হাসপাতালে গেছে ৪৫ হাজার টাকা, এখনও ব্যথায় কাতরাচ্ছেন তামান্না

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চার দিনের চিকিৎসায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে রাজধানীর বনশ্রীর বাসিন্দা নাজমুন নাহার তামান্নার (৩১)। দেড় মাস পার হলেও এখনও শরীরের ব্যথায় কাতরাচ্ছেন তিনি। মাঝেমধ্যেই কাঁপুনি ওঠে। সিঁড়ি বেয়ে ওঠাও কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
নাজমুন নাহার তামান্না এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে সরকারি হাসপাতালে যাওয়ার চিন্তা করি। কিন্তু ঠিকমতো চিকিৎসা পাব কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট চিন্তায় ছিলাম। তাই গত ৮ আগস্ট বাড্ডার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হই।’
চার দিনের চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরলেও ডেঙ্গুর জটিলতা এখনও ভোগাচ্ছে তাকে। তামান্না বলেন, ‘চার দিনে হাসপাতালের বেড ভাড়া, স্যালাইন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও খাওয়াদাওয়া মিলিয়ে ৪৫ হাজার টাকা গেছে। যাতায়াত ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য খরচ মিলিয়ে অন্তত ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। দেড় মাস হলো বাসায় ফিরেছি। এখনও শরীরের ব্যথায় কাতরাচ্ছি। প্রায় সময় শরীর কাঁপে, সিঁড়ি বেয়ে উঠতে অনেক কষ্ট হয়।’ শুধু তামান্না নন, একই অভিজ্ঞতা আরও হাজারো রোগীর। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেও শরীরের ব্যথায় ভুগছেন অনেকে।
সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোতে এখন রোগীর তীব্র চাপ। ফলে বাধ্য হয়ে অনেককে বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। এতে বিপাকে পড়ছে নিম্ন ও মধ্য আয়ের পরিবারগুলো।
সরকারির ১০ গুণ বেশি ব্যয় বেসরকারিতে
রাজধানীর বাড্ডা, ধানমন্ডি, মহাখালী ও আগারগাঁও এলাকার সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের খরচের পার্থক্য অনেক বেশি। রোগীদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারি হাসপাতালে পাঁচ দিনের চিকিৎসায় সর্বমোট খরচ তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা।
একই চিকিৎসায় বেসরকারিতে খরচ হাসপাতাল ভেদে ১০ থেকে ১২ গুণ বেশি। এটি শুধু সাধারণ ওয়ার্ডের চিত্র। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) বা হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে (এইচডিইউ) ভর্তি হলে এই ব্যবধান আরও বাড়ে।
ধানমন্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতালে পাঁচ দিন ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিয়েছে পাঁচ বছরের সিয়াম। এতে তার পরিবারকে গুনতে হয়েছে ৭০ হাজার টাকা।
সিয়ামের বাবা আলতাফ হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ডাক্তার বলেছিল ডেঙ্গু চিকিৎসায় তেমন খরচ নেই। শুধু ফ্লুইড (স্যালাইন) দিয়েছে। এ ছাড়া ওয়ার্ডে বেড ভাড়া আর প্রতিদিন কয়েকটি পরীক্ষা করেছে। তাতে শুধু হাসপাতালকে দিতে হয়েছে ৬২ হাজার টাকা। আর দুজন মানুষের যাতায়াত ও খাওয়ার পেছনে গেছে ৮ হাজার টাকার মতো। সব মিলিয়ে পাঁচ দিনে ৭০ হাজার টাকা গেছে।’
ডেঙ্গু আক্রান্ত ছেলে মেহমেদ আয়াজকে (৫) আগারগাঁওয়ের শিশু হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন বাবা ইলিয়াস হোসেন। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, এক নম্বর ওয়ার্ডের ডেঙ্গু কর্নারে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাসায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইলিয়াসের পরিবার।
ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘এটি প্রায় সরকারি হাসপাতাল। ডাক্তাররা সবসময় আসেন, নার্সরাও প্রতিনিয়ত খবর নেন। ভর্তির প্রথম দিনে (১৫ সেপ্টেম্বর) বহির্বিভাগে ১২০ টাকা, কয়েকটি রক্ত পরীক্ষায় এক হাজার ৯৫০ টাকা গেছে। এর বাইরে সিরিঞ্জ, ক্যানুলা দেওয়ার জন্য ক্যাথেটারসহ কিছু উপকরণ কিনতে ৩০০ টাকার মতো গেছে। এ ছাড়া যাতায়াত ও খাওয়া খরচ মিলিয়ে পাঁচ দিনে সাড়ে চার হাজার টাকার মতো গেছে।’
শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সরাসরি সরকারি হাসপাতাল না হলেও আমরা একেবারে স্বল্পমূল্যে চিকিৎসা দেই। তারপরও যে হারে রোগী আসে, সেভাবে সেবা দিতে পারি না। প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী আসে। কারণ, মানুষের আস্থা তৈরি হয়েছে আমাদের ওপর। কিন্তু সক্ষমতার অভাবে আমাদের অনেক কিছুই করা সম্ভব হয় না।’
তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর মূল চিকিৎসা স্যালাইন। বেসরকারি অনেক হাসপাতালে নানা বাহানায় রোগীদের পকেট কাটে, কিন্তু আমরা সেটি করতে পারি না।’
ঢাকার বাইরের রোগীর চাপ বাড়ছে
চলতি সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ এবং অক্টোবরের শুরুর দিকে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। সম্প্রতি রাজধানীতে এক সেমিনারে দেওয়া বক্তব্যে এমন আশঙ্কার কথা জানান স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত।
