হুমকি আর আলোচনার মারপ্যাঁচ, ইরান যুদ্ধ কোন পথে?

সাত মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধ এখন এমন একপর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রের চেয়ে কূটনীতির টেবিলই পরবর্তী মোড় নির্ধারণ করতে পারে। কিন্তু সেই টেবিলেও সমঝোতার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে কে আগে ছাড় দেবে— এই প্রশ্ন। তেহরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ ও অবরোধ কমালেই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং আলোচনায় ফেরা সম্ভব। ওয়াশিংটনের বার্তা, আগে ইরানকে আরও ছাড় দিতে হবে।
এই অচলাবস্থার মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সাত দিনের শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, চলতি সপ্তাহেই আবার আলোচনা হতে পারে। ফলে যুদ্ধ থামার সম্ভাবনা একেবারে শেষ হয়ে যায়নি, বরং দুই পক্ষ এখনো মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে।
অর্থাৎ যুদ্ধের পরবর্তী পথ এখন সরাসরি সামরিক সংঘাত আর পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তির মাঝামাঝি এক অনিশ্চিত অঞ্চলে।
হরমুজেই আটকে আছে সমাধানের চাবি
ইরানের প্রস্তাবের কেন্দ্রে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি। তেহরানের প্রস্তাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ তুলে নেবে, ইরানি তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে এবং আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর করবে। এর পর সাত দিনের মধ্যে হরমুজ খুলে দেওয়া হবে এবং সপ্তম দিনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরবর্তী আলোচনা শুরু হবে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, প্রস্তাবটির প্রাথমিক ধাপ শেষ করতে চার থেকে পাঁচ দিন লাগবে, ষষ্ঠ দিনে প্রণালি খুলতে পারে এবং সপ্তম দিনে চূড়ান্ত সমঝোতার জন্য আলোচনা শুরু হতে পারে।
কিন্তু ট্রাম্প এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার প্রশাসনের অবস্থান হলো, ইরান এমন কিছু শর্ত সামনে এনেছে যার বিনিময়ে ওয়াশিংটনকে আগে থেকেই বড় ধরনের সামরিক ও অর্থনৈতিক ছাড় দিতে হবে।
তবু এখানেই গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেও ট্রাম্প বলেছেন, চলতি সপ্তাহে ইরানের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে। কাতারসহ মধ্যস্থতাকারীরা দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান চালিয়ে যাচ্ছেন। অর্থাৎ আনুষ্ঠানিকভাবে একটি প্রস্তাব বাতিল হলেও কূটনীতির পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
দুপক্ষের হিসাব আলাদা
তেহরানের হিসাব মূলত অর্থনীতি ও যুদ্ধের চাপকে ঘিরে। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, মার্কিন নৌ অবরোধ এবং হরমুজ সংকট ইরানের অর্থনীতিতে বড় চাপ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ইরানের জন্য হরমুজ একটি কৌশলগত হাতিয়ার— প্রণালিটি পুরোপুরি সচল থাকলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হতে পারে, কিন্তু এর ওপর নিয়ন্ত্রণ তেহরানকে আলোচনার টেবিলে বাড়তি প্রভাবও দেয়।
অন্যদিকে ওয়াশিংটন মনে করছে, সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপই ইরানকে আরও বড় ছাড় দিতে বাধ্য করতে পারে। এ কারণেই দুপক্ষের মধ্যে মূল বিরোধ এখন শুধু যুদ্ধবিরতি নিয়ে নয়, কোন পদক্ষেপটি আগে হবে, সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
ইরান চায়— চাপ কমুক, অবরোধ উঠুক, হরমুজ খুলুক, তারপর আলোচনা এগোক। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র চাইছে— আলোচনার আগে ইরান আরও কিছু শর্ত মেনে নিক। এই ‘কে আগে’ প্রশ্নেই আটকে আছে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ।
পারমাণবিক প্রশ্নও ফিরবে টেবিলে
হরমুজের পাশাপাশি সবচেয়ে কঠিন বিষয় পারমাণবিক কর্মসূচি। যুদ্ধ থামাতে পারলেও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মূল বিরোধ থেকে যাবে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার দাবি জানিয়ে আসছে। তেহরান অবশ্য বলে আসছে, তার পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। ফলে যুদ্ধবিরতি বা হরমুজ খোলার মতো তাৎক্ষণিক সমঝোতা হলেও পরবর্তী ধাপে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘ ও কঠিন আলোচনা অনিবার্য।
আগের সমঝোতার অভিজ্ঞতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। জুনে দুপক্ষের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা হয়েছিল, যাতে সামরিক অভিযান বন্ধ এবং হরমুজ পুনরায় খোলার পথ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু স্থায়ী চুক্তির জন্য নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সমাধান হয়নি এবং সেই কাঠামো ভেঙে পড়ে।
ফলে এবার কোনো নতুন যুদ্ধবিরতি হলে সেটি কতটা টেকসই হবে, তা নির্ভর করবে শুধু সামরিক অভিযান বন্ধের ওপর নয়; বরং পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা, তেল বিক্রি, হরমুজের নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক মিত্রদের ভূমিকা মিলিয়ে সবকিছুর ওপর।
যুদ্ধ শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্রেও আটকে নেই
