কে এই নাভি পিল্লাই, কেন পেলেন শান্তিতে নোবেল?

বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই, রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচার, যৌন সহিংসতাকে গণহত্যার অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঐতিহাসিক নজির এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারপ্রধান হিসেবে ভূমিকা— পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজ্ঞ নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। রাষ্ট্র ও ক্ষমতাবান নেতাদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং সংঘাতের শিকার মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নরওয়ের রাজধানী অসলোতে নাভি পিল্লাইয়ের নাম ঘোষণা করে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি। পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় কেবল কূটনীতি বা যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নয়, বরং আইনের শাসন ও জবাবদিহির গুরুত্বও সামনে এনেছে কমিটি।
পিল্লাইকে পুরস্কার দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কমিটি বলেছে, তিনি ‘শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায়’ অবদান রেখেছেন। তার দীর্ঘ কর্মজীবনের একটি সাধারণ সূত্র হলো— বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা এবং নেলসন ম্যান্ডেলার মতো ব্যক্তিদের পক্ষে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে সমসাময়িক বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিচারিক কার্যক্রমে দায়িত্ব পালন।
কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, পিল্লাই সহিংসতা ও সংঘাতের শিকার মানুষের জন্য আশার আলো হয়ে উঠেছেন এবং রাষ্ট্র ও জাতীয় নেতাদের জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছেন। আন্তর্জাতিক আইনের নীতিগুলো রক্ষায় তার দৃঢ় অবস্থান ও নৈতিক সাহসকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে কমিটি।
বর্ণবৈষম্যের সমাজ থেকে আন্তর্জাতিক বিচারাঙ্গনে
১৯৪১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানের ক্লেয়ারউডে জন্ম নাভানেথেম পিল্লাইয়ের। ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত এই আইনজ্ঞের বেড়ে ওঠা বর্ণবৈষম্যভিত্তিক শাসনব্যবস্থার মধ্যে। তার বাবা ছিলেন বাসচালক। আট সন্তানের পরিবারে বেড়ে ওঠা পিল্লাই ছোটবেলা থেকেই অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও বর্ণভিত্তিক বৈষম্যের বাস্তবতা দেখেছেন।
তৎকালীন দক্ষিণ আফ্রিকায় কৃষ্ণাঙ্গ ও অন্যান্য অশ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর মানুষের জন্য শিক্ষা, পেশা ও সামাজিক জীবনে নানা বাধা ছিল। এই বাস্তবতা তার পরবর্তী কর্মজীবনে মানবাধিকার ও সমতার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
পিল্লাই নাটাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৬৩ সালে স্নাতক এবং ১৯৬৫ সালে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮২ সালে আইনে স্নাতকোত্তর এবং ১৯৮৮ সালে আইনশাস্ত্রে উচ্চতর গবেষণাভিত্তিক ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৬৭ সালে তিনি নাটাল প্রদেশে নিজের আইনচর্চা শুরু করেন। সে সময় ওই অঞ্চলে আইন পেশায় প্রতিষ্ঠা পাওয়া নারীদের জন্য সহজ ছিল না; বর্ণবৈষম্যের কারণে অশ্বেতাঙ্গদের বাধার মুখেও পড়তে হতো। পিল্লাই হন নাটালে নিজস্ব আইনচর্চা শুরু করা প্রথম নারী এবং দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী বিচারক।
আইনজীবী হিসেবে তিনি বর্ণবৈষম্যবিরোধী কর্মী ও রাজনৈতিক বন্দিদের পক্ষে কাজ করেন। কারাগারে বন্দিদের ওপর নির্যাতন এবং তাদের মৌলিক অধিকার হরণের বিষয়গুলো সামনে আনেন। রবেন আইল্যান্ডের মতো কারাগারে বন্দিদের আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
তার কর্মজীবনের শুরুতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, আইনের শাসন কেবল রাষ্ট্রের ক্ষমতা পরিচালনার নিয়ম নয়; ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে মানুষকে রক্ষা করারও একটি উপায়।
দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যের অবসানের পর পিল্লাইয়ের কাজ জাতীয় গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় বিস্তৃত হয়।
রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচারে ঐতিহাসিক ভূমিকা
১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় সংঘটিত গণহত্যার পর অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ফর রুয়ান্ডা (আইসিটিআর) গঠন করে। গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘনের বিচার ছিল এই ট্রাইব্যুনালের দায়িত্ব।
১৯৯৫ সালে পিল্লাই ট্রাইব্যুনালের বিচারক নিযুক্ত হন। ১৯৯৯ সালে তিনি এর সভাপতি হন এবং ২০০৩ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে তার কাজ আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদানগুলোর একটি হলো জ্যঁ-পল আকায়েসুর বিচার। রুয়ান্ডার তাবা এলাকার সাবেক মেয়র আকায়েসুর বিরুদ্ধে গণহত্যায় ভূমিকা রাখার অভিযোগ ছিল। ১৯৯৮ সালে ট্রাইব্যুনাল তাকে গণহত্যার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে।
