News

গাজায় প্রতি রাতে ৩০-৪০ ফিলিস্তিনিকে হত্যার আহ্বান ইসরায়েলি মন্ত্রীর

ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির বলেছেন, গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর প্রতি রাতে ‘৩০ বা ৪০ জনকে হত্যা’ করা উচিত। এ ক্ষেত্রে শুধু ওই মুহূর্তে যারা হুমকি হিসেবে বিবেচিত, তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আরও বেশি মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

সোমবার (১৭ আগস্ট) আল-জাজিরার খবরে বলা হয়, গাজায় আটক থাকা সাবেক ইসরায়েলি জিম্মি রোম ব্রাসলাভস্কির সঙ্গে এক পডকাস্টে এসব মন্তব্য করেন বেন-গভির। রোববার পডকাস্টটির একটি পর্ব প্রকাশ্যে আসে এবং ফিলিস্তিনি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ চলাকালে ব্রাসলাভস্কি সেখানে আটক ছিলেন।

গাজায় ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে হত্যাকাণ্ড চালানোর আহ্বান জানিয়ে বেন-গভির আরও বলেন, ‘সেখানে এমন মানুষ আছে, যারা বেঁচে থাকার যোগ্য নয়। তাদের বেঁচে থাকা উচিত নয়। তারা মানুষও নয়।’

বেন-গভিরের এসব মন্তব্য তার দীর্ঘদিনের চরমপন্থি বক্তব্যের ধারাবাহিকতার সর্বশেষ উদাহরণ। তিনি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোট সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একজন সদস্য। ইসরায়েলের পুলিশ ও কারা পরিষেবাও তার নিয়ন্ত্রণে। আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে নির্বাচন সামনে রেখে দেশটির রাজনীতিতে বেন-গভিরের প্রভাব আরও বেড়েছে।

আরো পড়ুন

কট্টর ডানপন্থি মন্ত্রী বেন-গভির পডকাস্টে ব্রাসলাভস্কিকে বলেন, গাজায় চলমান ‘যুদ্ধবিরতির’ মধ্যে সামরিক হামলা কমিয়ে আনার নেতানিয়াহুর সিদ্ধান্তের সঙ্গে তিনি একমত নন। তার পরিবর্তে তিনি আবারও লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড শুরু করার পক্ষে মত দেন। এমন হত্যাকাণ্ড শুধু ওই মুহূর্তে সক্রিয় হুমকি হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না বলেও তিনি মত দেন।

তবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ওপর বেন-গভিরের সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্ব নেই। ফলে তিনি নিজে কোনো হামলার নির্দেশ দিতে পারেন না। তবে তিনি ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার সদস্য। দেশটির জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীদের নিয়ে গঠিত এই মন্ত্রিসভা যুদ্ধ ও নিরাপত্তা নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আলোচনায় বেন-গভির আরও বলেন, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলে সম্প্রতি কার্যকর হওয়া মৃত্যুদণ্ডের আইনে কোনো বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলে ব্রাসলাভস্কিকে ব্যক্তিগতভাবে সেখানে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার চেষ্টা করবেন তিনি।

ব্রাসলাভস্কি বেন-গভিরকে বলেন, ‘মন্ত্রী, আমার একটি ব্যক্তিগত অনুরোধ আছে। আমি সত্যিই আপনার চোখের দিকে তাকিয়ে বলছি, আমাকে তাদের ফাঁসিতে ঝোলানোর দায়িত্ব দিন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি দড়ি চাই না; আমি বন্দুকের একটি ট্রিগার চাই। নিজের হাতে আমি ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিটি সন্ত্রাসীকে মৃত্যুদণ্ড দেবো।’

জবাবে বেন-গভির বলেন, ‘এটি বাস্তবায়ন করতে আমি পুরো বিশ্বকে ওলটপালট করে দেবো। আমি আপনার কাছে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, এটি না হওয়া পর্যন্ত আমি সবকিছু করব এবং পুরো বিশ্বকে ওলটপালট করে দেবো।’

আলোচনায় বেন-গভির গাজার ফিলিস্তিনিদের স্থায়ীভাবে সেখান থেকে চলে যেতে উৎসাহিত করারও আহ্বান জানান। একই সঙ্গে গাজায় নতুন করে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের পক্ষে মত দেন তিনি। ব্রাসলাভস্কিকে তিনি বলেন, ‘পুরো গাজাকেই আমি আমাদের বলে মনে করি।’ এর আগেও বহুবার একই ধরনের মন্তব্য করেছেন তিনি।

আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের ব্যাপক, জোরপূর্বক বা পরিকল্পিতভাবে মানুষকে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ জাতিগত নিধনের (এথনিক ক্লিনজিং) শামিল হতে পারে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবরে ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ১ হাজার ২৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

আল-জাজিরা লিখেছে, বেন-গভিরের এসব বক্তব্যের পেছনে কয়েক দশকের চরমপন্থি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ইতিহাস রয়েছে। কিশোর বয়সেই তিনি নিষিদ্ধ ঘোষিত কাহানিস্ট জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন।

মন্ত্রী হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি সামরিক আদালতে ইসরায়েলিদের ওপর প্রাণঘাতী হামলার দায়ে দোষী সাব্যস্ত ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডকে নিয়মিত শাস্তি হিসেবে চালুর পক্ষে প্রচার চালিয়ে আসছেন তিনি। একই সঙ্গে ইসরায়েলের কারাগারে আটক ফিলিস্তিনিদের জীবনযাত্রার পরিস্থিতি ইচ্ছাকৃতভাবে আরও খারাপ করার কথাও প্রকাশ্যে বলেছেন তিনি।

বেন-গভিরের এই কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশ তার ওপর নিষেধাজ্ঞাও দিয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপ তার কর্মকাণ্ডে বড় কোনো প্রভাব ফেলেনি।

source: Rajneete

Back to top button