পরমাণু চুক্তির আশায় ‘গুঁড়ে বালি’, ইরান যুদ্ধের সমাপ্তি হরমুজের দরজায়?

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরমাণু চুক্তি ছাড়াই সংঘাত শেষ করে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়াকে যুদ্ধের বিজয় হিসেবে তুলে ধরার পরিকল্পনা নিয়েও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন তিনি। তবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার বিনিময়ে ইরানের কঠোর শর্ত সেই পথও ক্রমেই কঠিন করে তুলছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
রোববার (৯ আগস্ট) প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েক সপ্তাহ ধরে ট্রাম্প এমন একটি পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছিলেন, যাতে ইরান হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দিলে সেটিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিজয় হিসেবে দেখিয়ে যুদ্ধ থেকে সরে আসা যায়। কিন্তু তেহরান এখন এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ, অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, ইরানের ওপর নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করার দাবি তুলেছে। এর সঙ্গে আরও একাধিক শর্ত যুক্ত করেছে দেশটি।
ফলে যুদ্ধ থেকে ‘মুখরক্ষা করে’ বেরিয়ে আসার ট্রাম্পের সুযোগ আরও সংকুচিত হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তিনি একদিকে ইরানের বিরুদ্ধে আরও বড় সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছেন, অন্যদিকে হামলা বন্ধ করে আলোচনার পথও খোলা রেখেছেন। তবে সর্বশেষ কূটনৈতিক অচলাবস্থা ইঙ্গিত দিচ্ছে, তেহরান দীর্ঘ ও কঠিন সংঘাতের জন্যও প্রস্তুত।
ওয়াশিংটনের থিংকট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির পরিচালক মোনা ইয়াকুবিয়ান বলেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য ইরানের সাম্প্রতিক কঠোর শর্ত ট্রাম্পের জন্য সংঘাত থেকে ‘মুখরক্ষাকারী প্রস্থানপথ’ তৈরি করা ক্রমেই কঠিন করে তুলছে।
ইউরেশিয়া গ্রুপের ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ গ্রেগরি ব্রিউয়ের মতে, তেহরান পুরোপুরি বিশ্বাস করে যে ট্রাম্প যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে চান এবং তার প্রধান লক্ষ্য এখন হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া। এ কারণেই ইরান কঠোর অবস্থান নিয়ে দর-কষাকষি করছে।
পরমাণু কর্মসূচি নয়, ট্রাম্পের নজর এখন হরমুজে
এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে ছিল ওয়াশিংটনের একটি শর্ত— ইরান কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না। শুরুতে ট্রাম্প পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনাকে ইরানের সঙ্গে বৃহত্তর সমঝোতার অংশ করতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু সেই আলোচনা অত্যন্ত কঠিন হয়ে ওঠায় সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হোয়াইট হাউজের অগ্রাধিকার ধীরে ধীরে বদলে যায়। এখন ট্রাম্পের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু করা।
যুদ্ধ শুরুর পর ইরান কার্যত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ বন্ধ করে দেয়। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে তেহরান। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যায় এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো।
হরমুজকে কেন্দ্র করে তৈরি এই চাপ ইরানের হাতে শক্তিশালী কূটনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্প একাধিকবার দাবি করেছিলেন, প্রণালিটি পুরোপুরি খুলে গেছে। কিন্তু প্রতিবারই তার দাবি বাস্তবতার তুলনায় আগাম হয়ে গেছে।
ইরানের শর্ত আরও কঠোর
শনিবার হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে একগুচ্ছ কঠোর দাবি সামনে আনে ইরান। দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদর রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএকে বলেন, প্রণালি খুলতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে, নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে এবং অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা সরিয়ে নিতে হবে।
এর পাশাপাশি ইরানের ওপর থেকে সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিশ্ব জুড়ে জব্দ করা ইরানি সম্পদ মুক্ত করে দেওয়া, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং ইরানের বিরুদ্ধে হুমকি ও অপমানজনক বক্তব্য বন্ধ করার দাবিও জানিয়েছে তেহরান। ইরানের আঞ্চলিক মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযান বন্ধের দাবিও রয়েছে তাদের তালিকায়।
অর্থাৎ, হরমুজ প্রণালি শুধু জাহাজ চলাচলের প্রশ্নে আটকে নেই; এর সঙ্গে যুদ্ধের সামগ্রিক পরিণতি, মার্কিন সামরিক উপস্থিতি, নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণ এবং মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের সামরিক নীতিও জড়িয়ে গেছে।
এর আগে ইরান জানিয়েছিল, যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালিতে কোনো মার্কিন যুদ্ধজাহাজ প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে রাজস্ব আদায়ের বিষয়েও তেহরান আগ্রহী। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য জানিয়েছে, ইরানের এমন কোনো বিধিনিষেধ বা টোল আরোপ তারা মেনে নেবে না।
