News

ভারতের সিইসিকে সুপ্রিম কোর্টের নোটিশ, পর্যালোচনা হবে যন্তর মন্তরে ‘নিষেধাজ্ঞা’র সিদ্ধান্তও

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারকে নোটিশ দিয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। একই সঙ্গে প্রতিবাদের জন্য ঐতিহাসিক স্থান যন্তর মন্তরের অনুমোদন বাতিল বা ‘ডিনোটিফাই’ করে দিল্লি পুলিশের দেওয়া সিদ্ধান্তও খতিয়ে দেখতে রাজি হয়েছেন আদালত।

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ১০ ও ১১ অক্টোবরের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া ৪০টির বেশি আবেদনের শুনানিতে বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) এই নির্দেশ দেওয়া হয়।

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ প্রায় এক ঘণ্টা ধরে এসব মামলার শুনানি করেন। শুনানির সময় বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিক্ষোভের সময়কার সব সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবরে বলা হয়েছে, এই মামলাগুলোর মধ্যে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের নেতাদের করা একটি রিট আবেদনও রয়েছে। তারা নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকার স্পেশাল ইনটেন্সিভ রিভিশন (এসআইআর) পরিচালনার পদ্ধতিকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তাদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন ‘একতরফা ও স্বেচ্ছাচারীভাবে’ সম্মিলিত ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে।

‘রাহুল গান্ধী বনাম ভারতের নির্বাচন কমিশন’ শিরোনামের এ মামলায় সিইসি জ্ঞানেশ কুমারকে ব্যক্তিগতভাবে বিবাদী করা হয়েছে। ফলে তাকে এখন আদালতে নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করতে হবে।

ভোটার তালিকায় নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তির জন্য ব্যবহৃত ফরম ৬-এ পরিবর্তন আনার বিষয়েও নির্বাচন কমিশনকে নোটিশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট।

তবে ইন্ডিয়া জোটের আবেদনকারীদের একজনের আচরণ নিয়ে আদালত অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বেঞ্চ বলেছেন, অন্য আবেদনকারীদের নিয়ে তাদের কোনো সমস্যা নেই এবং তাদের আবেদনে নোটিশ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে ওই আবেদনকারীর আচরণ আদালত সমর্থন করছে। সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীকে নিজের আচরণ সম্পর্কে হলফনামা দিতে বলা হয়েছে। আদালত অবশ্য ওই আবেদনকারীর নাম প্রকাশ্যে উল্লেখ করেনি।

যন্তর মন্তর নিয়ে আদালতের প্রশ্ন

শুনানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল যন্তর মন্তরকে প্রতিবাদস্থল হিসেবে বাতিল করা।

গত ১২ অক্টোবর দিল্লি পুলিশ জানায়, প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের জন্য যন্তর মন্তর ব্যবহারের নিয়ম পরিবর্তন করে জায়গাটিকে আর নির্ধারিত প্রতিবাদস্থল হিসেবে রাখা হচ্ছে না। প্রতিবাদের জন্য এর বদলে তিনটি জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে— বুড়ারি গ্রাউন্ড, রামলীলা গ্রাউন্ড এবং সিবিডি গ্রাউন্ড।

আবেদনকারীদের পক্ষে আইনজীবী, সাবেক দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতি ও সিনিয়র অ্যাডভোকেট মুক্তা গুপ্তা বলেন, সুপ্রিম কোর্টের আগের একটি রায়ে বলা হয়েছিল, প্রতিবাদের স্থান এমন হতে হবে, যেখানে প্রতিবাদকারীদের বক্তব্য ‘ক্ষমতাসীনদের কাছে পৌঁছাতে’ পারে।

এ সময় বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী নতুন একটি পর্যবেক্ষণ দেন। তিনি ‘শোনা’র বিষয়টি বর্তমান প্রযুক্তির বাস্তবতার দিক থেকেও বোঝার বিষয়ে গুরুত্ব দেন। প্রতিবাদকারীরা শারীরিকভাবে কোথায় দাঁড়াবেন, সেটি কেবল নয়; আধুনিক প্রযুক্তি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের বক্তব্য নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ বিবেচনায় নিতে হবে বলেও উল্লেখ করেন আদালত।

