News

মামলায় হার, প্রিন্স হ্যারিসহ ৭ বাদীর ডেইলি মেইল প্রকাশককে দিতে হবে ১৫৯ কোটি টাকা

গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অভিযোগে করা মামলায় হেরে গেছেন ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স হ্যারি, সংগীতশিল্পী এলটন জনসহ সাতজন। এখন ডেইলি মেইলের প্রকাশক অ্যাসোসিয়েটেড নিউজপেপার্সের আইনি খরচ বাবদ অন্তর্বর্তীকালীন পরিশোধ হিসেবে তাদের দিতে হবে ৯৫ লাখ ৪০ হাজার পাউন্ড, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৫৯ কোটি টাকা।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, শুক্রবার (২১ আগস্ট) মামলার খরচ-সংক্রান্ত রায়ে এই অর্থ দিতে নির্দেশ দিয়েছেন ব্রিটিশ বিচারক ম্যাথিউ নিকলিন। আগামী ২৮ আগস্টের মধ্যে অর্থের এই প্রাথমিক পরিশোধ করতে হবে। মামলাটি যেভাবে পরিচালনা করা হয়েছে, তা অত্যন্ত ‘অযৌক্তিক’ ছিল বলেও মন্তব্য করেন বিচারক।

তবে অ্যাসোসিয়েটেড নিউজপেপার্সের মোট আইনি খরচ কতটা বাদীদের দিতে হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। অযৌক্তিক হিসেবে বিবেচিত খরচের বিষয়ে আদালত আলাদাভাবে সিদ্ধান্ত দেবেন। দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা না হলে আলাদা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেই খরচ নির্ধারণ করা হবে।

বিচারক ম্যাথিউ নিকলিন বলেছেন, এসব অতিরিক্ত খরচ ‘ইনডেমনিটি বেসিসে’ পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ, এসব খরচ যুক্তিসংগত ও আনুপাতিক ছিল কি না, তা প্রকাশককে আলাদাভাবে প্রমাণ করতে হবে না।

মামলার ৭ বাদীর হলেন— প্রিন্স হ্যারি, এলটন জন, ডোরিন লরেন্স, ডেভিড ফার্নিশ, স্যাডি ফ্রস্ট, লিজ হার্লি এবং সাবেক লিবারেল ডেমোক্র্যাট মন্ত্রী সাইমন হিউজ। গত মাসে মূল মামলাটি পুরোপুরি খারিজ করে দেন বিচারক নিকলিন।

ডেইলি মেইল ও এর সংশ্লিষ্ট প্রকাশনাগুলো ব্যাপকভাবে বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল— বাদীদের এমন অভিযোগও আদালত গ্রহণ করেননি। এসব অভিযোগের মধ্যে ফোন হ্যাকিংয়ের মতো কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গও ছিল।

মামলা পরিচালনার ধরন নিয়ে সমালোচনা

খরচ-সংক্রান্ত রায় দিতে গিয়ে মামলাটি পরিচালনার ধরন নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন বিচারক নিকলিন। তিনি বলেন, বাদীদের করা কিছু গুরুতর অভিযোগের ভিত্তি ছিল অনুমান ও পরোক্ষ তথ্যের ওপর। আবার কোনো অভিযোগ আর এগিয়ে নেওয়া হবে না— এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পরও সেগুলো প্রত্যাহার করা হয়নি।

বিচারক ম্যাথিউ নিকলিনের মতে, এসব বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করলে মামলাটি স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়ার তুলনায় অনেকটাই ব্যতিক্রমী হয়ে ওঠে। বাদীদের আচরণ তিনি ‘অত্যন্ত অযৌক্তিক’ বলে উল্লেখ করেন।

এদিকে অ্যাসোসিয়েটেড নিউজপেপার্সের এক মুখপাত্র মামলার রায়টিকে ডেইলি মেইল ও তাদের সাংবাদিকতার জন্য ‘আরেকটি বড় বিজয়’ বলে মন্তব্য করেছেন।

তবে হ্যারির মুখপাত্র এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। এর আগে জুলাইয়ে মামলাটি খারিজ হওয়ার পর হ্যারি রায়টিকে ‘সম্পূর্ণ ও স্পষ্টভাবে সাজানো’ বলে মন্তব্য করেছিলেন।

