালের জন্য প্রস্তুত। আমরা অত্যন্ত সতর্ক থাকব, অত্যন্ত কঠোর থাকব এবং কোনো কিছুই একেবারে উপেক্ষা করব না।”
নিরাপত্তা অভিযানে বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট রেইড ও জিআইজিএন, অশ্বারোহী পুলিশ, হেলিকপ্টার, ড্রোন এবং ড্রোন প্রতিরোধী ব্যবস্থা ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি সাঁজোয়া যান ও জলকামানও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
গত সপ্তাহে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়া কিছু সংবেদনশীল এলাকায় জারি করা কারফিউও বহাল রাখা হয়েছে। এ ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ফ্রান্সের কয়েকটি শহরে রাতের বেলায় কারফিউ জারি করা হয়েছে।
প্যারিসে বিক্ষোভের অনুমতি সীমিত
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি সেবার ওপর চাপ নিয়ে ক্ষোভের জেরে কয়েক সপ্তাহ ধরে ফ্রান্সে বিক্ষোভ করছেন শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্যরা। শিক্ষকসংকট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জরাজীর্ণ অবকাঠামোর প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন পরে জীবনযাত্রার মান ও সরকারি ব্যয় নিয়ে বৃহত্তর অসন্তোষে রূপ নেয়।
-057c15.jpg)
শনিবার প্যারিসে কেবল একটি শ্রমিক ইউনিয়নের বিক্ষোভের অনুমতি দিয়েছে পুলিশ। দেশটির প্রধান ছাত্র ইউনিয়ন ইউএনইএফ এবং ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের সমাবেশের আবেদন নাকচ করা হয়েছে। তবে ইউএনইএফ জানিয়েছে, অনুমতি না পেলেও তারা কর্মসূচি চালিয়ে যাবে।
প্যারিসের বাইরে ফ্রান্সের দ্বিতীয় ও তৃতীয় বৃহত্তম শহর মার্সেই ও লিওঁসহ আরও কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গত সপ্তাহে এসব শহরের বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও দোকানপাটে লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
ল্যুভরসহ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ
নতুন করে সহিংসতার আশঙ্কায় প্যারিসের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান শনিবার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম পরিচিত জাদুঘর ল্যুভর। এ ছাড়া শহরটির আর্ট বাসেল মেলা পুরো সপ্তাহান্তে বন্ধ থাকবে।
-b88157.jpg)
আনাদোলু এজেন্সির খবরে বলা হয়েছে, ল্যুভরের পাশাপাশি ওরসে ও পিকাসো জাদুঘরও বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দর্শনার্থী ও কর্মীদের নিরাপত্তা এবং শিল্পকর্মের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গত সপ্তাহে প্রায় তিন হাজার দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হওয়ায় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোও দোকানপাট বন্ধ রাখার আহ্বান জানিয়েছে। সম্ভাব্য ভাঙচুর এড়াতে প্যারিসের বিভিন্ন দোকানে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে।
মেরিন লো পেনের দলের সম্মেলন ঘিরেও উদ্বেগ
এ সপ্তাহান্তে অরলিয়ঁ শহরে মেরিন লো পেনের উগ্র ডানপন্থি দল ন্যাশনাল র্যালির বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ। বামপন্থী ও বর্ণবাদবিরোধী গোষ্ঠীগুলো সেখানে পালটা বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়েছে।
-400ca6.jpg)
সাম্প্রতিক সহিংসতার পর জনমত জরিপে লো পেনের সমর্থন বেড়েছে। আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রধান প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত এই রাজনীতিক বিক্ষোভের ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ভেঙে পড়ার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছেন।
এর মধ্যে শুক্রবার প্যারিসের পশ্চিমাঞ্চলে গুলিতে একজন নিহত ও চারজন আহত হয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, এ হামলার পেছনে বর্ণবাদী উদ্দেশ্য থাকতে পারে।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠকে ম্যাখোঁ
চলমান সংকট প্রশমনের চেষ্টায় শুক্রবার প্রথমবারের মতো শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ। তবে শনিবার আরও বিক্ষোভের অনুমতি না দেওয়ায় সরকারের সমালোচনা করেছেন দেশটির অন্যতম বৃহৎ শ্রমিক ইউনিয়ন সিএফডিটির মহাসচিব মেরিলিজ লিওঁ।
ফরাসি সম্প্রচারমাধ্যম টিএফওয়ানকে তিনি বলেন, “এটা উলটো ফল দেবে, কারণ মানুষের মধ্যে প্রচুর ক্ষোভ রয়েছে, প্রচুর ক্ষোভ রয়েছে এবং তারা স্বীকৃতি পেতে ও তাদের কথা শোনা হোক— এমন দাবি জানাচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “কারা বৈধভাবে বিক্ষোভের আবেদন করতে পারবে, তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব প্রেসিডেন্টের নয়।”
এর আগে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। চলমান উত্তেজনা কমাতে সংলাপের উদ্যোগ নেওয়া হলেও জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি সেবা নিয়ে অসন্তোষের স্থায়ী সমাধানে বড় কোনো নতুন নীতিগত ঘোষণা আসেনি।
এদিকে শ্রমিক ইউনিয়নগুলো আগামী ৫ নভেম্বর দেশজুড়ে ধর্মঘট ও বিক্ষোভের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ফলে সপ্তাহান্তের বিক্ষোভের পরও ফ্রান্সে প্রতিবাদ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থনীতি নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ
সামাজিক অস্থিরতার প্রভাব পড়ছে ফ্রান্সের অর্থনীতিতেও। নতুন করে বিক্ষোভ ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় দেশটির সরকারি ঋণের সুদহার বেড়েছে। এতে সরকারি অর্থব্যবস্থা সামাল দেওয়া নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা মুডিস শুক্রবার ফ্রান্সের ঋণমান কমাতে পারে বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই এমন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে ফ্রান্সের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও ক্রমেই জটিল হচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি সেবার মান ও অর্থনৈতিক চাপ নিয়ে জনঅসন্তোষের মধ্যে শনিবারের বিক্ষোভ সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।
source: Rajneete







