মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আঁচ জাতিসংঘের মঞ্চে, ওয়াকআউট-বিক্ষোভ

জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান মঞ্চে উঠতেই সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে যান মার্কিন প্রতিনিধি। এক দিন পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বক্তব্য দিতে উঠতেই একই দৃশ্য দেখা যায় আরও বড় পরিসরে— বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা একে একে সভাকক্ষ ছাড়তে শুরু করেন। বাইরে তখন গাজা ও ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের প্রতিবাদে বিক্ষোভ।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের দুই দিনের এই দৃশ্য যেন মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ ও কূটনৈতিক মেরুকরণেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।
বুধবার পেজেশকিয়ানের ভাষণের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দল সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়। ইসরায়েলি প্রতিনিধিরাও তার বক্তব্যে উপস্থিত ছিলেন না।
এর ঠিক এক দিন আগে, মঙ্গলবার একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে ইরানকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চুক্তিতে না এলে ইরানকে ‘ধ্বংস’ বা ‘নিশ্চিহ্ন’ করার হুমকি দেন তিনি। ট্রাম্পের ভাষণের সময় ইরানি প্রতিনিধিদলও সভাকক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যায়।
ট্রাম্পের হুমকি, পেজেশকিয়ানের পালটা বার্তা
ট্রাম্প তার ভাষণে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের পক্ষে যুক্তি দেন। তার দাবি, এই অভিযানের মাধ্যমে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকানো হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, তেহরান চুক্তিতে না এলে ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
পরদিন পেজেশকিয়ান জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্যের সাধারণ অধিবেশনে দাঁড়িয়ে জানিয়ে দেন, ইরান যুদ্ধে আত্মসমর্পণ করবে না। তবে কূটনীতির দরজাও বন্ধ করছেন না তিনি। ইরানি প্রেসিডেন্ট বলেন, তার দেশ বিশ্বের সঙ্গে আলোচনার হাত বাড়িয়ে দিতে প্রস্তুত— দুর্বলতার কারণে নয়, নিজেদের শক্তি ও দৃঢ়তার জায়গা থেকে।
হরমুজ প্রণালির প্রসঙ্গও উঠে আসে তার বক্তব্যে। পেজেশকিয়ান বলেন, সবাই যদি এই জলপথ থেকে সুবিধা নেয় অথচ ইরান সেখানে নৌযান চলাচলের সুযোগ না পায়, তা গ্রহণযোগ্য নয়। তার ভাষায়, শত্রুভাবাপন্ন নৌবহরের স্থায়ী উপস্থিতি এবং যুদ্ধের বিস্তার শান্তি আনবে না।
অর্থাৎ একই মঞ্চে দুই দেশের দুই বার্তা— ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে চাপ ও ধ্বংসের হুমকি, আর তেহরানের পক্ষ থেকে যুদ্ধ না-ভয় পাওয়ার ঘোষণা এবং একই সঙ্গে কূটনীতির দরজা খোলা রাখার বার্তা।
পরদিন আরও বড় ওয়াকআউট
পেজেশকিয়ানের বক্তব্যের পর বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের মঞ্চে উঠলেন নেতানিয়াহু। তার বক্তব্যের শুরুতেই বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের একটি অংশ সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়। তাদের মধ্যে আরব ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের প্রতিনিধিরা ছিলেন। কলম্বিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ আরও কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিও ওয়াকআউট করেন।
নেতানিয়াহু অবশ্য এতে থামেননি। যারা বেরিয়ে গেছেন তাদের ‘নৈতিকভাবে কাপুরুষ’ বলে আক্রমণ করেন তিনি এবং যারা এখনো বসে আছেন, তাদেরও বেরিয়ে যেতে বলেন।
নেতানিয়াহুর বক্তব্যের কেন্দ্রেও ছিল ইরান। তিনি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানকে যুক্তিসঙ্গত বলে দাবি করেন এবং ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধের সমালোচকদেরও আক্রমণ করেন। তার বক্তব্যে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পক্ষে সাফাই, হামাসবিরোধী অবস্থান এবং ইরানকে ঘিরে ইসরায়েলের নিরাপত্তা-যুক্তি প্রাধান্য পায়।
জাতিসংঘের বাইরেও উত্তাপ
নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় জাতিসংঘের সদর দপ্তরের বাইরে কয়েক শ বিক্ষোভকারী জড়ো হন। তাদের মধ্যে কয়েক ডজন সড়কে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল আটকে দেন। বিক্ষোভকারীদের হাতে ছিল ইসরায়েল ও গাজা যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান।
তারা স্লোগান দেন— ‘ইসরায়েলকে অস্ত্র দেওয়া বন্ধ করুন, গাজাকে বাঁচতে দিন’ এবং ‘ইসরায়েলকে অস্ত্র দেওয়া বন্ধ করুন, ইরানকে বাঁচতে দিন’। পরে পুলিশ বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে আটক করে।
বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের ভেতরের দৃশ্য আর বাইরের এই পরিস্থিতি যেন একই বার্তাই দিচ্ছিল— মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শুধু সামরিক সংঘাতে সীমাবদ্ধ নেই; তা আন্তর্জাতিক কূটনীতিক অঙ্গনকেও গভীরভাবে বিভক্ত করে ফেলেছে।
বাংলাদেশের অবস্থান আলাদা
এই উত্তপ্ত পরিবেশের মধ্যেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ফিলিস্তিনের মানুষের ন্যায্য অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন।
একই বক্তৃতায় তিনি সংঘাতের বদলে সংলাপ, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর জোর দেন। বাংলাদেশের এই অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নিয়ে সরাসরি কোনো পক্ষের সামরিক অবস্থানের সঙ্গে না গিয়ে ফিলিস্তিনের অধিকার, শান্তি ও বহুপক্ষীয় কূটনীতির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার ধারাটিই তুলে ধরে।
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের এবারের দৃশ্য তাই কেবল কয়েকজন নেতার বক্তব্য কিংবা কয়েকটি ওয়াকআউটের ঘটনা নয়। ট্রাম্পের ইরানকে ধ্বংসের হুমকি, পেজেশকিয়ানের পালটা যুদ্ধবার্তা ও কূটনীতির আহ্বান, নেতানিয়াহুর গাজা ও ইরান নিয়ে অবস্থান, সভাকক্ষের ওয়াকআউট এবং বাইরে বিক্ষোভ—সব মিলিয়ে বিশ্ব কূটনীতির সবচেয়ে বড় মঞ্চটিই যেন মধ্যপ্রাচ্যের গভীর বিভাজনের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।
source: Rajneete