এর মধ্যেই হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর ভিড় আরও বাড়তে শুরু করেছে। শয্যা না পেয়ে মেঝেতেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে অনেক রোগীকে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে থেকে আসা রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা।
দেশে সর্বোচ্চ ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হওয়া হাসপাতালগুলোর একটি মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। চলতি বছরের শুরু থেকে শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টা পর্যন্ত এখানে চিকিৎসা নিয়েছেন এক হাজার ৬৮৮ জন। এর মধ্যে বেশিরভাগই সুস্থ হয়ে ফিরেছেন। মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের। শনিবার মোট ৪৯ জন ভর্তি থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় বিশেষায়িতভাবে রাখা হয়েছে ৩৮টি শয্যা। তবে রোগীর চাপে অনেককে মেঝে ও বারান্দায় মশারি টাঙিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। শনিবার দুপুরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সেখানে ১৪৫ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে অধিকাংশকেই বাসায় চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
শয্যা না পেয়ে বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছেন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের বাসিন্দা আফরিন আক্তার (৩৫)। তার মা বলেন, ‘ছয় দিন ধরে শরীরে প্রচুর ব্যথা, জ্বর ও বমি হয়। বেসরকারিতে চিকিৎসা নিতে অনেক টাকা লাগে। তাই এখানে এনেছি। কিন্তু বেড নেই। অবস্থা খারাপ দেখে ডাক্তার বারান্দাতেই চিকিৎসা নিতে হবে জানিয়ে ভর্তি দিয়েছেন।’
নার্সদের সাব-ইনচার্জ নাসিমা বলেন, ‘প্রতিদিনই ঢাকার বাইরে থেকে রোগী আসছে এবং সংখ্যাটা অনেক। যেখানে ৩৮টি শয্যা রয়েছে, সেখানে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৪৫ জন রোগীকে রিসিভ করা হয়েছে। রোগী আসলে চিকিৎসা তো দিতেই হবে। তবে সবাইকে ভর্তি করানোর সুযোগ নেই। যাদের অবস্থা জটিল, কেবল তাদের ফ্লোরে হলেও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’
রোগীর চাপ শুধু মুগদা মেডিকেলে সীমাবদ্ধ নয়। ঢাকা মেডিকেল, মিটফোর্ড হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল, কুর্মিটোলা হাসপাতালেও প্রতিদিন বাড়ছে রোগীর চাপ। এসব জায়গায় ভর্তি হওয়া রোগীদের বড় একটি অংশই ঢাকার বাইরে থেকে আসা।
৫২ জেলায় সংক্রমণ বেড়েছে
চলতি বছর ডেঙ্গুর মৌসুম শুরু হতে না হতেই দেশের ৬৪ জেলায় এর প্রকোপ দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ৫২ জেলায় সংক্রমণ বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে।
২০২৫ সালের শুরু থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৪১ হাজার ৯১, মৃত্যু হয় ১৬৭ জনের। চলতি বছরের একই সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা ৬০ হাজার ৩৭৯। মৃত্যু হয়েছে ১৭৮ জনের।
গত বছর এই সময়ে ডেঙ্গুর সবচেয়ে বড় হটস্পট ছিল বরিশাল বিভাগের জেলা বরগুনা। এবার সেই জায়গা নিয়েছে পাশের বিভাগ খুলনা। শুধু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল নয়, ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, পাবনা, চট্টগ্রাম এবং উত্তরাঞ্চলের একাধিক জেলায়ও প্রকোপ বাড়ছে।
সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ বেড়েছে গোপালগঞ্জে, প্রায় ২৪ দশমিক ৮ গুণ। এরপর রয়েছে দিনাজপুর, খুলনা, বাগেরহাট, কুড়িগ্রাম ও রংপুর। গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গোপালগঞ্জে রোগীর সংখ্যা ছিল ২১ জন। চলতি বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫২০ জনে। দিনাজপুরে রোগী বেড়েছে প্রায় ১২ গুণ, খুলনায় ১৭ গুণ, বাগেরহাটে ১৩ গুণ, রংপুরে পাঁচ গুণ এবং কুড়িগ্রামে ১৪ গুণেরও বেশি।
টিকাতেই সমাধান
ডেঙ্গুর মতো ভয়ংকর ভাইরাস মোকাবিলায় টিকাদানকেই একমাত্র কার্যকর উপায় বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ভারতে বর্তমানে একটি টিকার প্রক্রিয়া চলমান। টিকাটি সফল হলে এবং দেশের প্রতিটি মানুষকে দেওয়া সম্ভব হলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গুকে আর মৌসুমি রোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। যদি আগামী তিন দশকও ডেঙ্গু বাংলাদেশের বাস্তবতা হয়ে থাকে, তাহলে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের বর্তমান বিচ্ছিন্ন, খণ্ডিত ও প্রকল্পনির্ভর পদ্ধতি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট মোকাবিলা করা যাবে না। এ জন্য দরকার দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত জাতীয় কৌশল।’
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত এডিস জরিপ, ওয়ার্ডভিত্তিক ঝুঁকির মানচিত্র, আধুনিক ল্যাবরেটরি, কীটনাশকের কার্যকারিতা পরীক্ষা, স্বাধীন মূল্যায়ন ও জলবায়ু বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা তৈরি জরুরি বলে মনে করেন এই চিকিৎসক।
source: Asia Post







