ইসরায়েলে সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা, নতুন নির্বাচন এড়াতে দলগুলোকে প্রেসিডেন্টের আহ্বান

ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ নতুন নির্বাচন এড়াতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সমঝোতায় পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে কোনো পক্ষই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারায় দেশটিতে সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও বিরোধী শিবিরের নেতা গাদি আইজেনকোট নতুন সরকার গঠনের জন্য রাজনৈতিক সমীকরণ মেলানোর চেষ্টা করছেন। আরব দলগুলোর সমর্থনও সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভোট গণনার ৮৫ শতাংশের বেশি শেষ হওয়ার পর প্রাথমিক হিসাবে দেখা গেছে, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট এগিয়ে থাকলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে পিছিয়ে রয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর এটিই দেশটির প্রথম নির্বাচন।
ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা নেতানিয়াহু কট্টর ডানপন্থী ও অতি-অর্থোডক্স ইহুদি দলগুলোর সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় রয়েছেন। অন্যদিকে, সাবেক সেনাপ্রধান আইজেনকোট নেতৃত্ব দিচ্ছেন একটি বিস্তৃত বিরোধী জোটের। নির্বাচনের পর দুজনই সরকার গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
তবে দেশটির ১২০ আসনের পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন ৬১টি আসন। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর জোট ৫৩টি এবং আইজেনকোটের বিরোধী জোট ৪৮টি আসন পেতে পারে। ফলে কোনো পক্ষের এককভাবে সরকার গঠনের সম্ভাবনা আপাতত ক্ষীণ।
চূড়ান্ত ফলাফলে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে আরব দলগুলোর নির্বাচনী সাফল্য ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়েছে। দলগুলো সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জেরুজালেম থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, সরকার গঠনের জন্য কোন নেতাকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, সে সিদ্ধান্ত নেবেন প্রেসিডেন্ট হারজগ। বুধবার তিনি বলেন, নতুন নির্বাচন এড়াতে রাজনৈতিক দলগুলোকে সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। এ জন্য দলগুলোর মধ্যে খোলামেলা আলোচনা ও সমঝোতার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বামপন্থী আরব-অধ্যুষিত জয়েন্ট লিস্টের প্রধান ইউসেফ জাবারিন বলেছেন, ইসরায়েলের ভোটাররা নতুন নেতৃত্বের পক্ষে রায় দিয়েছেন। নেতানিয়াহুর সরকারের বিকল্প প্রতিষ্ঠা করতে হলে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোকে আরব দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।
জাবারিন বলেন, ইসরাইল এখন দুটি পথের একটিকে বেছে নেওয়ার মুখে রয়েছে; বর্ণবাদ, বর্জন ও আধিপত্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অথবা ইহুদি ও আরবদের মধ্যে প্রকৃত অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ আরব। তাদের বড় অংশ ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সেখানে থেকে যাওয়া ফিলিস্তিনিদের বংশধর। নেতানিয়াহু সরকারের ইহুদি জাতীয়তাবাদী নীতি এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিয়ে অবস্থানের কারণে এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ রয়েছে।
তবে আরব দলগুলোর সঙ্গে সরাসরি জোট গঠনের বিষয়ে আইজেনকোট এখনো অনাগ্রহী। নির্বাচনী প্রচারণায় নেতানিয়াহু বারবার বিরোধীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেছেন, তারা ক্ষমতায় এলে আরবরা সরকার পরিচালনায় অংশ নেবে। তার প্রচারণার অন্যতম স্লোগান ছিল, ‘হয় ডানপন্থীরা, নয়তো ফিলিস্তিন।’
আইজেনকোটের জোটের অংশ ইসরায়েলের প্রধান বামপন্থী দলের নেতা ইয়াইর গোলান এবার প্রথমবারের মতো আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ইহুদি ও আরব ভোটারদের মধ্যে নেতানিয়াহুর তৈরি করা বর্ণবাদী বিভাজন আর মেনে নেওয়া যায় না।
তবে আইজেনকোটের জোটেও এমন কয়েকজন ডানপন্থী নেতা রয়েছেন, যারা নেতানিয়াহুর কঠোর নিরাপত্তানীতির অনেকগুলোর সঙ্গে একমত এবং আরব আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে কাজ করার বিরোধিতা করেন।
আরব দলগুলো সরাসরি সরকারে যোগ না দিয়েও পার্লামেন্টের বিভিন্ন ভোটে আইজেনকোটকে সমর্থন দিতে পারে। এতে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছাড়াই সংখ্যালঘু সরকার গঠনের সুযোগ পেতে পারেন। তবে এ ধরনের সরকার দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
