চলনবিলে নির্বিচারে শামুক নিধন, বিপন্ন জলজ পরিবেশ

বর্ষার পানি কমতে শুরু করতেই সিরাজগঞ্জের চলনবিলে বেড়েছে শামুক ও ঝিনুক আহরণ। জলজ বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এসব প্রাণী প্রজাতিভেদে পানির ক্ষুদ্র জীব ও জৈব পদার্থ খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে বিভিন্ন মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর খাদ্য হিসেবেও শামুক গুরুত্বপূর্ণ। কিছু প্রজাতির শামুক পানির কণাবস্তু ছেঁকে খাওয়ার মাধ্যমে পানির স্বচ্ছতা ও পুষ্টিচক্র বজায় রাখতেও ভূমিকা রাখে।
তাড়াশ ডিগ্রি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বিদ্যুৎ কুমার বলেন, উন্মুক্ত জলাশয়, বিশেষ করে খাল-বিল ও হাওর-বাঁওড়ে শামুক-ঝিনুক বংশবিস্তার করে। জলাশয়ে থাকা বিভিন্ন ক্ষুদ্র জীব ও জৈব পদার্থ খাওয়ার মাধ্যমে প্রজাতিভেদে এসব প্রাণী পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি স্থানীয় মিঠাপানির মাছের খাদ্যের চাহিদা পূরণেও শামুক গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত শামুক নিধন অব্যাহত থাকলে জলজ পরিবেশের ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই শামুক আহরণের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং নির্বিচারে সংগ্রহ বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
শামুক-ঝিনুক সংরক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়লেও চলনবিলে আহরণ নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সহযোগী অধ্যাপক বিদ্যুৎ কুমার জানান, সরকারিভাবে শামুক-ঝিনুক সংরক্ষণে উদ্যোগ বা প্রকল্প থাকলেও এ অঞ্চলে সেগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না বলে তার ধারণা। তার মতে, শামুক জলাশয়ের প্রাকৃতিক পরিশোধন প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। তাই এ প্রাণী সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
তিনি আরও বলেন, ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনের আওতায় শামুক সংরক্ষণের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তবে শামুকের প্রজাতি, প্রযোজ্য আইনের বিধান এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার যাচাই করে আইন প্রয়োগের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, শুধু আইন থাকলেই হবে না, মাঠপর্যায়ে নিয়মিত নজরদারি, আহরণের পরিমাণ নিরূপণ এবং প্রজনন মৌসুমে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শামুকের প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা এবং স্থানীয় সংগ্রহকারী ও ব্যবসায়ীদের পরিবেশগত বিষয়ে সচেতন করাও জরুরি।
শামুক-ঝিনুক আহরণ ও এর পরিবেশগত প্রভাবের বিষয়ে জানতে চাইলে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান বলেন, শামুক-ঝিনুক সংগ্রহের বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। প্রয়োজনে শামুক সংগ্রহকারী ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশাসনের এ আশ্বাসের পর এখন দেখার বিষয়, চলনবিলে শামুক আহরণ নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখে।
শামুক-ঝিনুক নিধনের বিষয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, শামুক-ঝিনুক জলজ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নির্বিচারে শামুক-ঝিনুক নিধনের ফলে জলজ বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি মাছের প্রজনন ও উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই প্রাকৃতিক সম্পদ ও জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় শামুক-ঝিনুক নিধন বন্ধে সবাইকে সচেতন হতে হবে। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে শামুক-ঝিনুকের প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ করা জরুরি।
source: Asia Post