সরকারের হলফনামায় বলা হয়েছিল, সুপ্রিম কোর্টের ৯ অক্টোবরের একটি আদেশের পরিপ্রেক্ষিতেই যন্তর মন্তরে প্রতিবাদের অনুমতি প্রত্যাহার করা হয়েছে। আবেদনকারীদের আইনজীবীরা বিষয়টি আদালতের নজরে আনলে বিচারপতি বাগচী বলেন, আদালতের কোনো ‘মৌখিক পর্যবেক্ষণ’কে আইন হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় কি না, সেটিও তাদের পরীক্ষা করে দেখতে হবে।

এ পর্যবেক্ষণটি মামলার গুরুত্বপূর্ণ দিক। কারণ পুলিশের সিদ্ধান্তটি যদি আদালতের লিখিত আদেশের বদলে শুনানির সময় করা কোনো মৌখিক মন্তব্যের ওপর ভিত্তি করে হয়ে থাকে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

নিষেধাজ্ঞার ক্ষমতাও প্রশ্নের মুখে

আদালত এ দিন আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্নের দিকে এগিয়েছেন। সিনিয়র অ্যাডভোকেট গোপাল শঙ্করনারায়ণন এমন দুটি বিধানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেছেন, যেগুলো বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন ও পুলিশের ক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

এর একটি ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ধারা ১৬৩, যা পুরনো ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারার সমতুল্য। এই বিধানের আওতায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য প্রশাসন নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ জারি করতে পারে। অন্যটি ধারা ১৭২, যার অধীনে মানুষকে পুলিশের বৈধ নির্দেশ মেনে চলতে হয়।

বেঞ্চ প্রথমে শুধু ধারা ১৭২ নিয়ে নোটিশ দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখায় । কারণ ১৯৭০ সালের এক মামলায় সুপ্রিম কোর্ট পুরনো ১৪৪ ধারার বৈধতা বহাল রেখেছিলেন।

কিন্তু শঙ্করনারায়ণন আদালতকে মনে করিয়ে দেন, গত ৫০ বছরে সাংবিধানিক আইনের ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। তাই পুরনো রায়ের ভিত্তিতে বিষয়টি খারিজ না করে দুটি বিধানই পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

তিনি আদালতকে বলেন, ‘দুটো বিধানই বিবেচনা করতে হবে। গত ৫০ বছরে সাংবিধানিক আইনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।’ তিনি আদালতকে বিষয়টি নিয়ে ‘dismissive’ না হওয়ারও অনুরোধ করেন।

বেঞ্চের সামনে তখন আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি আসে। আবেদনকারীরা দিল্লি পুলিশকে ধারা ১৬৩-এর অধীনে জারি করা সব নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার আবেদন করেন।

বিক্ষোভের দায় কার?

শুনানিতে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা একটি আবেদনের ‘আকর্ষণীয়’ অংশ আদালতের নজরে আনেন। ওই আবেদনে বলা হয়েছিল, যারা বিক্ষোভের ডাক দেবে, বিক্ষোভের ফলে যে পরিস্থিতি তৈরি হবে তার দায়ও তাদের নিতে হবে।

এর জবাবে শঙ্করনারায়ণন বলেন, যুক্তিটি দুই দিকেই প্রযোজ্য।

অর্থাৎ, বিক্ষোভের ডাক দেওয়া ব্যক্তিদের যদি বিক্ষোভের পরিণতির জন্য দায়ী করা হয়, তাহলে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণকারী পুলিশও তাদের পদক্ষেপের জন্য দায় এড়াতে পারে না। তার বক্তব্য ছিল, পুলিশ কমিশনারকেও নিজের বাহিনীর কর্মকাণ্ডের দায়িত্ব নিতে হবে।

এখন মামলাটির পরবর্তী শুনানিতে মূলত কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে—সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের জবাব, এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অবস্থান, ফরম-৬ পরিবর্তনের আইনি ভিত্তি, যন্তর মন্তরকে প্রতিবাদস্থল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং বিক্ষোভের সময় পুলিশের বলপ্রয়োগের অভিযোগ।

source: Rajneete

Back to top button