নিশ্চিহ্ন করার হুমকি ট্রাম্পের, একই দিনে ইরানের সঙ্গে বৈঠকে তার দূতরা

ইরানকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করার হুমকি দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি বলছেন, তেহরান সমঝোতায় না এলে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে দ্রুত ধ্বংস করে দেওয়ার বিকল্প তার সামনে খোলা আছে। অথচ সেই হুমকি দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নিউইয়র্কের অন্য এক জায়গায় তারই দুই ঘনিষ্ঠ দূত ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা ধরে বৈঠক করছেন।
একদিকে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত করার হুমকি, অন্যদিকে সেই যুদ্ধ থামাতে আলোচনার চেষ্টা— ইরানকে ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান অবস্থানের এই দ্বৈত চিত্রই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে জাতিসংঘের এবারের অধিবেশন চলাকালে। প্রকাশ্যে ট্রাম্প তেহরানকে চূড়ান্ত চাপ দিচ্ছেন, পর্দার আড়ালে তার দূতরা আবার সেই তেহরানের সঙ্গেই সমঝোতার পথ খুঁজছেন।
মঙ্গলবার জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেন, তাকে এখন ইরানকে নিয়ে ‘বড় সিদ্ধান্ত’ নিতে হবে— হয় ইরানের সঙ্গে এমন একটি চুক্তি করা যার মাধ্যমে দেশটিকে ‘পুনর্গঠন’ করা যায়, অথবা ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে নিশ্চিহ্ন’ দেওয়া। তিনি একই সঙ্গে ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করে আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানান।
ট্রাম্পের ভাষণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে আলোচনায় বসেন। বৈঠকটি কাতারের মধ্যস্থতায় হয় এবং কয়েক ঘণ্টা ধরে চলে। ট্রাম্প পরে সাংবাদিকদের বলেন, বৈঠকটি ‘খুব ভালো’ ও ‘খুব ফলপ্রসূ’ হয়েছে এবং শিগগিরই আরও বৈঠক হতে পারে।
তবে বৈঠকটি নিয়ে দুই পক্ষের বর্ণনায় কিছু পার্থক্যও রয়েছে। ট্রাম্প একে উইটকফ ও কুশনারের সঙ্গে ইরানি প্রতিনিধিদের তিন ঘণ্টার বৈঠক হিসেবে তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে উইটকফ বলেছেন, মধ্যস্থতাকারীরা দুপক্ষের মধ্যে যাতায়াত করে আলোচনা এগিয়ে নিয়েছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম অবশ্য আরাগচি ও উইটকফের বৈঠকের কথা নিশ্চিত করেছে। অর্থাৎ, সরাসরি বৈঠক ও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ— দুই ধরনের বর্ণনাই সামনে এসেছে।
এই বৈঠকের তাৎপর্য এখানেই— ট্রাম্পের প্রকাশ্য হুমকি এবং তার প্রশাসনের গোপন বা পর্দার আড়ালের কূটনীতি একই সময়ে চলছে। ওয়াশিংটন একদিকে সামরিক চাপকে আলোচনার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, অন্যদিকে সেই চাপের মধ্যেই তেহরানের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা যাচাই করছে।
আলোচনার কেন্দ্রে কী?
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ট্রাম্পের নির্দেশেই উইটকফ ও কুশনার ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। আলোচনার প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণসহ এমন কর্মকাণ্ড বন্ধে রাজি করানো, যা যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে দেশটিকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
রুবিওর বক্তব্য অনুযায়ী, আলোচনাকে বড় কোনো অগ্রগতি হিসেবে দেখার মতো পর্যায়ে এখনো পৌঁছানো যায়নি। তবে তার কাছে আলোচনাটি গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে দুপক্ষের মধ্যে যোগাযোগ আবার শুরু হয়েছে।
রুবিও বলেন, ধারণা ও বার্তা বিনিময়ের কোনো সুযোগ থাকলে আমরা তা করব। অর্থাৎ ট্রাম্প প্রশাসন এখনো কূটনীতির সম্ভাবনা পুরোপুরি বন্ধ করেনি। বরং সামরিক চাপের পাশাপাশি আলোচনাকেও একটি বিকল্প পথ হিসেবে খোলা রাখছে।
তবে সেই আলোচনার পরিধি শুধু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা কম। রুবিও স্পষ্ট করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও আলোচনায় আসতে হবে।
ইরানের শর্ত: আগে যুদ্ধ ও অবরোধ বন্ধ
তেহরানের অবস্থান অবশ্য আলাদা। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, কূটনীতি পুনরায় শুরু করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে হবে।
এর মধ্যে রয়েছে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, জব্দ করা ইরানি সম্পদ মুক্ত করা এবং সব ফ্রন্টে শত্রুতা বন্ধ করা।
অর্থাৎ, ওয়াশিংটন যেখানে আলোচনার কেন্দ্রে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে রাখছে, তেহরান সেখানে প্রথমেই যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক চাপ কমানোর প্রশ্ন তুলছে।
হরমুজ প্রণালিও এই দর-কষাকষির কেন্দ্রে চলে এসেছে। ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ কমালে এবং অবরোধ প্রত্যাহার করলে এক সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ আবার খুলে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এতে বোঝা যায়, ইরানও হরমুজকে শুধু সামরিক কৌশলের অংশ হিসেবে নয়, কূটনৈতিক দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করছে।
