উত্তরাধিকার বিষয়ে হাদিসে যা বলা হয়েছে

পবিত্র কোরআনের পর ইসলামের দ্বিতীয় উৎস হলো হাদিস। কোরআন ও হাদিস ইসলামের মূলভিত্তি। কোরআনের বহু জায়গায় নামাজের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কিন্তু এর বিস্তারিত নিয়ম-কানুন কোথাও পাওয়া যায় না। তাই এগুলোর নিয়ম-কানুন জানার জন্যে হাদিসে নববির প্রয়োজন হয়। এমন অনেক বিষয়ের বিস্তারিত জানতে প্রয়োজন হাদিস।
উত্তরাধিকার আইন নিয়ে হাদিসে অনেক নির্দেশনা দিয়েছেন হজরত মুহাম্মদ (সা.)। ফারায়েজ সম্পর্কে হাদিসের বিধানসহ নানা বিষয় নিয়ে ‘ফারায়েজ আইন’ শীর্ষক একটি বই লিখেছেন গাজী শামসুর রহমান। বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১৫ থেকে ১৯ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘ফারায়েজ সম্পর্কে আল-হাদিস’ নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি।
নিবন্ধের প্রথমেই লেখক মহানবীর হাদিস বর্ণনা করেছেন। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত উত্তরাধিকারীকে তার জন্য নির্ধারিত অংশ প্রদান করো। এরপর যা কিছু অবশিষ্ট থাকে তা পাবে ঘনিষ্ঠ পুরুষ উত্তরাধিকারীরা।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

আরেক হাদিসে আনাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো বংশের বোনের ছেলে তাদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
আবদুল্লাহ ইবন আমর (রা.) বলেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুই ভিন্ন ধর্মের মানুষ একে অন্যের ওয়ারিস হবে না।’ (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ এবং তিরমিজি)
আবু হুরায়রা বলেন, আল্লাহর রাসুল বলেছেন, ‘হত্যাকারী ওয়ারিস হয় না।’ (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)
বুরায়দা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) মা না থাকলে দাদি-নানির জন্য ছয় ভাগের একভাগ নির্দিষ্ট করেছেন।’ (আবু দাউদ)
জাবের (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর যখন শিশু নিঃশ্বাস গ্রহণ করে, তখন তার জন্য দোয়া করা হয় এবং সে ওয়ারিস হয়।’ (ইবনে মাজাহ ও দারেমি)

মিকদাম (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যার অন্য কোনো ওয়ারিস নেই খালুই তার ওয়ারিস; তিনি তার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবেন এবং তাকে দায়মুক্ত করবেন।’ (আবু দাউদ)
আমর ইবনে শোয়াইব তার বাবা থেকে এবং তার বাবা তার বাবা থেকে শুনে বলেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘স্বাধীন বা বাদীর সাথে সম্ভোগজাত সন্তান অবৈধ। ওই সন্তান ওয়ারিস হয় না বা তা থেকে কেউ মিরাস পায় না।’ (তিরমিজি)
আলি (রা.) বলেন, ‘তোমরা এ আয়াত পড়, যে অয়াতে বলা হয়েছে, দেনা শোধের পর দান এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, অসিয়তের আগে দেনা। তিনি আরও নির্দেশ দিয়েছেন, বৈপিত্রেয় সহোদররা বৈমাত্রেয় সন্তানগণের অনুপস্থিতিতে ওয়ারিস হবে। এক পিতামাতার ঔরস ও গর্ভজাত ভাই, শুধু এক পিতার ঔরসজাত ভাইয়ের আগে ওয়ারিস হবে।’ দারেমির রেওয়ায়াতে বলা হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সহোদর ভাইয়েরা বৈমাত্রেয় ভাইদের আগে ওয়ারিস হয়।’

ইমরান ইবনে হোসাইন বলেন, ‘এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বলল, আমার ছেলের ছেলে মারা গেছে, তার মিরাসে আমার অংশ কতটুকু? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তোমার জন্য এক-ষষ্ঠাংশ। যে চলে গেলে তাকে আহ্বান করে রাসুলুল্লহ (সা.) বললেন, তোমার জন্য আরও এক-ষষ্ঠাংশ। লোকটি চলে গেলে আবার তাকে ঢেকে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, শেষ ষষ্ঠাংশ তোমার জন্য ব্যবস্থা করা হলো।’ (আহমদ, আবু দাউদ)
কাবসা ইবনে জুয়াইব বলেন, ‘দাদি হজরত আবু বকর (রা.)-এর কাছে এসে তার মিরাস সম্পর্কে জানতে চাইলে, তিনি বললেন, আল্লাহর কিতাব কোরআনে তোমার জন্য কোনো অংশ নির্দিষ্ট নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ থেকেও কোনো উল্লেখ পাওয়া যানি। সুতরাং তুমি ফিরে যাও, আমি এ সম্পর্কে লোকদের কাছে জিজ্ঞেস করি। এরপর তিনি অনুসন্ধান করলেন। মুগিরা ইবনে শোবা বললেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট উপস্থিত ছিলাম, তিনি দাদীকে এক ষষ্ঠাংশ দিয়েছেন। আবু বকর (রা.) প্রশ্ন করলেন, তোমার সঙ্গে কি আরও কেউ ছিল? তিনি বললেন, মুহম্মদ ইবনে মাসলামা। মুহাম্মদ ইবনে মাসলামাও তাই বললেন, যেমন মুগিরা বলছিলেন। এরপর আবু বকর (রা.) দাদির জন্য তা-ই নির্বারিত করলেন। এরপর ওমর (রা.)-এর কাছেও অন্য একজন দাদি এসে তার মিরাস সম্পর্কে জানতে চায়। তিনি বলেন, তার জন্যও এক-ষষ্ঠাংশ। যদি দুজন দাদি থাকে, তবে উক্ত অংশ দুজনের মধ্যে ভাগ হবে এবং এ দুজনের মধ্যে একজন যদি আগেই মারা যায়, তাহলে ওই অংশ সে একাই পাবে।’ (মালেক, আহমদ, তিরমিজি, আবু দাউদ)

তামিম দারেমি বলেন, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজেস করেছিলাম, মুসলিমের হাতে যে মুশরিক ইসলাম গ্রহণ করে, তার সম্পর্কে আইন কি? রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘ইহকাল এবং পরকালে সে উত্তম ব্যক্তি।’ (তিরমজি, ইবনে মাজাহ)
লেখকের পরিচয়
গাজী শামছুর রহমান (১৯২১-১৯৯৮) বাংলাদেশি আইনবিদ ও আইন সংস্কারক, বিচারক, ভাষাবিদ এবং টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব। তিনি বাংলায় আইনবিষয়ক গ্রন্থ রচনায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তার রচিত বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। তিনি ১৯৮৫ সালে একুশে পদক পান। তিনি জেলা জজ ছিলেন। সরকারের যুগ্ম সচিব হিসেবে তিনি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট ও বাংলা একাডেমির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন কিছুদিন।
source: Asia Post







