সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে বাংলাদেশি বলে ফেরত পাঠানো যাবে না: কলকাতা হাইকোর্ট

প্রতিবেশীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে মুর্শিদাবাদের এক ব্যক্তিকে আটকে রাখা ও বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কলকাতা হাইকোর্ট। বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য বলেছেন, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কেবল সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে ফেরত পাঠানো যায় না।
বিচারপতি বলেন, কোনো ব্যক্তির জাতীয়তা নির্ধারণের জন্য কর্তৃপক্ষকে স্পষ্ট ও যাচাইযোগ্য প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণের যথেষ্ট সুযোগও দিতে হবে। সত্তরের দশকে কত মানুষ সীমান্ত পেরিয়েছিলেন? তাদের সবাইকে কি ফেরত পাঠানো সম্ভব?’
দ্য টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, আটক ওই ব্যক্তির স্ত্রী ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিসের (এফআরআরও) জারি করা আদেশ এবং তার স্বামীকে আটকে রাখার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আবেদন করেন। তার আইনজীবী রবিউল ইসলাম আদালতকে জানান, কয়েকজন প্রতিবেশীর বক্তব্য থেকে তৈরি সন্দেহের ভিত্তিতে গত ৮ আগস্ট থেকে তাকে আটক রাখা হয়েছে।
কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতির এই পর্যবেক্ষণ এমন একসময়ে এলো, যখন ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কথিত অবৈধ বাংলাদেশি শনাক্ত ও বহিষ্কারের অভিযান এবং নাগরিকত্বের নথি যাচাই নিয়ে বিতর্ক চলছে।
বিচারপতি ভট্টাচার্য বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আটক ব্যক্তিকে নিজের বক্তব্য ও নাগরিকত্বের প্রমাণ উপস্থাপনের সুযোগ দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। প্রায় দুই মাস ধরে তাকে আটক রাখার কারণ কী, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তিনি আবাও স্পষ্ট ভাষায় বলেন, জাতীয়তা নির্ধারণে কর্তৃপক্ষকে ‘স্পষ্ট ও প্রমাণযোগ্য প্রক্রিয়া’ অনুসরণ করতে হবে।
শুনানিতে বিচারপতি প্রশ্ন করেন, কয়েকজনের বক্তব্যের ভিত্তিতে কীভাবে কারও জাতীয়তা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব? যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কাউকে আটক রাখা যায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আদালতকে রাজ্য সরকারের পক্ষে অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল রাজদীপ মজুমদার জানান, আটক ব্যক্তি জাল নথির ভিত্তিতে ভোটার কার্ড, আধার ও প্যান কার্ডের মতো পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে থাকতে পারেন। তিনিও আদালতকে এ বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ দিতে পারেননি।
বিচারপতি জানান, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নির্বাসনাদেশ আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে মামলাটি উপযুক্ত বেঞ্চে শুনানির জন্য তিনি হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে ফেরত পাঠান।
বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর অভিযান নিয়ে বিতর্ক
ভারতের বিভিন্ন বিজেপিশাসিত রাজ্যে গত বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম শ্রমিকদের বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে আদালত বা ট্রাইব্যুনালের আদেশ ছাড়াই সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের সহায়তায় তাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার কয়েক দিনের মধ্যে রাজ্য সরকার ‘আটক, বাদ, বহিষ্কার’ নীতি ঘোষণার কথা জানায়। এ নীতির আওতায় বাংলাদেশি বলে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ‘হোল্ডিং সেন্টারে’ আটকে রেখে দ্রুত বাংলাদেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়।
এর আগে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো এক নারী ও দুই শিশুসহ চার ভারতীয় আদালতের নির্দেশে গত জুলাইয়ে মালদার মহদীপুর স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে ফিরে আসেন। বাংলাদেশে তাদের প্রায় এক বছর কাটাতে হয়েছিল।
সাম্প্রতিক সময়েও এ ধরনের অভিযান চলছে। চলতি সপ্তাহে জম্মু-কাশ্মির থেকে কথিত অবৈধ অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত ১৫০ জনকে ভারতীয় বিমানবাহিনীর বিশেষ উড়োজাহাজে পশ্চিমবঙ্গের বাগডোগরায় নেওয়া হয়। সেখান থেকে তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয় বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
জম্মু-কাশ্মির পুলিশের তথ্যের বরাতে প্রায় ৫০০ জনকে আটক করার কথা খবর দিয়েছে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো। তাদের অধিকাংশ বাংলাদেশি বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ। তবে আটক ব্যক্তিদের প্রত্যেকের জাতীয়তা কীভাবে যাচাই করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এর আগে জুনে গুজরাটে ‘অপারেশন ডেল্টা হান্ট’ নামে এক অভিযানে বাংলাদেশি বলে সন্দেহভাজন ৩৬২ জনকে আটক করার কথা জানায় রাজ্য সরকার। এর মধ্যে আহমেদাবাদ শহর থেকেই আটক করা হয় ১৬৬ জনকে। পুলিশ তখন কয়েকজনের আধার কার্ড অবৈধভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে কি না, তা তদন্তের কথা জানিয়েছিল।
নাগরিকত্ব ও ভোটার তালিকা ঘিরে বিতর্ক
নাগরিকত্বের নথি, পরিচয় ও ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ভারতে জাতীয় পর্যায়েও তীব্র বিতর্ক চলছে। দেশটির ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়া নিয়ে বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠন আপত্তি জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, প্রকৃত ভোটারদেরও তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের অনেক মানুষ সরকারি কল্যাণমূলক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে বহিষ্কৃত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দেশ জুড়ে বিক্ষোভও ছড়িয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
source: Rajneete






