যুদ্ধ-সংকটে নিউইয়র্কে বিশ্বনেতারা, আলোচনার কেন্দ্রে ইরান-গাজা-ইউক্রেন

বিশ্ব জুড়ে একের পর এক যুদ্ধ, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের মধ্যেই নিউইয়র্কে শুরু হয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের হাই-লেভেল সপ্তাহ। আর একদিন পরই শুরু হবে মূল সাধারণ বিতর্ক। এবারের অধিবেশনের প্রতিপাদ্য— আস্থা পুনরুদ্ধার, পরিবর্তন সামলানো: সবার জন্য কার্যকর একটি জাতিসংঘ।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে এবারের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরু হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে চার দশক পর ফের এই বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মের সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছে বাংলাদেশ।
অধিবেশনে আগামী মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) শুরু হচ্ছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ সাধারণ বিতর্ক। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও এতে অংশ নেবেন। এর জন্য সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ঢাকা থেকে নিউইয়র্কের পথে রওয়ানা হওয়ার কথা রয়েছে তার।
জাতিসংঘের এবারের অধিবেশনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ ছয় মাসে গড়ানোর পরও সংকটের কোনো স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান হয়নি। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া, জ্বালানি সরবরাহে চাপ ও যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে।
নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতাদের বৈঠকেও যুদ্ধের পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এবারের ইউএনজিএতে আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের পাশাপাশি নেতাদের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক ও অনানুষ্ঠানিক বৈঠকগুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
গাজা ও ফিলিস্তিন ইস্যুও বড় জায়গা দখল করবে এবারের অধিবেশনে। গাজায় চলমান যুদ্ধ ও মানবিক সংকট নিয়ে ইউরোপীয় ও আরব দেশগুলোর চাপের মুখে পড়তে পারে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। তবে এবারের অধিবেশনে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস সরাসরি নিউইয়র্কে উপস্থিত থাকতে পারছেন না। যুক্তরাষ্ট্র তার ভিসা প্রত্যাখ্যান করেছে, ফলে তিনি ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেবেন।
ইরানের ক্ষেত্রেও এবারের অধিবেশন আলাদা গুরুত্ব বহন করছে। যুদ্ধ চললেও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান নিউইয়র্কে যাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্র ইরানি প্রতিনিধিদলের শীর্ষ নেতাদের ইউএনজিএতে অংশ নেওয়ার ভিসা অনুমোদন করেছে। ফলে একই মঞ্চে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য থেকে যুদ্ধের রাজনৈতিক অবস্থান ও সম্ভাব্য কূটনৈতিক পথ সম্পর্কে নতুন বার্তা আসতে পারে।
ইউক্রেন যুদ্ধও আলোচনার অন্যতম কেন্দ্র। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ও রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ দুজনই নিউইয়র্কে থাকছেন। এর পাশাপাশি জেলেনস্কি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠকের আয়োজনের চেষ্টা চলছে। যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্পের মধ্যস্থতার উদ্যোগ, রাশিয়ার ওপর নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং ইউক্রেনের সামরিক সহায়তা— সবই আলোচনায় থাকবে।
এবারের ইউএনজিএতে জাতিসংঘের নিজের ভবিষ্যৎও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হচ্ছে। তার উত্তরসূরি নির্বাচন নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে এরই মধ্যে একাধিক অনানুষ্ঠানিক ভোট হয়েছে এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখনো উন্মুক্ত। একই সঙ্গে জাতিসংঘের অর্থসংকট, সংস্কারের প্রয়োজন, নিরাপত্তা পরিষদের কার্যকারিতা ও বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা হবে।
এর বাইরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ঝুঁকি ও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা, জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ থাকবে জাতিসংঘ অধিবেশনের আলোচনায়। জাতিসংঘ বলছে, এবারের অধিবেশনের লক্ষ্য শুধু সংকট নিয়ে বক্তব্য দেওয়া নয়, বরং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনা।
সব মিলিয়ে এবারের ইউএনজিএ কার্যত ইরান যুদ্ধ, গাজা ও ইউক্রেন যুদ্ধের কূটনৈতিক মঞ্চ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ নিজেই কতটা কার্যকরভাবে এসব সংকট মোকাবিলা করতে পারছে— সেটিও এবার বিশ্বনেতাদের আলোচনার বড় বিষয়।
সূত্র: রয়টার্স, আল-জাজিরা, এপি
source: Rajneete