ব্যবধান এখনো অনেক
তবে কয়েক ঘণ্টার বৈঠক মানেই সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া নয়। বরং দুপক্ষের অবস্থানের বড় ব্যবধান এখনো রয়ে গেছে। ইরান চাইছে যুদ্ধ, নৌ অবরোধ ও অর্থনৈতিক চাপ কমুক। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা এবং হরমুজসহ আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রশ্নে তেহরানের কাছ থেকে ছাড়।
সাবেক মার্কিন ইরানবিষয়ক শীর্ষ আলোচক রবার্ট ম্যালির পর্যবেক্ষণও এই অচলাবস্থার দিকেই ইঙ্গিত করে। তার মতে, দুপক্ষই মনে করছে তাদের হাতে বেশি সুবিধা রয়েছে এবং তারা অন্য পক্ষের তুলনায় বেশি সময় টিকে থাকতে পারবে।
ফলে নিউইয়র্কের বৈঠককে এখনই বড় কূটনৈতিক সাফল্য বলা কঠিন। বরং এটি দেখাচ্ছে, কয়েক মাসের সামরিক সংঘাত ও পালটাপালটি হুমকির পরও দুপক্ষের কেউই আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ করতে চাইছে না।
হুতি ফ্রন্টে নতুন চাপ
এর মধ্যেই ইরানের মিত্র হুতিদের তৎপরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইয়েমেন থেকে হুতিদের অভিযান জোরদার হওয়ায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের সঙ্গে আঞ্চলিক আরেকটি ফ্রন্ট আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হচ্ছে।
বিশেষ করে বাব এল-মান্দেব প্রণালিকে ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে নতুন বাধা তৈরি হলে তার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে গিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
অন্যদিকে হরমুজ প্রণালির অনিশ্চয়তা এরই মধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি করেছে। ইরান ও ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাবে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত হলে পরিবহন ব্যয়, জ্বালানি মূল্য ও সরবরাহব্যবস্থায় আরও চাপ তৈরি হতে পারে।
চীনের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ
ইরান ইস্যুতে কূটনৈতিক সমীকরণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ চীন। ইরানের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকায় তেহরানের ওপর প্রভাব বিস্তারে বেইজিংকে কোনোভাবে যুক্ত করার সম্ভাবনাও আলোচনার বাইরে নয়।
এরই মধ্যে হোয়াইট হাউজে জিনপিংকে লালগালিচা সংবর্ধনা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকও করেছেন। সে বৈঠকে জিনপিং জানিয়েছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর পক্ষেই রয়েছে চীন।
জুনের হামলার পরও কেন দরকার চুক্তি?
এখানে আরেকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ— জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার পরও কেন ওয়াশিংটন আবার আলোচনায় ফিরছে?
রুবিওর যুক্তি, শুধু স্থাপনা ধ্বংস করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর প্রতিশ্রুতি, যেন ইরান ভবিষ্যতে আবার পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে না পারে।
‘যতক্ষণ পর্যন্ত ইরানকে ঘিরে এই ঝুঁকি থাকবে, ততক্ষণ বিশ্বের জন্য এটি একটি গ্রহণযোগ্য ঝুঁকি নয়,’— বলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
এখানেই ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান কৌশলের মূল দ্বৈততা স্পষ্ট হয়। সামরিক শক্তি দিয়ে ইরানের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করা এক বিষয়, কিন্তু সেই সক্ষমতা যেন আবার গড়ে না ওঠে, তার জন্য রাজনৈতিক সমঝোতাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে ওয়াশিংটন।
হুমকি কি আলোচনার কৌশল?
ফলে ট্রাম্পের ‘নিশ্চিহ্ন’ করার হুমকি এবং তাঁলর দূতদের আরাগচির সঙ্গে বৈঠক— দুটিকে আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না।
ওয়াশিংটন একই সঙ্গে চাপ ও আলোচনার পথ ব্যবহার করছে। ট্রাম্পের প্রকাশ্য হুমকি তেহরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ তৈরির বার্তা দিচ্ছে; আর উইটকফ-কুশনারের বৈঠক বলছে, সেই চাপের মধ্যেই একটি সমঝোতার সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে।
তেহরানও পালটা চাপ তৈরি করছে— পারমাণবিক প্রশ্নের পাশাপাশি হরমুজ, অবরোধ, জব্দ সম্পদ এবং যুদ্ধ বন্ধের বিষয়কে একই আলোচনার টেবিলে এনে।
এখন পর্যন্ত নিউইয়র্কের বৈঠক থেকে বড় কোনো সমঝোতা বেরিয়ে আসেনি। কিন্তু বৈঠকটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে— ট্রাম্প যতই ইরানকে ধ্বংসের হুমকি দিন, তার প্রশাসনও জানে যে যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত যেতে হলে কোনো না কোনো পর্যায়ে তেহরানের সঙ্গে কথা বলতেই হবে।
আর সেই কারণেই একই দিনে জাতিসংঘের মঞ্চে ‘নিশ্চিহ্ন’ করার হুমকি এবং কয়েক ঘণ্টার কূটনৈতিক বৈঠক— দুই ছবিই পাশাপাশি দেখা গেল।
নিউইয়র্ক টাইমস ও রয়টার্স অবলম্বনে
source: Rajneete







