শেরপুরে অচল ১০ লাখ টাকার সড়কের সিসিটিভি ক্যামেরা

অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শেরপুর শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে বসানো হয়েছিল ৪০টি সিসিটিভি ক্যামেরা। কিন্তু এক বছরের মধ্যেই ৩০টির বেশি ক্যামেরা অকার্যকর হয়ে যাওয়ায় ভেঙে পড়েছে নজরদারি ব্যবস্থা। প্রায় ছয় মাস ধরে অচল ক্যামেরাগুলোর মধ্যে সচল হয়েছে মাত্র চারটি। বাকিগুলো মেরামতে নেই কোনো উদ্যোগ। এতে চুরি-ছিনতাই ও মাদক কারবার নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শেরপুর পৌরসভার অর্থায়নে এবং সদর থানার সহযোগিতায় শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে ৪০টি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। এতে ব্যয় হয় প্রায় ১০ লাখ টাকা। এসব ক্যামেরা শেরপুর পৌরসভা ভবন ও সদর থানা ভবন থেকে সার্বক্ষণিক মনিটর করা হয়। কিন্তু বসানোর এক বছরের মাথায় অকার্যকর হয়ে যায় বেশিরভাগ ক্যামেরা। ফলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, জননিরাপত্তা নিশ্চিত এবং অপরাধীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ধীরে ধীরে যান্ত্রিক ত্রুটি ও ক্যামেরার সংযোগের তার চুরিসহ নানা কারণে ৩০টির বেশি ক্যামেরা অচল হয়ে পড়ে আছে। প্রায় ছয় মাস ধরে অধিকাংশ ক্যামেরা বন্ধ রয়েছে। তবে, সম্প্রতি মাত্র চারটি মেরামত করে পৌরসভা। কিন্তু বাকী ক্যামেরাগুলো সচল করতে কার্যকর উদ্যোগ নেই। ফলে ভেঙে পড়েছে শহরের নজরদারি ব্যবস্থা। এতে চুরি-ছিনতাই ও মাদক কারবার নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। অথচ ক্যামেরাগুলো স্থাপনের পর শহরে অপরাধ সংঘটিত হলে দ্রুত অপরাধী শনাক্ত করা এবং সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি খুব সহজেই ছিল। বর্তমানে সেটি হচ্ছে না।
সম্প্রতি শহরের বিভিন্ন পয়েন্ট ঘুরে দেখা যায়, কোন কোন খুঁটিতে লাগানো রয়েছে একটি বা দুটি করে সিসি ক্যামেরা। আবার কোনো খুঁটিতে গিয়ে দেখা যায় ক্যামেরা আছে, তার নেই। অনেক জায়গায় আবার দেখা যায় ক্যামেরা লাগানো ঠিকই আছে, তবে ক্যামেরার সামনে ময়লার স্তূপ পড়ে আছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সিসিটিভি ক্যামেরা অচল থাকায় এই সুযোগে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। শহরে বাড়ছে চুরি-ছিনতাই, বাড়ছে মাদক কারবারও। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও নির্জন এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় বাসিন্দারা। তাই দ্রুত সব ক্যামেরা সচল করার পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের দাবি তাদের। একইসাথে নিয়মিত তদারকি, কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংযোগের তার চুরি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি স্থানীয়দের।
শহরের নারায়ণপুর এলাকার বাসিন্দা শামীম মিয়া বলেন, শহরের বিভিন্নস্থানে আগে ক্যামেরা ছিল, এখনো আছে। তবে, অনেক ক্যামেরা নষ্ট অবস্থায় পড়ে আছে। যার কারণে হরহামেশাই চুরি-ছিনতাই বাড়ছে। আমরা চাই, দ্রুত সময়ের মধ্যে ক্যামেরাগুলো মেরামত করা হোক।
