টেক্সাসের পাঠ্যক্রম সংশোধন/পাঠ্যবই থেকে বীজগণিতের ‘জনক’ আল-খোয়ারিজমির অবদান বাদ আমেরিকার

সমাজবিজ্ঞান পাঠ্যক্রমের মানদণ্ডে ব্যাপক সংশোধনের অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস স্টেট বোর্ড অব এডুকেশন (এসবিওই)। ২০৩০-৩১ শিক্ষাবর্ষ থেকে ধাপে ধাপে কার্যকর হতে যাওয়া এই সংশোধিত পাঠ্যক্রমে মধ্যযুগীয় গণিতে পারস্যের মুসলিম গণিতবিদ মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খোয়ারিজমির ঐতিহাসিক অবদান বাদ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, হলোকাস্ট ও ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে বিতর্কিত পরিবর্তন আনায় এ নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা।
অনুমোদিত পরিবর্তন অনুযায়ী, টেক্সাসের উচ্চবিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে বীজগণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের মতো মৌলিক ক্ষেত্রে মুসলিমদের অবদান পড়ানো আর বাধ্যতামূলক নয়। অথচ বিশ্বব্যাপী প্রচলিত ‘বীজগণিত’ বা ‘Algebra’ শব্দটির ভাষাগত উৎস আরবি ‘আল-জাবর’ থেকে এসেছে। নবম শতাব্দীতে পারস্যের মুসলিম গণিতবিদ মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খোয়ারিজমি তার বিশ্বখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-কিতাব আল-মুখতাসার ফি হিসাব আল-জাবর ওয়াল-মুকাবালা’ রচনা করেন।
গ্রন্থটির শিরোনামে ব্যবহৃত ‘আল-জাবর’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ ‘পুনরুদ্ধার’ বা ‘সম্পূর্ণতা’, যা মূলত সমীকরণের গাণিতিক কৌশল নির্দেশ করত। মধ্যযুগে এই কৌশলটি লাতিন ভাষায় ‘অ্যালজেব্রা’ নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায়। আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (এসটিইএম) শিক্ষার এই মৌলিক ভিত্তি পাঠ্যক্রম থেকে ছেঁটে ফেলার মাধ্যমে বিজ্ঞানের প্রারম্ভিক ইতিহাসকে অস্পষ্ট করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সমালোচকেরা।
পাঠ্যক্রমের সরকারি নথিতে (‘প্রস্তাবিত নতুন ১৯ টিএসি-এর পাঠ্য’) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও বৈশ্বিক সংকটবিষয়ক উপধারা ২৪-এ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে।
মূল মানদণ্ডে থাকা ‘হলোকাস্টের কারণ ও পরিণতি ব্যাখ্যা করুন, যার মধ্যে রয়েছে ইহুদিদের ওপর নাৎসি গণহত্যা এবং আধুনিক ইসরায়েল রাষ্ট্রের সৃষ্টি’ সংক্রান্ত নির্দেশনার সম্পূর্ণ বিলোপ ঘটানো হয়েছে। পরিবর্তে হলোকাস্টকে নাৎসি শাসনের রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, ইহুদি-বিদ্বেষ এবং এর জনসংখ্যাগত পরিণতি ও ‘গণহত্যা’ শব্দটির প্রয়োগ হিসেবে কয়েকটি পৃথক উপ-প্রয়োজনীয়তায় ভাগ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে অনুচ্ছেদ (এফ)-এ নতুন একটি নির্দেশনা যুক্ত করে শিক্ষার্থীদের পাঠদানে বলা হয়েছে, ‘কীভাবে ইহুদি জনগণের পৈতৃক নিবাস ইসরায়েল, ১৯৪৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল’।
আল-খোয়ারিজমির মতো মুসলিম পণ্ডিতদের গণিত ও বিজ্ঞানের অবদান পাঠ্যবই থেকে বাদ দেওয়া এবং তার বদলে যুদ্ধ ও সংঘাতের বিষয়গুলোতে বেশি নজর দেওয়াকে একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন সমালোচকেরা।
তারা বলছেন, এর আগে যেভাবে আমেরিকার মূল অধিবাসীদের (আদিবাসী) বাস্তুচ্যুত করার ইতিহাস আড়াল করা হয়েছিল, ঠিক একইভাবে এখন আরব ও মুসলিমদের ইতিহাসও মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসকে নিজেদের মতো করে বদলে ফেলার এবং অপ্রিয় সত্য গোপন করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়াস। ফলে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী সমাজে অবহেলিত হবে এবং নতুন প্রজন্মও বিশ্ব ইতিহাসের সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ রূপটি জানা থেকে বঞ্চিত হবে।
source: Asia Post






