News

রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত ভবন!

ভাঙাচোরা ইট-কাঠ, কাঁচের টুকরার ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে রোগীদের ছেঁড়া চিকিৎসাপত্র, জরুরি কাগজপত্র, ওষুধ ও শিশুদের টিকার ভাঙাচোরা কাঁচের শিশি। বিধ্বস্ত কক্ষের বাইরেই তিনটি আমগাছের বড় বড় শাখা কেটে ফেলে রাখা হয়েছে ধ্বংসস্তূপের ওপর। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, শত্রুপক্ষের বোমা হামলায় বিধ্বস্ত একটি ভবন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই ধ্বংসস্তূপ একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের।

রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বর সেকশনের শাহ আলী মাজারের পেছনের এলাকায় চার দশকেরও বেশি সময় ধরে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসা ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার’ নামের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি রাতের আঁধারে গুঁড়িয়ে দেওয়ায় স্থানটি এখন পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) মধ্যরাতে দুই শতাধিক সশস্ত্র ও মুখোশধারী ব্যক্তি ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে এই কেন্দ্রে হামলা চালিয়ে তছনছ করে, অনেক কিছু লুট করে নিয়ে যায়। ফেলে রেখে যায় ধ্বংসলীলার স্মৃতি।

জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭৬ সাল থেকে এলাকার দুস্থ ও নিম্ন আয়ের মা ও শিশুদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃত্বকালীন চিকিৎসা, পরিবার পরিকল্পনা এবং সরকারের বিনামূল্যে পরিচালিত ইপিআই টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছিল। কিন্তু রাতের আঁধারে চালানো এই তাণ্ডবের কারণে কেন্দ্রটির মূল অবকাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং সাময়িকভাবে এর নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে সেবাগ্রহীতা মা ও শিশুরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।

ঘটনার বিবরণ দিয়ে রাড্ডার নির্বাহী পরিচালক ড. নাসরিন আখতার গণমাধ্যমকে জানান, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত ২০০ থেকে ২৫০ জন মুখোশধারী লোক হঠাৎ কেন্দ্রটিতে প্রবেশ করে সেখানকার দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে হাত-পা বেঁধে ফেলে। এরপর তারা ভেতরে থাকা মূল্যবান চিকিৎসা সরঞ্জাম, জরুরি নথিপত্র, ওষুধ ও নগদ অর্থ লুটপাট করে। লুটপাট শেষে ভারী এক্সকাভেটর দিয়ে কেন্দ্রটির একটি পাকা ভবন ও তিনটি আধাপাকা ভবন সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেয়। ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পর হামলাকারীরা ওই জায়গায় ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি’ নামের দুটি সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দিয়ে চলে যায়।

প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, সরকারি কোনো দপ্তর থেকে পূর্ব কোনো নোটিশ না দিয়েই হঠাৎ এ হামলা ও উচ্ছেদ চালানো হয়েছে। এই ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় আনুমানিক দেড় কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে সংস্থাটি নিশ্চিত করেছে। লুট হওয়া সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে নগদ প্রায় ১১ লাখ ৪০ হাজার টাকা, বিনামূল্যে বিতরণের জন্য রাখা প্রায় ৫ লাখ টাকার ওষুধ ও টিকা, ৪৫ লাখ টাকা মূল্যের একটি আল্ট্রাসনোগ্রাফি মেশিন, জেনারেটর, ফ্রিজ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি), সিসিটিভি ক্যামেরা, ল্যাবরেটরি সরঞ্জাম, কম্পিউটার, ল্যাপটপ এবং ফাইল ক্যাবিনেটভর্তি গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র।

সানাউল্লাহ নামের স্থানীয় একজন ব্যক্তি এশিয়া পোস্টকে বলেন, সেদিন রাতে হঠাৎ অনেক শব্দ শুনে আমি বাসা থেকে বের হয়ে এখানে আসি। কিন্তু এখানে অনেক লোক হাতে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রসহ থাকায় ভয়ে আর সামনে আসিনি। পরে সকালে এসে দেখি এই অবস্থা। বহুদিন ধরে এই ক্লিনিকে মানুষ কম টাকায় সেবা নিয়ে থাকে। এটা ভেঙে দেওয়া তো মানুষের ভোগান্তি ছাড়া কিছু না। জমিজমা নিয়ে সমস্যা থাকলে সেটার জন্য আইন আছে। এভাবে সব ধ্বংস করা তো কোনো সমাধান না।

তবে জমি-সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়ে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি’ গণমাধ্যমের কাছে দাবি করে, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ ২০০৬ সালে জমিটি তাদের নামে বরাদ্দ দেয় এবং ২০২১ সালে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করে। কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের কারণে তারা জায়গাটির দখল নিতে পারেনি।

উক্ত ঘটনায় ড. নাসরিন আখতার বাদী হয়ে শাহ আলী থানায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মো. হানিফ মিয়াসহ ২০০ থেকে ২৫০ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন।

মামলার প্রধান আসামি হানিফ মিয়া তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি এই ঘটনার বিষয়ে কিছুই জানেন না।

এ দিকে মামলার তদন্তে নেমে পুলিশ শুক্রবার রাতে অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা হলেন—মো. সোহেল, মো. জুয়েল, জিহাদ হাসান ও মো. রাব্বি।

শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলম জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা টাকার বিনিময়ে এই ভাঙচুরে অংশ নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তাদের অধিকাংশই শাহ আলী মাজার এলাকার ভাসমান ব্যক্তি।

তবে ভাঙচুরের সময় ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত থাকলেও কেন কাউকে তাৎক্ষণিকভাবে আটক করা হয়নি, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন টিকাকেন্দ্রে ভাঙচুরের ঘটনাকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, জনস্বার্থে সরকারি টিকাদান কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খানও ক্ষতিগ্রস্ত স্থান পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন রাতের আঁধারে এভাবে স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়া সমর্থন করে না। জমি নিয়ে বিরোধ থাকলে তা আদালতের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। আমরা হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং ব্যাহত হওয়া টিকাদান কর্মসূচি সচল রাখতে সার্বিক সহায়তা করব।

source: Asia Post

Back to top button