নির্বাচনে কোনো পক্ষই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় সরকার গঠনের আলোচনা কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে পারে। সমঝোতা ব্যর্থ হলে দেশটিতে আবারও নির্বাচন আয়োজনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গিডিয়ন রাহাতের মতে, এবারের নির্বাচনে আরব দলগুলো ছাড়া প্রায় সব পক্ষই পরাজিত হয়েছে বলে মনে হতে পারে। তবে আরব দলগুলো তাদের অর্জিত সাফল্যকে বাস্তবে কতটা কাজে লাগাতে পারবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে আপাতত সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারেন নেতানিয়াহু। নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
ইরানকে ঘিরে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা
ইসরায়েলের নির্বাচনের পর সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তার পাশাপাশি ইরানকে ঘিরে নতুন সামরিক সংঘাতের আশঙ্কাও সামনে এসেছে। নেতানিয়াহু ও আইজেনকোটের বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানে নতুন হামলার সম্ভাবনার বিষয়টি উঠে এসেছে।
গত বছর এবং চলতি বছরের শুরুর দিকে ইরানে বোমা হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন নেতানিয়াহু। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর তিনি হামলা বন্ধ করেন। তবে সেই যুদ্ধবিরতি এখন কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহু একাধিকবার ইরানের সরকার উৎখাতের আহ্বান জানান। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, নির্বাচনের আগে ইরানে হামলার পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিলেন ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা। তবে নেতানিয়াহু এসব প্রতিবেদন অস্বীকার করেছেন।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করছে না। তবে আগামী মঙ্গলবার অনুষ্ঠিতব্য মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা চালানো হবে না বলেও তিনি জানিয়েছেন।
নির্বাচনী প্রচারণায় নেতানিয়াহু বলেন, ট্রাম্পের সঙ্গে মিলে ইরানের কাছ থেকে ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি চিরতরে দূর করার একটি বিরল সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, নির্বাচনের পর দেওয়া বক্তব্যে আইজেনকোট ইসরায়েলের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার আহ্বান জানান। তিনি নেতানিয়াহুকে এমন একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বর্ণনা করেন, যার হাতে নতুন করে সরকার পরিচালনার জনসমর্থন নেই।
আইজেনকোট সতর্ক করে বলেন, নেতানিয়াহুর নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে ব্যবহার করা উচিত হবে না।
এ পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট হারজগের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের পক্ষে। নেতানিয়াহু ইরানে নতুন হামলা চালালে এমন সরকারের প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়তে পারে। তবে আইজেনকোট প্রকাশ্যেই নেতানিয়াহুর সঙ্গে একই সরকারে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করেছেন।
নেতানিয়াহুকে ঘিরে ইসরায়েলে গভীর বিভাজন
দীর্ঘ ১৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা নেতানিয়াহুকে ঘিরে ইসরায়েলি সমাজে গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজন তৈরি হয়েছে।
দুর্নীতির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা চলছে, যদিও তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। পাশাপাশি বিচারব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েও তিনি বিরোধিতার মুখে পড়েছেন।
নেতানিয়াহু এমন কট্টর ডানপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে জোট গঠন করেছেন, যারা অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের পক্ষে। এসব বসতি স্থাপনকারীর বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলার অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় তাদের কার্যত দায়মুক্তি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
গাজায় ইসরায়েলের বিধ্বংসী সামরিক অভিযানের ঘটনায় নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।
এদিকে, ইসরায়েলের নির্বাচনের ফল গাজার বাসিন্দাদের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সেখানে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি হুদা আল-হুলি এএফপিকে বলেছেন, এই নির্বাচনের পর আরও খারাপ নেতা এবং আরও সহিংস ও রক্তপিপাসু ব্যক্তিরা ক্ষমতায় আসতে পারেন বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
source: Asia Post