ইরান যুদ্ধের আরেকটি বড় পরিবর্তন হলো এর ভৌগোলিক বিস্তার। ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরব ও তাদের মিত্রদের সংঘাত নতুন করে তীব্র হয়েছে।
হুতিরা লোহিত সাগর ও বাব এল-মান্দেব অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের তাইজ ও আশপাশে সরকারি বাহিনী ও হুতিদের সংঘর্ষ বেড়েছে। সৌদি আরবও হুতিদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
এর অর্থ, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো সমঝোতা হলেও মধ্যপ্রাচ্যের সব ফ্রন্ট একই সঙ্গে শান্ত হয়ে যাবে— এমন নিশ্চয়তা নেই।
বরং হরমুজের পাশাপাশি বাব এল-মান্দেব ও লোহিত সাগরও এখন যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু। একটি প্রণালিতে উত্তেজনা কমলেও অন্য প্রান্তে হামলা অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য পরিবহনে অনিশ্চয়তা থেকে যাবে।
সৌদি আরবও ক্রমেই এই সংঘাতের সরাসরি অংশ হয়ে উঠছে। কয়েক দিন আগে তুরস্ক, মিসর ও পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথ বিবৃতিতে রিয়াদের আত্মরক্ষার অধিকারকে সমর্থন জানানো হয়েছে এবং আঞ্চলিক নৌ চলাচল নিরাপদ রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তেলের বাজার বলছে, যুদ্ধ শেষ হতে ঢের দেরি
যুদ্ধের ভবিষ্যৎ বোঝার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক জ্বালানি বাজার। হরমুজ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার পর সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবার বেড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারের ওপরে উঠেছে।
হরমুজ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। ফলে প্রণালিটি দীর্ঘ সময় অচল থাকলে শুধু ইরান বা উপসাগরীয় দেশ নয়, এশিয়া ও ইউরোপের জ্বালানি বাজারও চাপের মধ্যে পড়ে।
সৌদি আরব এরই মধ্যে হরমুজের বাইরে বিকল্প রপ্তানি পথ ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু বিকল্প পথের সক্ষমতা হরমুজের সমপর্যায়ের নয়। ফলে সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, ততই যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্য বাড়বে।
ট্রাম্পের সামনে নভেম্বরের হিসাব
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন। ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, যুদ্ধ শিগগির শেষ হতে পারে। আবাএ একই সঙ্গে তিনি নতুন করে ইরানে হামলার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি।
পাশাপাশি এই দুই বার্তা থেকেই বোঝা যায়, ওয়াশিংটন এখন একই সঙ্গে দুই পথ খোলা রাখতে চাইছে— কূটনীতি এবং সামরিক চাপ।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচিও বলেছেন, তেহরান আলোচনার জন্য প্রস্তুত। তবে ইরান জানিয়েছে, তারা নিজেদের জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেবে এবং মার্কিন নির্বাচনের সময়সূচিকে তাদের প্রধান বিবেচনা হিসেবে দেখছে না।
ফলে নভেম্বরের আগে কোনো সমঝোতা হলে সেটি হতে পারে সীমিত যুদ্ধবিরতি বা ধাপে ধাপে উত্তেজনা কমানোর ব্যবস্থা। আর সমঝোতা না হলে নির্বাচনের পর আবার সামরিক চাপ বাড়ানোর আশঙ্কাও থেকে যাচ্ছে।
তাহলে যুদ্ধ কোন পথে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে অন্তত তিনটি পথ খোলা। প্রথমত, ধাপে ধাপে কূটনৈতিক সমঝোতা। যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কিছুটা কমাবে, ইরান হরমুজে জাহাজ চলাচল সহজ করবে, এরপর পারমাণবিক ও নিষেধাজ্ঞার প্রশ্নে দীর্ঘ আলোচনা শুরু হবে। এই পথেই কাতারসহ মধ্যস্থতাকারীরা এখন কাজ করছেন।
দ্বিতীয়ত, দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা। যুদ্ধের বড় ধরনের বিস্তার হবে না, কিন্তু হরমুজ পুরোপুরি স্বাভাবিকও হবে না। সীমিত সামরিক চাপ, পালটা হুমকি, নিষেধাজ্ঞা ও মধ্যস্থতাকারীদের আলোচনা চলতে থাকবে। তেলের বাজারও উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে থাকবে।
তৃতীয়ত, আবার বড় ধরনের সামরিক সংঘাত। আলোচনার পথ ভেঙে গেলে এবং যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে ইরান হরমুজ ও উপসাগরীয় অঞ্চলে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে। একই সঙ্গে হুতি ফ্রন্ট সক্রিয় হলে যুদ্ধের ভৌগোলিক পরিধি আরও বাড়তে পারে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— দুপক্ষই প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান নিলেও কেউই কূটনীতির দরজা পুরোপুরি বন্ধ করেনি। ট্রাম্প ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন, কিন্তু নতুন আলোচনার কথা বলেছেন। আরাগচি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতির কথা বললেও আলোচনায় ফেরার আগ্রহও জানিয়েছেন।
তাই সাত মাসের যুদ্ধ এখন সরাসরি ‘জয়-পরাজয়ে’র লড়াইয়ের চেয়ে বেশি হয়ে উঠেছে চাপ বনাম দর-কষাকষির লড়াই। হরমুজ খুলবে কি না, যুক্তরাষ্ট্র কতটা চাপ কমাবে, ইরান পারমাণবিক প্রশ্নে কতটা ছাড় দেবে এবং সৌদি-হুতি সংঘাত কোন দিকে যায়— এই চারটি প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে ইরান যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতিতে থামবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্যের আরও বড় সংঘাতে গড়াবে।
source: Rajneete







