অযত্নে নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার রেসকিউ বোট, উধাও যন্ত্রাংশ

পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় দুর্গত মানুষকে দ্রুত উদ্ধারের লক্ষ্যে শেরপুরে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল কোটি টাকা মূল্যের দুটি ‘মাল্টিপারপাস রেসকিউ বোট’। কিন্তু বরাদ্দের কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও বোট দুটি কোনো কাজে লাগানো হয়নি। পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির অভাবে একটি বোট মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে, অন্যটি নদীতে ভাসছে অর্ধডুবন্ত অবস্থায়। ইতিমধ্যে বোট দুটির মূল্যবান কিছু যন্ত্রাংশও চুরি হয়ে গেছে।
ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা হওয়ায় শেরপুরের সদর, শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্রতিবছরই পাহাড়ি ঢলের ঝুঁকিতে থাকে। বর্ষা মৌসুমে স্থানীয় বাসিন্দাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এ পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধারকাজে গতি আনতে ও জরুরি সেবা পৌঁছাতে ২০২২ সালের ২৬ এপ্রিল ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ‘বহুমুখী উদ্ধার ও অনুসন্ধান কাজের জন্য নৌযান সংগ্রহ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ’ প্রকল্পের আওতায় বোট দুটি বরাদ্দ দেয়। ‘গজনী-১’ ও ‘গজনী-২’ নামের এই নৌযান দুটির প্রতিটির দৈর্ঘ্য ৫৪ ফুট, প্রস্থ সাড়ে ১২ ফুট এবং যাত্রী ধারণক্ষমতা ৮০ জন।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, সদর উপজেলার কামারেরচর ইউনিয়নের পুরাতন ব্রহ্মপুত্র ও দশানী নদীর মোহনায় অযত্নে পড়ে আছে নৌযান দুটি। দীর্ঘদিন খোলা আকাশের নিচে থাকায় বোট দুটিতে মরিচা ধরেছে। একটির বড় অংশ কাদামাটিতে দেবে গেছে, অন্যটি নদীতে অর্ধেক ডুবে আছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্যোগের সময় জীবন রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখার কথা থাকলেও বোট দুটি কখনো কোনো উদ্ধার অভিযানে ব্যবহার করা হয়নি। ফলে সরকারি এই উদ্যোগ ও অর্থ ব্যয় পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
৬নং চরের বাসিন্দা মিলন মিয়া বলেন, বন্যার সময় ছোট নৌকা দিয়ে চরম ঝুঁকিতে পারাপার হতে হয়। অথচ এত বড় দুইডা বোট কোনোদিন চলতে দেখলাম না। পানির সময় মানুষের কাজে না লাগলে এগুলো ফেলে রেখে লাভ কী?
একই এলাকার বাসিন্দা আল-আমিন ও পয়াস্তিরচরের রমজান আলী জানান, পানি বাড়লে অসুস্থ ব্যক্তি, বয়স্ক ও শিশুদের নিয়ে চরম বিপদে পড়তে হয়। বোট দুটি সচল থাকলে নিরাপদে যাতায়াত করা যেত। কিন্তু এখন মনে হয় বোটগুলো কেবল নামেই আছে, কামে নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা হারেজ আলী প্রস্তাব দিয়ে বলেন, শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী বা নালিতাবাড়ীতে পাহাড়ি ঢলের দুর্যোগ বেশি। নদী মোহনায় ফেলে রেখে নষ্ট না করে বোট দুটি ঠিকঠাক করে ঢলপ্রবণ এলাকাগুলোতে পাঠিয়ে দিলে মানুষের উপকার হতো।
জানা গেছে, শুরুতে নৌযান দুটি চালনা ও দেখভালের জন্য মাস্টাররোলে দুজন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তবে দীর্ঘ দিন বেতন-ভাতা না পেয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ায় তারা দায়িত্ব ছেড়ে দেন। এরপর থেকে বোট দুটি অরক্ষিত হয়ে পড়ে।
সাবেক বোটচালক সাইদুল ইসলাম বলেন, বেতন না পেয়ে বাধ্য হয়ে চাকরি ছাড়তে হয়েছে। নিয়মিত চালানো ও রক্ষণাবেক্ষণ না করায় ইঞ্জিনসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে। সময়মতো সংস্কার না করলে এগুলো পুরোপুরি অকেজো হয়ে যাবে।
আরেক চালক সমেশ মারাং সাংমা জানান, নৌযান সচল রাখতে নিয়মিত তদারকি ও সার্ভিসিং জরুরি। প্রয়োজনীয় সংস্কার ও জনবল দিলে বোট দুটি আবারও উদ্ধারকাজে ব্যবহার উপযোগী করা সম্ভব।
কামারেরচর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবু সাঈদ আরজু বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই বোট দুটি অচল অবস্থায় পড়ে আছে। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। বোট দুটি দ্রুত সংস্কার করে সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. রোকনুজ্জামানের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন জানান, তিনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে বোট দুটি সরেজমিনে পরিদর্শন করবেন এবং পরিদর্শন শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
source: Asia Post







