মতামত

দাদা সিরাজুল আলম খানের পৈতৃক বাড়ি ও কবরস্থান ভাঙ্গন

স্বাধীন বাংলাদেশের রুপকার, নিউক্লিয়াসের প্রতিষ্ঠাতা, মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সংগঠক ও মুজিব বাহিনীর শীর্ষ নেতা আমার মেঝ-চাচা জনাব সিরাজুল আলম খান (দাদা)। আমাদের বাড়ি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের আলীপুর গ্রামের ‘সাহেব বাড়ি’ হিসেবে দীর্ঘকাল ধরে সুপরিচিত। এলাকার মানুষ ‘সাহেবের বাড়ি’ ডাকার সুবাদে সেই বহুকাল আগে থেকেই ‘সাহেব বাড়ি’ নামকরণ হয়েছে আমাদের বাড়িটির। এর কারণ হচ্ছে আমার দাদা, খোরশেদ আলম খান (জনাব সিরাজুল আলম খানের বাবা) তিনি ব্রিটিশ আমলে এই এলাকার একমাত্র ব্যক্তি যিনি ব্রিটিশ স্কলারশিপ (বৃত্তি) নিয়ে ১৯৩৭ সনে যুক্তরাজ্যের স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গ থেকে শিশু মনোবিজ্ঞান (child psycology) এর উপর উচ্চতর শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তিনি একজন সরকারি চাকুরিজীবি ছিলেন এবং সে সময় স্কুল পরিদর্শক (inspector of school) হিসেবে কাজ করতেন এবং পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালে পাবলিক ইন্সট্রাকশনের উপ-পরিচালক (ডিডিপিআই) (the Deputy Director of Public Instruction- DDPI) হিসাবে অবসর গ্রহণ করেন। আমার দাদু সৈয়দা জাকিয়া খাতুন পীর বাড়ির সন্তান এবং তিনিও সেই সময়ে এলাকার একজন শিক্ষিত, মার্জিত ও সম্মানিত নারী হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। তাঁর বাবা ব্রিটিশ শাসনামলে কলকাতার আলিয়া মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক ছিলেন।

১৯৪০ সালে আমার দাদা মানে সিরাজুল আলম খানের পিতা জনাব খোরশেদ আলম খান সদরের কালীতারা হতে এসে এখানে বাড়ি নির্মান করেন। এটি চৌমুহনী চৌরাস্তার মাইজদী সড়কের বেগমগঞ্জ থানার আলীপুর গ্রামে অবস্থিত। এ বাড়িটি জনাব সিরাজুল আলম খানের জন্মের আগে তাঁর বাবা বানিয়েছিলেন এবং বাড়িটির ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য স্বাধীনতা পূর্বকালের এই বাড়িতে সিরাজুল আলম খান, তাঁর ভাইয়েরা অথবা আমাদের এই প্রজন্মের আমরা কেউ একটি ইটও স্থাপন করিনি। সিরাজুল আলম খানের জন্ম এ বাড়িতেই। তিনি সহ তাঁর নয় ভাই-বোনের সকলে বেড়ে উঠে এই ‘সাহেব বাড়ি’তে। শুধু তাই নয় ১৯৬৫ সালে একদিন কর্মস্থলে যাবার পথে মাইজদীর গাবুয়া ব্রিজের কাছে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে বেশ কিছুদিন হাসপাতালে থেকে সিরাজুল আলম খানের পিতা মারা যান। এবং ১৯৬৫ সালে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক থাকা অবস্থায় ছাত্র আন্দোলনের কারণে জেলে থাকার জন্য তিনি তার বাবা কে শেষবারের মত দেখতে পারেননি। শুধু তাই নয়, তাঁর মাতা সৈয়দা জাকিয়া খাতুন ১৯৯৬ সালে যখন মারা যান তখন জনাব সিরাজুল আলম খান দেশে না থাকায় তিনি তার মাতা কেও শেষ বারের মত দেখতে পারেননি। তাই মুখে না বললেও নিজ স্ত্রী-সন্তানহীন সব লোভ লালসা দলীয় পদ ও আর্থিক মোহের উর্ধে থাকা একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক সিরাজুল আলম খানের কাছে ঐ বাড়িটি এবং বাবা-মার কবরের জায়গাটি অন্য রকম অনুভূতির স্থান।