প্রকাশকের আইনি খরচ ৫৭৫ কোটি টাকার বেশি

জুলাইয়ে মামলার খরচ নিয়ে শুনানির সময় আদালতকে জানানো হয়, অ্যাসোসিয়েটেড নিউজপেপার্সের আইনি খরচ দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৪৫ লাখ পাউন্ডে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ৫৭৫ কোটি টাকার বেশি।

অন্যদিকে হ্যারি ও অন্য বাদীদের বিমা পলিসিতে আইনি খরচের জন্য ১ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ড পর্যন্ত কভারেজ ছিল। ফলে প্রকাশকের মোট আইনি খরচের তুলনায় তাদের বিমার অর্থ অনেক কম।

অ্যাসোসিয়েটেড নিউজপেপার্সের আইনজীবী অ্যান্টনি হোয়াইট বলেন, বাদীরা অনেক গুরুতর অভিযোগ করেছিলেন। কিন্তু এসব অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ ছিল না। এর ফলে মামলার খরচও বেড়েছে।

রায়ের পর প্রিন্স হ্যারির দেওয়া বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন হোয়াইট। তার দাবি, নিজের অবস্থান ও তারকা খ্যাতির কারণে হ্যারি যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা ছিল ওই অবস্থানের অপব্যবহার।

অন্যদিকে বাদীদের আইনজীবী নিকোলাস বেকন অ্যাসোসিয়েটেড নিউজপেপার্সের ৩ কোটি ৪৫ লাখ পাউন্ডের আইনি বিলকে অত্যন্ত বড় অঙ্কের বলে উল্লেখ করেন। তার মতে, এই খরচ আগে নির্ধারিত বাজেটের তুলনায় অনেক বেশি।

প্রমাণ দিতে ব্যর্থ বাদীরা

১১ সপ্তাহের শুনানি শেষে গত মাসে হ্যারি ও অন্যদের মামলা খারিজ করেন বিচারক নিকলিন। তিনি বলেন, বাদীদের প্রমাণ করতে হতো যে তাদের সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্য বেআইনিভাবে সংগ্রহ করা হয়েছিল। কিন্তু তারা তা পারেননি।

শুধু সন্দেহের ওপর ভিত্তি করে বেআইনিভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল— এমন দাবি প্রতিষ্ঠা করা যায় না বলেও জানান বিচারক। তার দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে হ্যারি ও অন্য বাদীরা আপিল করবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে হ্যারির দীর্ঘ লড়াই

সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে প্রিন্স হ্যারির বিরোধ দীর্ঘদিনের। ১৯৯৭ সালে প্যারিসে গাড়ি দুর্ঘটনায় তার মা প্রিন্সেস ডায়ানার মৃত্যুর জন্য সংবাদমাধ্যমের অতিরিক্ত অনুসরণকে তিনি দায়ী করে আসছেন।

নিজের স্ত্রী মেগানের সঙ্গেও সংবাদমাধ্যমের আচরণের সমালোচনা করেছেন হ্যারি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, ডেইলি মেইলের কারণে মেগানের জীবন ‘একেবারে দুর্বিষহ’ হয়ে উঠেছিল।

এর আগে ডেইলি মিররের প্রকাশকের বিরুদ্ধে করা মামলায় জয় পেয়েছিলেন হ্যারি। রুপার্ট মারডকের মালিকানাধীন ব্রিটিশ সংবাদপত্র বিভাগের সঙ্গেও একটি মামলা মীমাংসা করেছিলেন তিনি।

তবে ডেইলি মেইলের প্রকাশকের বিরুদ্ধে সর্বশেষ মামলার এই রায় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে তার দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সম্প্রতি জানা গেছে, ২০২০ সালে রাজপরিবারের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর পর যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাসরত হ্যারি স্ত্রী মেগান ও দুই সন্তানকে নিয়ে আবার যুক্তরাজ্যে ফিরে বসবাসের পরিকল্পনা করছেন। এই সময়েই মামলার খরচ বাবদ বড় অঙ্কের অর্থ দেওয়ার নির্দেশ পেলেন তিনি।

source: Rajneete

Back to top button