News

ইন্টারনেট বন্ধের সময় যেভাবে চলত শেখ হাসিনার গোপন যোগাযোগ

জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে পুরো দেশে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখা হলেও থামেনি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যোগাযোগ। ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্রে নেওয়া গোপন মোবাইল নম্বর আর স্যাটেলাইট ফোন ব্যবহার করে তিনি শেষ মুহূর্তের নানা নির্দেশনা দেওয়া ও নিজের যোগাযোগ রক্ষা করেছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ডিজিটাল ফরেনসিক দল শেখ হাসিনার সেই গোপন টেলিকম নেটওয়ার্ক ও দেশ ছেড়ে যাওয়ার সময়কার চাঞ্চল্যকর সব তথ্য উন্মোচন করেছে।

২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে ফুঁসে ওঠে সারাদেশের রাজপথ। আন্দোলন দমাতে সরকার দেশজুড়ে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট সৃষ্টি করে। সাধারণ মানুষের ডিজিটাল যোগাযোগের পথ বন্ধ রেখে চলে নির্মম হত্যাযজ্ঞ। পুরো দেশ বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেও গণভবনে ইন্টারনেটের গতিতে কোনো প্রভাব পড়েনি। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের (বর্তমানে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট) বিশেষ ব্যাকআপ ব্যবস্থার মাধ্যমে শেখ হাসিনার জন্য হাই-স্পিড ইন্টারনেট চালু রাখা হয়। এমনকি গণভবনের ছাদে বসানো হয়েছিল টাওয়ার ডাম্প, ট্রাইব্যুনালের প্রযুক্তি দল যার অকাট্য প্রমাণ খুঁজে পেয়েছে।

এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা জানান, ওই সময়ে সারাদেশে ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হলেও বিশেষ ব্যাকআপের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের সংযোগ ছিল গণভবনে। সেখানে কনফিগার করে উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যবহার করা হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, আগস্টের ১ তারিখেই মাঠের পরিস্থিতি বুঝে যান ক্ষমতাচ্যুত সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। ৩ আগস্ট আন্দোলনের একদফা দাবি ঘোষণার পর শেখ হাসিনার ফোন থেকে অন্তত ৭০টি নম্বরে যোগাযোগ করা হয়। এর মধ্যে ১১টি নম্বরের নাম, ছবি ও এনআইডি তথ্য থাকলেও বাস্তবে সেসব ব্যক্তিদের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।

পরদিন ৪ আগস্ট নিজের নিয়মিত ব্যবহার করা ফোন নম্বরের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় পড়েন শেখ হাসিনা। তখন তিনি যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন স্যাটেলাইট ফোন এবং গণভবনের কর্মীদের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর। এই স্যাটেলাইট ফোনের মাধ্যমেই তিনি সরাসরি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে যোগাযোগ করে সাময়িক আশ্রয়ের আবেদন জানান।

নয়াদিল্লির সবুজ সংকেত পাওয়ার পরপরই শুরু হয় দ্রুত দেশ ত্যাগের প্রস্তুতি। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এমআই-১৭ হেলিকপ্টারে চেপে শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা পৌঁছান কুর্মিটোলার এয়ার মুভমেন্টে। সেখানকার ভিআইপি রুমে কাটানো মাত্র ২০ মিনিটে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপ সারেন শেখ হাসিনা। এর মধ্যে একটি ছিল বিদেশে অবস্থানরত তার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নামে নিবন্ধিত নম্বর—যেটি মূলত সক্রিয় ছিল দেশেই। আর অন্য ফোনালাপটি করেন হেলিকপ্টার উড্ডয়নের ঠিক এক মিনিট আগে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ১ আগস্ট থেকেই নিকটাত্মীয় ও স্বজনদের গোপনে দেশ ছেড়ে যাওয়ার বার্তা পাঠাতে থাকেন শেখ হাসিনা। তবে সেসব এসএমএসের ফরেনসিক পরীক্ষা এখনও শেষ হয়নি।

এদিকে, শেখ হাসিনার এসব গোপন যোগাযোগের সব তথ্যই মুছে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন গুমের মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান। তিনি তার জলসিড়ির বাসভবনে তৈরি করেছিলেন নিজস্ব একটি সার্ভার সিস্টেম।

এ বিষয়ে ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা জানান, ওই ভবনে স্বাভাবিক বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল না। তিনি জোরপূর্বক স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বরাদ্দ নিয়েছিলেন। অর্থাৎ, সেখানে তিনি নিজস্ব এক ‘ডিজিটাল আয়নাঘর’ গড়ে তুলেছিলেন।

সূত্র: যমুনা টিভি

source: Asia Post

Back to top button