আমাদের ‘সাহেব বাড়ি’ আরেকটি কারণে ঐতিহাসিক বাড়ি। ১৯৭০ এর নির্বাচনের পূর্বাহ্নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান নোয়াখালীতে আসেন এবং ‘সাহেব বাড়ি’র উত্তর পার্শ্ববর্তী মাঠে তিনি জনসভায় বক্তব্য রাখেন। তখন এ বাড়িতে তিনি জনাব সিরাজুল আলম খানের মাতা সৈয়দা জাকিয়া খাতুনকে দেখতে আসেন। তিনি সব সময়ের মত তখনও জনাব সিরাজুল আলম খানের মাতা কে ‘মা’ বলে সম্বোধন করেন। বঙ্গবন্ধুর সাথে তখন সিরাজুল আলম খান সহ আব্দুল মালেক উকিল (পরবর্তীতে স্পিকার), শহীদউদ্দিন ইস্কান্দার (কচি মিয়া), নুরুল হক মিয়া (তৎকালীন শ্রমিক লীগের সভাপতি), মরহুম আব্দুল রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ সহ আরো অনেক ছাত্র নেতা ঐ বাড়িতে গিয়েছিলেন যারা আজ মন্ত্রী পর্যায়ে সরকারে আছেন। শুধু তাই নয়, এই ‘সাহেব বাড়ি’ থেকে সরাসরি মুক্তিযোদ্ধারা বেগমগঞ্জ চৌরাস্তায় অবস্থিত টেকনিকাল হাই স্কুলে ক্যাম্প স্থাপন করা পাক বাহিনীর সাথে সরাসরি গুলি বিনিময়ের মাধ্যমে যুদ্ধ করে ঐ এলাকা থেকে পাক বাহিনীকে কুমিল্লা ফিরে যেতে বাধ্য করে। এবং তারই রেশ ধরে ৮ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে আমাদের এলাকা স্বাধীন হওয়ার দুই/একদিন পর মুজিব বাহীনির নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রামের দায়িত্বে থাকা শেখ ফজলুল হক মনি আসেন জনাব সিরাজুল আলম খানের ‘সাহেব বাড়ি’ তে।

শত ইতিহাসের সাক্ষী ও ভালবাসা স্মৃতি তে জর্জড়িত জনাব সিরাজুল আলম খানের সেই ঐতিহ্যবাহী ‘সাহেব বাড়ি’টি কে নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে চলছে নানা রকমের খেলা। যদিও আমাদের আপত্তি থাকা সত্তেও সরকার তথা সড়ক বিভাগ বলেছে চৌরাস্তা থেকে মাইজদী পর্যন্ত কুমিল্লা-নোয়াখালী চার লেন সম্প্রসারনের জন্য আমাদের ১৭.১ শতাংশ জায়গা অধিগ্রহণ করবে। তবে অত্যন্ত দু:খের বিষয় হলো কোন দিনক্ষন নির্দিষ্ট না করে কোন প্রকাশ নোটিশ না দিয়ে হঠাৎ করে যখন পুরো দেশের সব কিছু বন্ধ এই করোনার লকডাউনের মধ্যে রবিবার ৩মে ২০২০ বুলডোজার দিয়ে জনাব সিরাজুল আলম খানের পৈতৃক ভিটা ‘সাহেব বাড়ি’র সীমানার দেওয়াল, প্রাচীর ও মূল গেইট ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। এতেই কর্তৃপক্ষ ক্ষান্ত হয়নি। জনাব সিরাজুল আলম খানের পারিবারিক কবরস্থান যেখানে তাঁর পিতা-মাতা, বড় ভাই ও ভাবির কবর রয়েছে সেটিও তারা কোথাও স্থানান্তর না করে কিংবা জনাব সিরাজুল আলম খানের পরিবারকে স্থানান্তরের জন্য পূর্ব বার্তা না দিয়ে ভেঙ্গে ফেলা শুরু করে। লকডাউনের মাঝে গাড়ি চলাচল বন্ধ হওয়ায় জনাব সিরাজুল আলম খানের এক ভাই বাড়িতে উপস্থিত থাকায় তিনি পিতা-মাতার পারিবারিক কবরস্থানটি পুরোপুরি ভেঙ্গে ফেলতে বাঁধা দিয়ে নিরুপায় হয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে বার বার বলে বিশেষ অনুরোধ করে পারিবারিক কবরস্থানটি স্থানান্তরের জন্য দুই/একদিন সময় নিয়েছেন। পারিবারিক কবরস্থানটি স্থানান্তরের কাজ চলছে আজ ৭ মে।