এই মামলার ঐতিহাসিক গুরুত্ব শুধু একজন অপরাধীর সাজা নিশ্চিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। রায়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠিত হয়, নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার অভিপ্রায়ে সংঘটিত ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা গণহত্যার অপরাধের অংশ হতে পারে।
এর আগে যুদ্ধ ও সংঘাতের সময় যৌন সহিংসতার ঘটনাগুলো অনেক ক্ষেত্রেই মূল অপরাধের তুলনায় কম গুরুত্ব পেত। আকায়েসু মামলার রায় সেই ধারণা বদলে দিতে সাহায্য করে। যৌন সহিংসতাকে যুদ্ধের অনিবার্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে না দেখে, পরিকল্পিত নিপীড়ন এবং কোনো জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার কৌশল হিসেবেও বিবেচনার পথ খুলে দেয়।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এই নজির আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। সংঘাতের মধ্যে যৌন সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা ও ন্যায়বিচারের দাবিকে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার কেন্দ্রে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে পিল্লাইয়ের ভূমিকা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ও বৈশ্বিক বিচারব্যবস্থা
রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনালে কাজের পর ২০০৩ সালে পিল্লাই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিচারক নির্বাচিত হন। নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত এই আদালত গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ এবং আগ্রাসনের অপরাধের মতো গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার করে।
২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি আদালতের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার কাজের বড় অংশজুড়েই ছিল আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার, মানবিক আইন এবং সংঘাতের মধ্যে যৌন সহিংসতার মতো বিষয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো, গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধীদের পরিচয় বা রাজনৈতিক ক্ষমতা যেন বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে। তবে এসব আদালতের এখতিয়ার, রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকরের সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
পিল্লাইয়ের কর্মজীবন এই বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত। আন্তর্জাতিক আইনের নীতি প্রতিষ্ঠা করা এক বিষয়, আর সেই আইন কার্যকর করে ক্ষমতাবান ব্যক্তি ও রাষ্ট্রকে জবাবদিহির আওতায় আনা আরেক বিষয়। তার অবদানের স্বীকৃতিতে নোবেল কমিটি দ্বিতীয় কাজটির গুরুত্বও তুলে ধরেছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারপ্রধান হিসেবে ছয় বছর
২০০৮ সালে পিল্লাই জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার নিযুক্ত হন। ১ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি ২০১৪ সাল পর্যন্ত এই পদে ছিলেন। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সর্বোচ্চ কর্মকর্তা হিসেবে তার দায়িত্ব ছিল বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার সুরক্ষা, লঙ্ঘনের ঘটনা পর্যবেক্ষণ এবং রাষ্ট্রগুলোকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড মেনে চলতে উৎসাহিত করা।
তার মেয়াদে সংঘাত, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নারী ও শিশুদের অধিকার এবং সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার মতো বিষয়গুলোতে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের ভূমিকা গুরুত্ব পায়।
পিল্লাই মানবাধিকারকে কেবল রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয় হিসেবে দেখেননি। তার দৃষ্টিভঙ্গিতে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের পাশাপাশি রাষ্ট্রের ভেতরে বসবাসকারী মানুষের অধিকারও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রে থাকা প্রয়োজন।
জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব বান কি মুন ২০১৪ সালে তার দায়িত্বের প্রশংসা করে বলেছিলেন, পিল্লাই বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের অধিকারের পক্ষে নির্ভরযোগ্য ও কার্যকর কণ্ঠস্বর ছিলেন। তার নেতৃত্বে মানবাধিকারকে জাতিসংঘের কাজের কেন্দ্রে নিয়ে আসা এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকির বিষয়ে দ্রুত সাড়া দেওয়ার প্রচেষ্টার কথাও উল্লেখ করা হয়।
এই পদে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে পিল্লাই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থার অন্যতম পরিচিত ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন।
নারী অধিকার ও আইনের চোখে সমতা
পিল্লাইয়ের অবদান আন্তর্জাতিক আদালত বা জাতিসংঘের দায়িত্বে সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যের অবসানের পর নতুন সাংবিধানিক কাঠামোয় সমতার নীতি প্রতিষ্ঠার কাজেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
দেশটির উইমেনস ন্যাশনাল কোয়ালিশনের সদস্য হিসেবে তিনি সংবিধানে সমতাসংক্রান্ত বিধান অন্তর্ভুক্তির প্রচেষ্টায় অংশ নেন। এই বিধানের লক্ষ্য ছিল বর্ণ, লিঙ্গ, ধর্ম ও যৌন অভিমুখিতার ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা।
১৯৮৫ সালে তিনি আন্তর্জাতিক নারী অধিকার সংগঠন ‘ইকুয়ালিটি নাউ’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা হন। সংগঠনটি আইন ও নীতির মাধ্যমে নারী ও মেয়েদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বৈষম্য দূর করার জন্য কাজ করে।
