News

ইরানের সঙ্গে বৈরিতার মধ্যেই ২ মুসলিম শক্তিধর দেশকে পাশে পেল সৌদি

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ সৌদি আরবের আরও কাছে চলে আসার মধ্যেই নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দুই সামরিক শক্তিকে যুক্ত করেছে সৌদি আরব। শুক্রবার মক্কায় পাকিস্তান ও তুরস্ক সৌদি আরবের সঙ্গে ন্যাটোর আদলে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সম্পর্ককে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা জোটে রূপ দেওয়া হলো।

চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলাকে ‘তিন দেশের সবার ওপর হামলা’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তিন দেশের প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চুক্তির মূল উদ্দেশ্য হলো ‘যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা’ এবং ‘তিন দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সব দিক আরও জোরদার করা’।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের খবরে বলা হয়, চুক্তির এসব প্রতিশ্রুতির ফলে পাকিস্তান ও তুরস্ক এমন একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে, যেটি থেকে তারা এতদিন সতর্কভাবে দূরে থাকার চেষ্টা করেছে। আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা অংশীদারত্বের বাইরে নতুন ও শক্তিশালী একটি নিরাপত্তা স্তর তৈরি হলো।

চুক্তি স্বাক্ষরের আগে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট তাইয়্যেপ এরদোয়ানকে স্বাগত জানান সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ছবি: সংগৃহীত

চুক্তি স্বাক্ষরের আগে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট তাইয়্যেপ এরদোয়ানকে স্বাগত জানান সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে এমন এক সময়ে এই চুক্তি হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র তাদের তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনো কতটা নির্ভরযোগ্য— তা নিয়ে আঞ্চলিক পর্যায়ে সন্দেহ বাড়ছে। এদিকে ইসরায়েল পুরো অঞ্চলে তাদের সামরিক তৎপরতা আরও বিস্তৃত করার সময়েই এই চুক্তি হলো। একই সঙ্গে প্রতিবেশী সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্কেও টানাপোড়েন বাড়ছে।

ন্যাটোতে যুক্তরাষ্ট্রের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী রয়েছে তুরস্কের। অন্যদিকে পাকিস্তানই মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ। এমন শক্তিশালী দুই মিত্র সৌদি আরবের প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়াবে এবং ইরানের ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে সুন্নিপ্রধান একটি ঐক্যবদ্ধ সামরিক অবস্থান তৈরি করবে।

বৃহস্পতিবার জেদ্দায় পৌঁছালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফকে অভ্যর্থনা জানান মক্কা অঞ্চলের ডেপুটি গভর্নর প্রিন্স সৌদ বিন মিশাল বিন আবদুলআজিজ। ছবি: সংগৃহীত

বৃহস্পতিবার জেদ্দায় পৌঁছালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফকে অভ্যর্থনা জানান মক্কা অঞ্চলের ডেপুটি গভর্নর প্রিন্স সৌদ বিন মিশাল বিন আবদুলআজিজ। ছবি: সংগৃহীত

তবে তুরস্কের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেছেন, চুক্তিটি কোনো নির্দিষ্ট পক্ষকে লক্ষ্য করে করা হয়নি। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বলেছে, এটি ‘কোনো সামরিক অক্ষ বা সাম্প্রদায়িক জোট গঠনের প্রচেষ্টা নয়’। তিনি আরও জানান, অন্য আঞ্চলিক দেশগুলোও এই জোটে যোগ দিতে পারবে। ফলে ভবিষ্যতে ন্যাটোর মতো এই জোটেও নতুন সদস্য যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

তবে যৌথ বিবৃতিতে তিন দেশ কী ধরনের সামরিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তার বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি। ফলে একে অপরের প্রতিরক্ষায় ঠিক কতটা এবং কী ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নিতে তিন দেশ বাধ্য থাকবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

পাকিস্তান ও তুরস্ক— দুই দেশেরই ইরানের সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে। সংঘাত যাতে আরও ছড়িয়ে না পড়ে, তা ঠেকানোর যথেষ্ট কারণও রয়েছে দুই দেশের। পাকিস্তানকে দেশটির বড় শিয়া জনগোষ্ঠী এবং ইরানের সঙ্গে সংবেদনশীল সম্পর্ক— দুটিই সামলাতে হচ্ছে। অন্যদিকে তুরস্ক ও ইরান অঞ্চলটির বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদ নিয়ে তাদের অভিন্ন উদ্বেগ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের চলার সময় ইরান সৌদি আরবে বারবার বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার লক্ষ্য ছিল বেসামরিক অবকাঠামো, জ্বালানি স্থাপনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা। ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর সৌদি আরবে ইরানের সরাসরি হামলা অনেকটাই কমে আসে। তবে ইয়েমেন ও ইরাকে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যেতে থাকে।

মার্চে ইরানের ড্রোন হামলার পর সৌদি আরবের একটি তেল শোধনাগার থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়। ছবি: সংগৃহীত

মার্চে ইরানের ড্রোন হামলার পর সৌদি আরবের একটি তেল শোধনাগার থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়। ছবি: সংগৃহীত

এই যুদ্ধে সৌদি আরব সবচেয়ে সোচ্চার বিরোধীদের অন্যতম এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাত আরও বাড়ানো থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেছে। তবে বিভিন্ন দিক থেকে সৌদি আরবের ওপর চলতে থাকা হামলা দেশটির কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশা ক্রমেই বাড়িয়ে দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ইরান-সমর্থিত ইরাক ও ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সহায়তায় বড় ধরনের সমন্বিত হামলা চালাতে পারে— এমন আশঙ্কায় প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব।

সিএনএন আরও জানিয়েছে, তেহরান উপসাগরীয় দেশগুলোকে সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে পুরো অঞ্চলের জ্বালানি বা পানি লবণমুক্তকরণ স্থাপনায় পালটা হামলা চালানো হবে।

এ পরিস্থিতিতে শুক্রবার মক্কায় স্বাক্ষরিত এই চুক্তি তেহরানের প্রতি একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে। সৌদি আরবের ওপর আবার বড় ধরনের হামলা হলে এই চুক্তি কার্যকর হতে পারে। এতে পাকিস্তান ও তুরস্ক সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে এবং যুদ্ধটি নাটকীয়ভাবে আরও বিস্তৃত হতে পারে।

তেহরান থেকে আসা প্রতিক্রিয়ায় এই চুক্তি নিয়ে অসন্তোষের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, এই চুক্তি সৌদি আরবের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবে না।

ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির সদস্য ইব্রাহিম রেজায়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, ‘সৌদি নেতৃত্বকে বুঝতে হবে, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে কাগজে-কলমে একটি চুক্তি তাদের নিরাপত্তা দেবে না। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর একতরফা নির্ভরতার কয়েক দশকও যেমন তা দিতে পারেনি।’

এই চুক্তির মাধ্যমে তিন দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় হলো। এর আগে ইরান সরাসরি সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা শুরুরও আগে, গত বছরের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তান একটি আনুষ্ঠানিক পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল।

source: Rajneete

Back to top button