News

হরমুজ নিয়ে নতুন পরিকল্পনায় ইরান-ওমান

হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে একটি অস্থায়ী নৌ-করিডোর তৈরির পরিকল্পনা করেছে ইরান ও ওমান। একই সঙ্গে প্রণালিতে সম্ভাব্য মাইন অপসারণে যৌথ উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ ও উত্তেজনার কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত থাকার মধ্যে তেহরান ও মাসকাটের নতুন এই উদ্যোগকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এ উদ্যোগ চলমান পরিস্থিতিতে একটি অগ্রগতি হলেও এখনই হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে যাচ্ছে না।

আল-জাজিরা ও বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার তেহরানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদির বৈঠকে অস্থায়ী নৌ-করিডর ও মাইন অপসারণ নিয়ে আলোচনা হয়।

পরে দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ধাপে ধাপে একটি বাস্তবসম্মত কাঠামোর মাধ্যমে প্রণালিতে নৌযান চলাচল পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে একটি স্থায়ী নৌ-করিডর ও প্রণালির দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার বিষয়েও কারিগরি আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে।

কেমন হবে নতুন করিডর

ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত অস্থায়ী করিডরটির প্রস্থ হবে প্রায় ৭ নটিক্যাল মাইল বা ১১ দশমিক ৩ কিলোমিটার। এর প্রবেশপথ ইরানের আঞ্চলিক জলসীমা দিয়ে ও বের হওয়ার পথের একটি অংশও ইরানের জলসীমার মধ্য দিয়ে যাবে।

ইরানের ভাষ্য, এই রুট ব্যবহার করে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে প্রণালির মধ্য দিয়ে তুলনামূলক নিরাপদে চলাচলের সুযোগ দেওয়া হবে। তবে সুনির্দিষ্ট স্থানাঙ্ক, কখন থেকে জাহাজ চলাচল শুরু হবে এবং কোন ধরনের জাহাজ এই রুট ব্যবহার করতে পারবে— এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড আইআরজিসির এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রণালির জলসীমা ব্যবস্থাপনা এবং সেখান থেকে পাওয়া রাজস্বে ইরান ও ওমানের অংশ নিয়েও দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। তবে এসব ব্যবস্থার বিস্তারিত এখনও প্রকাশ করা হয়নি।

মাইন অপসারণেও যৌথ উদ্যোগ

নতুন পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো হরমুজের জলপথ থেকে মাইন অপসারণ। যুদ্ধের সময় প্রণালিতে মাইন পাতা হয়েছে কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পালটাপালটি অভিযোগ রয়েছে। ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে প্রণালিতে মাইন পুঁতে রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।

মঙ্গলবারের বৈঠকে দুই দেশ সম্ভাব্য মাইন অপসারণ কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা করেছে। এর লক্ষ্য হলো বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য ঝুঁকি কমানো এবং ধাপে ধাপে স্বাভাবিক নৌ-চলাচল ফিরিয়ে আনা।

তবে এখানে একটি অদ্ভুত সমান্তরাল পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এরই মধ্যে দাবি করেছেন, মার্কিন নৌ বাহিনী হরমুজের প্রধান জাহাজ চলাচলের পথ থেকে মাইন সরিয়ে ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তাও ওই দাবি সমর্থন করেছেন। ফলে ইরান-ওমানের যৌথ মাইন অপসারণ পরিকল্পনা ঠিক কোন এলাকায় এবং কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

এখনই খুলছে না হরমুজ

ইরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, অস্থায়ী করিডরের বিষয়ে সমঝোতা মানেই হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়া নয়। গারিবাবাদি বলেছেন, এটি একটি সাময়িক রুট মাত্র। ইরানের সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্রও জানিয়েছেন, জাহাজগুলোকে প্রণালিতে প্রবেশের আগে ইরানের নজরদারির আওতায় থাকতে হবে এবং অনুমতি পাওয়ার পরই চলাচল করতে পারবে।

তেহরান একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় অচলাবস্থার কথাও সামনে এনেছে। ইরানের অবস্থান— ওয়াশিংটনকে আগের সমঝোতার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে, বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছাড়ার বিষয়গুলোতে অগ্রগতি প্রয়োজন।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে ইরানের ওপর নতুন অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে। ফলে হরমুজের নৌব্যবস্থা নিয়ে ইরান-ওমানের সমঝোতা হলেও বৃহত্তর ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংকটের সমাধান ছাড়া স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল কতটা ফিরবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

বিশ্ববাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া

হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন হতো। যুদ্ধের পর প্রণালিটি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। মঙ্গলবার মাত্র পাঁচটি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করেছে, যেখানে গত ১০ দিনের গড় ছিল প্রায় ১৫টি।

ইরান ও ওমানের নতুন উদ্যোগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর অবশ্য বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমেছে। ব্রেন্ট ও ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট— দুই ধরনের অপরিশোধিত তেলের দামই দুই সপ্তাহের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। বাজারের এই প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, হরমুজে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার সামান্য সম্ভাবনাও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব ফেলছে।

স্থায়ী সমাধানের পথে কতটা এগোল দুই দেশ?

অস্থায়ী করিডর মূলত তাৎক্ষণিক সংকট সামলানোর উদ্যোগ। ইরান ও ওমান এখন দীর্ঘমেয়াদে প্রণালির নৌ চলাচল কীভাবে পরিচালিত হবে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে, তথ্য আদান-প্রদান হবে এবং নেভিগেশন ও নিরাপত্তা সেবা দেওয়া হবে— এসব নিয়ে কারিগরি আলোচনায় যেতে চায়। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে হরমুজ ব্যবস্থাপনার জন্য স্থায়ী সমাধান নিয়ে আলোচনা হবে।

এখানেই উদ্যোগটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি। হরমুজ শুধু একটি নৌ পথ নয়, এটি ইরান, ওমানসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা, তেল রপ্তানি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে অস্থায়ী করিডর সফল হলে তা শুধু কয়েকটি জাহাজের চলাচল পুনরুদ্ধার করবে না, বরং যুদ্ধের পর হরমুজকে ঘিরে নতুন আঞ্চলিক নৌব্যবস্থা তৈরির প্রথম ধাপ হয়ে উঠতে পারে।

তবে সেই পথ এখনো দীর্ঘ। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ, ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা, প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তেহরান-ওয়াশিংটনের বিরোধ এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি— সব মিলিয়ে হরমুজের পূর্ণাঙ্গ স্বাভাবিকতা এখনো নির্ভর করছে বৃহত্তর ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংকটের ওপর।

source: Rajneete

Back to top button