ট্রাম্পের সামনে জ্বালানির দামও বড় চাপ
ট্রাম্পের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতায়। আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর তিন মাসেরও কম সময় বাকি। অথচ যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম এখনও অনেক বেশি।
অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকার (এএএ) হিসাবে শনিবার দেশটিতে গড়ে এক গ্যালন পেট্রলের দাম ছিল ৪ দশমিক ০২ ডলার। এক বছর আগে যা ছিল ৩ দশমিক ১৬ ডলার। যদিও এক সপ্তাহ আগের তুলনায় দাম সামান্য কমেছে।
এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের জন্য যুদ্ধকে বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করে দ্রুত সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তিনি এমনও বলেছেন যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় সামরিক হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা তাকে তা থেকে বিরত করেছে।
একই সময়ে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি ‘অতি শিগগিরই’ হতে যাচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত সেই চুক্তি বাস্তবে রূপ নেয়নি।
শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প এমন একটি প্রতিবেদনও শেয়ার করেন, যার শিরোনাম ছিল— ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন।’ এতে পরমাণু সমঝোতা না হলেও যুদ্ধের ফলকে নিজের বিজয় হিসেবে তুলে ধরার প্রস্তুতি যে তার মধ্যে রয়েছে, সেটিও স্পষ্ট হয়েছে।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ফক্স নিউজকে বলেছেন, ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক পরিবর্তনে চাপ দেওয়া অব্যাহত থাকবে। তা না হলেও যুক্তরাষ্ট্র চাপ প্রয়োগ করে যাবে এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে যতটা সম্ভব তেল ও গ্যাস বাজারে এনে মার্কিন নাগরিকদের জ্বালানি ব্যয় কমানোর চেষ্টা করবে। ‘আমরা খেলার মাঝখানে আছি,’ বলেন ভ্যান্স।
পরমাণু কর্মসূচি নিয়েও ট্রাম্পের হিসাব
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ট্রাম্প সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বলেছেন, গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি প্রধান পরমাণু স্থাপনা ধ্বংস করার পর তার প্রেসিডেন্ট থাকার সময়ে তেহরানের পক্ষে সেই কর্মসূচি পুনরায় চালু করা সম্ভবত কঠিন হবে।
ট্রাম্পের ধারণা, মার্কিন গোয়েন্দা নজরদারি ইরান নতুন করে এসব স্থাপনা নির্মাণ বা গোপনে পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা করলে তা শনাক্ত করতে পারবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে আবারও মার্কিন হামলার আশঙ্কা ইরানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করবে বলেও তিনি মনে করেন।
এই হিসাব থেকে ট্রাম্পের কাছে একটি সম্ভাব্য সমঝোতার কাঠামো দাঁড়াচ্ছে— ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে থাকবে, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে যাবে এবং যুদ্ধবিরতি অনির্দিষ্টকাল চালু থাকবে। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধও তুলে নেওয়া হতে পারে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তবে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি অর্থনৈতিক। ইরান শুধু যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার চাচ্ছে না, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জব্দ করা নিজেদের সম্পদও মুক্ত করার দাবি জানিয়েছে।
ট্রাম্প অবশ্য বলে আসছেন, কোনো মার্কিন করদাতার অর্থ ইরানকে দেওয়া হবে না। কিন্তু সমঝোতা করতে হলে ইরানের কিছু জব্দ করা সম্পদ শর্তসাপেক্ষে ছাড়ার প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরেকটি বিতর্কিত বিষয় হলো ইরানকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রির সুযোগ দেওয়া। গত জুনে একটি অন্তর্বর্তী শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল বিক্রির ওপর কিছু ছাড় দিতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু হরমুজে ইরানের হামলার পর সেই যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে ওয়াশিংটন আবার ইরানের তেল বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা ফিরিয়ে আনে।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও পদক্ষেপে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার ইচ্ছা স্পষ্ট হলেও হরমুজ প্রণালি এখন তার জন্য সেই সহজ ‘জয়ের দরজা’ হয়ে উঠছে না। ইরান বরং জলপথটি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে এমন সব রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক শর্ত সামনে এনেছে, যা মেনে নেওয়া ওয়াশিংটনের জন্য একই সঙ্গে কৌশলগত ও রাজনৈতিকভাবে কঠিন।
ফলে যুদ্ধ শেষ করার চেয়ে এখন ট্রাম্পের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে— কীভাবে এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছানো যায়, যাকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিজয় হিসেবে দেশে তুলে ধরতে পারবেন।
source: Rajneete







