News

ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত ২, রক্ষা পেলেন প্রধানমন্ত্রী

ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর এডেনে দেশটির প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ কমপ্লেক্সে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি। হামলায় অন্তত দুই নিরাপত্তারক্ষী নিহত হয়েছেন। হামলার সময় ইয়েমেনের প্রধানমন্ত্রী শায়া আল-জিন্দানিসহ মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্য ওই প্রাসাদে উপস্থিত ছিলেন। তারা নিরাপদে রয়েছেন।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বৃহস্পতিবারের (১৫ অক্টোবর) এ হামলায় দুজনের নিহতের খবর নিশ্চিত করেছেন ইয়েমেনের দুই সরকারি কর্মকর্তা। তবে এএফপির প্রতিবেদনে ইয়েমেন সরকারের সামরিক সূত্রের বরাতে নিহতের সংখ্যা অন্তত চার এবং আহত ১০ জন বলা হয়েছে।

আল-মাশিক প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ নামে পরিচিত এই কমপ্লেক্সটি শুধু রাষ্ট্রপতির আনুষ্ঠানিক বাসভবন নয়, বিভক্ত ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে এটিই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের কার্যত প্রধান কার্যালয়। ফলে সেখানে হামলাকে দেশটির চলমান গৃহযুদ্ধে হুতিদের সাম্প্রতিক সামরিক তৎপরতার একটি বড় প্রতীকী ও কৌশলগত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করছেন বিশ্লেষকরা।

ইয়েমেন সরকারের পক্ষ থেকে হামলাটিকে সরাসরি প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ কমপ্লেক্সে হামলা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তথ্যমন্ত্রী মোআম্মার আল-এরিয়ানি জানিয়েছেন, হুতিরা কমপ্লেক্স লক্ষ্য করে পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। হামলার পর এডেন শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং ঘটনাস্থল থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়।

এএফপির সাংবাদিকও ঘটনাস্থলের কাছে ধোঁয়া উঠতে দেখেছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কথা জানিয়েছেন।

এডেনের পাশাপাশি ইয়েমেনের মধ্যাঞ্চলের কৌশলগত শহর মারিবেও হুতিরা কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে বলে জানিয়েছে ইয়েমেন সরকারের সামরিক সূত্র। মারিব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অঞ্চলটি তেলসমৃদ্ধ এবং ইয়েমেনের জ্বালানি সম্পদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের সঙ্গে যুক্ত।

প্রাসাদে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী

হুতিদের এই হামলার সময় প্রধানমন্ত্রী শায়া আল-জিন্দানি আল-মাশিক প্রাসাদে উপস্থিত ছিলেন। ইয়েমেন সরকারের এক মন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে এএফপিকে জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তখন কমপ্লেক্সের ভেতরেই ছিলেন। তবে তিনি কোনোভাবেই আহত হননি।

তথ্যমন্ত্রী আল-এরিয়ানিও প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিরাপদ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

হুতিদের দাবি কী

হুতি-নিয়ন্ত্রিত সংবাদ সংস্থা সাবা জানিয়েছে, হামলার লক্ষ্য ছিল আল-মাশিক প্রাসাদ কমপ্লেক্সে থাকা সৌদি কর্মকর্তাদের নেতৃত্বাধীন একটি সামরিক অভিযান পরিচালনার সদর দপ্তর এবং তাদের অস্ত্রের গুদাম।

হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারিও দাবি করেছেন, এডেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক স্থাপনায় হামলা তাদের ঘোষিত নীতির অংশ। তার ভাষায়, সৌদি আরবের যেসব এলাকায় সামরিক সমাবেশ বা প্রস্তুতি রয়েছে, সেগুলোকে লক্ষ্য করাই তাদের নীতি।

কেন এডেনকে লক্ষ্য করছে হুতিরা?