নারী অধিকার নিয়ে তার কাজের সঙ্গে রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনালে যৌন সহিংসতাকে গণহত্যার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই তার কাজের কেন্দ্রে ছিল— যে ধরনের বৈষম্য বা সহিংসতা দীর্ঘদিন স্বাভাবিক বলে বিবেচিত হয়েছে, তাকে আইনের ভাষায় চিহ্নিত করা এবং অপরাধের দায় নির্ধারণ করা।
গাজা তদন্ত ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাম্প্রতিক ভূমিকা
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দায়িত্ব ছাড়ার পরও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও বিচারসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থেকেছেন পিল্লাই।
অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড, পূর্ব জেরুজালেম ও ইসরায়েল নিয়ে জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সভাপতিত্ব করেছেন তিনি। গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কমিশন ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এবং হামাসসহ ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ড তদন্ত করে।
২০২৪ সালে প্রকাশিত কমিশনের অনুসন্ধানে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান ও হামলার ক্ষেত্রে যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ তুলে ধরা হয়। হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীর ৭ অক্টোবরের হামলাও কমিশনের তদন্তের আওতায় ছিল।
২০২৫ সালে কমিশন গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করে। ইসরায়েল এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের অনুসন্ধান ও সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আদালতের চূড়ান্ত রায়ের সমতুল্য নয়। এগুলো তদন্তভিত্তিক মূল্যায়ন, যার আইনগত প্রভাব ও পরিণতি আলাদা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।
গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) পিল্লাই গাম্বিয়ার মনোনীত *অ্যাড হক* বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। মামলাটিতে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ এবং গণহত্যা সনদ অনুযায়ী মিয়ানমারের দায় নিয়ে বিচার চলছে। অ্যাড হক বিচারক কোনো আদালতের স্থায়ী সদস্য নন; নির্দিষ্ট মামলায় সংশ্লিষ্ট পক্ষের মনোনয়নে দায়িত্ব পালন করেন।
এই দুই ক্ষেত্রই দেখায়, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণহত্যার অভিযোগের বিচার কেবল অতীতের অপরাধের হিসাব নেওয়ার বিষয় নয়। বর্তমান সংঘাতেও আন্তর্জাতিক আইন কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, সেটিও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কেন নাভি পিল্লাইকেই বেছে নিল নোবেল কমিটি
নোবেল শান্তি পুরস্কার সাধারণত কূটনৈতিক উদ্যোগ, নিরস্ত্রীকরণ, মানবাধিকার, সংঘাত নিরসন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া হয়। পিল্লাইয়ের ক্ষেত্রে কমিটি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে আন্তর্জাতিক আইন ও আইনের শাসনকে শান্তির ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায়।
তার কর্মজীবনের ধারাবাহিকতা লক্ষণীয়। প্রথমে বর্ণবৈষম্য ও রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার মানুষের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে কাজ, পরে গণহত্যার বিচারে বিচারক হিসেবে ভূমিকা, এরপর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারপ্রধানের দায়িত্ব— প্রতিটি পর্যায়ে তিনি আইনের মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহার মোকাবিলার চেষ্টা করেছেন।
নোবেল কমিটির বক্তব্যের তাৎপর্য এখানেই। শান্তি মানে শুধু অস্ত্রবিরতি বা যুদ্ধ বন্ধ হওয়া নয়; সংঘাতের শিকার মানুষের অধিকার স্বীকার করা, অপরাধের বিচার করা এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরাধ ঠেকানোর জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলাও শান্তির অংশ।
তবে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক স্বার্থ, আদালতের এখতিয়ার এবং রায় কার্যকরের সক্ষমতা ন্যায়বিচারকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি সেই আইন কার্যকর করার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করাও জরুরি।
নাভি পিল্লাইয়ের নোবেল প্রাপ্তি সেই প্রয়োজনকেই সামনে এনেছে। তার কর্মজীবন দেখায়, বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে শুরু করে গণহত্যার বিচার কিংবা আধুনিক যুদ্ধের মানবাধিকারগত পরিণতি— সব ক্ষেত্রেই ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি শান্তির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার তাই একজন আইনজ্ঞের দীর্ঘ কর্মজীবনের স্বীকৃতি হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি একটি বার্তাও: সংঘাতের অবসান ঘটাতে হলে কেবল শক্তির ভারসাম্য নয়, আইনের শাসন, মানবিক মর্যাদা এবং জবাবদিহির ব্যবস্থাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
তথ্যসূত্র:
রয়টার্স, সাউথ আফ্রিকান হিস্টোরি অনলাইন (sahistory.org.za), আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট, জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ওয়েবসাইট
source: Rajneete