একই এলাকার বাসিন্দা গোলাম কাদরিয়া মুক্তি বলেন, ক্যামেরাগুলো থাকলে মানুষ কিছুটা নিরাপদ ও স্বস্তি পায়। কারণ, রাস্তা-ঘাটে নিজেদের গাড়ি রেখে কেনাকাটা করতে পারতো। বর্তমানে অনেক ক্যামেরা নষ্ট থাকায় গাড়ি চুরি হচ্ছে। নিরাপত্তার ঝুঁকিও বাড়ছে। যদি আগে থেকেই এসব নিয়মিত তদারকি থাকতো, তাহলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না।
গৃদ্দা নারায়ণপুর এলাকার বাসিন্দা মুরাদ মিয়া বলেন, সন্ধ্যার পর অনেক জায়গায় চলাচল করতে ভয় হয়। বিশেষ করে মা-বোনদের চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। কোথাও যদি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে, তার প্রমাণ সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই ক্যামেরা শুধু বসালেই হবে না, সেগুলো সচল রাখা ও ঠিকমতো দেখাশোনার করারও দরকার বলে আমি মনে করি।
খোয়ারপাড় এলাকার বাসিন্দা রবিন মিয়া বলেন, দোকানপাট ও সড়কের আরও বেশি সিসি ক্যামেরা লাগানো দরকার। কারণ, চুরি বা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলে ক্যামেরার ফুটেজ থেকে অনেক তথ্য পাওয়া যাবে। কয়েকদিন আগেও এখান থেকে একটি মোটরসাইকেল চুরি হয়েছে। কিন্তু কে চুরি করেছে, সেটা আমরা কেউই জানি না। যদি ক্যামেরা ঠিক থাকতো, তাহলে সহজেই জানা যেতো এবং যে চুরি করেছে তাকে খোঁজ সম্ভব হতো। তাই আমরা চাই, দ্রুত নষ্ট ক্যামেরাগুলো মেরামত ও নতুন করে আরও ক্যামেরা লাগানো হোক।
একই এলাকার বাসিন্দা মমিন মিয়া বলেন, বিভিন্ন পয়েন্টে ক্যামেরাগুলো দেখা যায় লাগানো আছে। কিন্তু এগুলো নষ্ট না ভালো সেটা তো আমরা জানি না। যদি, নষ্ট থাকে এগুলো ঠিক করা দরকার।
শেরপুর পৌরসভার প্রশাসক আরিফা সিদ্দিকা এশিয়া পোস্টকে বলেন, মাঝখানে কিছু কারিগরি ত্রুটির কারণে এবং বৃষ্টিজনিত কারণে কিছু সিসি ক্যামেরা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। সেই নষ্ট ক্যামেরাগুলো আমরা মেরামত করা শুরু করেছি। শেরপুর পৌরসভার বিভিন্ন পয়েন্টে আরও কিছু সিসি ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা আছে। এটা মূলত পৌর এলাকার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এক্ষেত্রে পুলিশ আমাদেরকে সহযোগিতা করছে। এই সিসি ক্যামেরার মনিটর আমরা পৌরসভা থেকেও করতে পারি আবার থানা থেকেও মনিটর করতে পারেন।
শেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান ভূঁঞা এশিয়া পোস্টকে বলেন, সিসিটিভি ক্যামেরা, স্মার্ট পুলিশিং এবং আধুনিক নগর সভ্যতায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আমরা শেরপুর জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অনেকগুলো সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করেছি, এবং এগুলো আমাদেরকে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সুচারুভাবে হেলপ করছে, সাপোর্ট দিচ্ছে। বিশেষ করে অপরাধ দূরীকরণে যে মনস্তাত্ত্বিক একটি বাধা তৈরি করা এবং অপরাধ সঠিকভাবে প্রমাণের ক্ষেত্রে এই সিসিটিভির ক্যামেরার গুরুত্ব অপরিসীম। যে সকল সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো নষ্ট হয়ে আছে, আমরা খুব শীঘ্রই যাচাই করে এগুলোকে প্রতিস্থাপনের চেষ্টা করব।
তিনি আরও বলেন, শেরপুর শহরে যারা ব্যক্তিগত উদ্যোগে সিসিটিভি ক্যামেরা ব্যবহার করেন তাদের ক্ষেত্রে আমাদের একটি পরামর্শ থাকবে তারা যেন তাদের সিসিটিভি ক্যামেরার একটি ক্যামেরা হলেও অন্তত যেন রাস্তামুখী করে রাখেন। এতে আমাদের জন্য অপরাধের তথ্য কালেক্ট করতে সুবিধা হবে।
source: Asia Post