ইয়েমেন কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত। রাজধানী সানা এবং দেশের উত্তর ও পশ্চিমের বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে হুতিরা। অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার দক্ষিণাঞ্চল থেকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। এডেন দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর একটি এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের অন্তর্বর্তী রাজধানী হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ফলে এডেনের আল-মাশিক প্রাসাদে হামলা সামরিক দিক থেকে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রাজনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে হুতিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা দখলে নেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ইয়েমেন সরকারের বাহিনী সৌদি আরবের বিমান সহায়তায় পালটা অভিযান চালাচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত সেই অভিযান হুতিদের দখল করা এলাকা ফিরিয়ে নিতে পারেনি।

এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক সপ্তাহ ধরে হুতিদের দ্রুতগতির সামরিক অগ্রযাত্রার পর ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ আবারও বড় আকারে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

ইয়েমেনের পুরনো যুদ্ধ

ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদি আরবের সরাসরি সামরিক ভূমিকা নতুন নয়। ২০১৪ সালে হুতিরা রাজধানী সানা দখল করে। এরপর ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট ইয়েমেনে অভিযান শুরু করে।

যুদ্ধটি কয়েক বছর ধরে চললেও কোনো পক্ষই নিশ্চিত বিজয় অর্জন করতে পারেনি। ব্যাপক প্রাণহানি, মানবিক সংকট এবং অর্থনৈতিক ধ্বংসের পর ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতিকে অনেকটা শান্ত করে। কিন্তু সেই যুদ্ধবিরতি স্থায়ী রাজনৈতিক সমঝোতায় পরিণত হয়নি।

এরই মধ্যে লোহিত সাগরকে কেন্দ্র করে নতুন আঞ্চলিক সংঘাত শুরু হয়। হুতিদের হামলা এবং তার জবাবে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সামরিক তৎপরতা ইয়েমেনকে আবার বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধও নতুন করে তীব্র হয়েছে।

সৌদি আরব-ইরান সংঘাতের ছায়া

এবারের উত্তেজনায় সৌদি আরব সরাসরি ইরানকে দায়ী করছে। রিয়াদের অভিযোগ, ইরান হুতিদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করছে এবং তাদের সাম্প্রতিক সামরিক তৎপরতাকে উৎসাহিত করছে।

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনকূটনীতি বিষয়ক উপমন্ত্রী রায়েদ ক্রিমলি বলেছেন, সৌদি আরব এখনো ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। তবে তার দাবি, তেহরান এই মুহূর্তে কোনো ছাড় দিতে প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে না। তার ভাষায়, সংঘাতের এই পর্যায়ে হুতিদের নতুন করে বাড়তে থাকা হামলার পেছনে ইরানের উৎসাহ রয়েছে বলে রিয়াদ মনে করে।

এই পরিস্থিতি এমন একসময়ে তৈরি হয়েছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর সংঘাতও তীব্র। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া বৃহত্তর যুদ্ধের প্রভাব এখন ইয়েমেনেও পড়ছে। ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা হুতিরা এই সংঘাতে নিজেদের অবস্থান আরও সক্রিয় করেছে।

ফলে ইয়েমেনের যুদ্ধের পুরনো হিসাবের সঙ্গে নতুন আঞ্চলিক শক্তির লড়াই যুক্ত হয়েছে। হুতিরা একদিকে ইয়েমেনের অভ্যন্তরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে চাইছে, অন্যদিকে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবও তাদের সামরিক সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। আর সৌদি আরব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন করার পাশাপাশি নিজের সীমান্ত ও নিরাপত্তা রক্ষায় সামরিকভাবে সক্রিয় রয়েছে। এতে সংঘাতের পরিসর আরও বড় হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

সৌদি আরবের ওপরও হামলা

এডেনে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে হামলার দিনই সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, হুতিদের ছোড়া কয়েকটি ড্রোন সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চল এবং খামিস মুশাইত শহরের দিকে যাওয়ার পথে আটকে দেওয়া হয়েছে।

এর আগে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং রিয়াদের দিকে হুতিদের হামলা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর সংঘাতের একটি নতুন দিক স্পষ্ট হচ্ছে— ইয়েমেনে চলমান যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি সৌদি ভূখণ্ডে পৌঁছে যাচ্ছে।

source: Rajneete

Back to top button