জনাব সিরাজুল আলম খানের পিতা-মাতা সহ পারিবারিক কবরস্থানটি রাস্তা থেকে বেশ দূরেই অবস্থিত। কুমিল্লা-নোয়াখালী রাস্তার সম্প্রসারণ কাজের কারণে কিছু জায়গা অধিগ্রহণ করা হলেও আমাদের পারিবারিক কবরস্থানটির তখনো কোন ক্ষতি হয়নি। উপরন্তু, আমরা মেনে নিয়েছিলাম নিজেদের সম্পত্তি ও আর্থিক ক্ষতি হলেও যেহেতু এই রাস্তাটি জনগণের ও বৃহৎ আকারে চিন্তা করলে দেশের উপকারে আসবে তাই আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে অধিগ্রহণের বিষয়ে কোন আপত্তি করা হয়নি। কিন্তু পরবর্তীতে রাস্তার জন্য আরও কিছু জায়গার প্রয়োজন দেখা দিলে জনাব সিরাজুল আলম খানের পৈতৃক ভিটা, জায়গা ও কবরস্থান থেকে আরও ১৭.১ শতাংশ জায়গা পুনঃ অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। বলা বাহুল্য, আমাদের থেকে ১৭.১ শতাংশ (৪০০ফিটের কিছু বেশি) জায়গা নেওয়া হলেও আমাদের কে সঠিক ও ন্যায্য ক্ষতিপুরণ দেওয়া হচ্ছেনা। বরং অল্প আকারে যা দিবে বলেছিল তাও করোনার অযুহাতে এখনো না দিয়ে আমাদের বাড়ি ও পারিবারিক কবরস্থান বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

যদিও বরাবরের মত জনাব সিরাজুল আলম খান দাদা এইবারও নিজ কিংবা তাঁর পরিবারের স্বার্থ চিন্তা করছেন না, তাই এই পুনঃঅধিগ্রহণের বিষয়ে তিনি একদমই চুপ তবে পরিবারের পক্ষ থেকে পারিবারিক এই কবর গুলো বাঁচানোর জন্য আপত্তি ও অনুরোধ করে সরকার বা সড়ক বিভাগের কাছ থেকে কোন সহযোগিতা পাওয়া কিংবা কোন সুরাহা করা যায়নি। যা অত্যন্ত অন্যায় ও বেদনাদায়ক কারণ সরকার বা সড়ক বিভাগ আমাদের পারিবারিক কবরস্থানটি স্থানান্তর করে দেয়নি যা আইন অনুযায়ি তাদের করার কথা। অন্যথায়, আমাদেরকেও পর্যাপ্ত সময় অথবা নোটিশ প্রদান করেনি কাজটি করার জন্য। আমরা পারিবারিক ভাবে তবু বলবো, ক্ষতিপূরনের কোন অর্থ এখন পর্যন্ত পরিশোধ করা না হলেও আমরা তা নিয়ে চিন্তিত নই, বরং আমাদের ১৭.১ শতাংশ জায়গা (৪০০ফিটের বেশি) দিয়ে হলেও দেশ ও জনগণের সেবা করতে পারাটা আমরা গর্বের মনে করি তবে তা অবশ্যই ন্যায় ও সঠিক ভাবে রাস্তার দুই পাশ দিয়ে নেওয়া উচিত ছিল সব অসৎ উদ্দেশ্য, দলীয়করণ, বিশেষ মহলের ইন্ধন ও সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিবর্গের আক্রোশে প্রভাবিত না হয়ে। তাহলে অন্তত স্বাধীন বাংলাদেশের রুপকার, নিউক্লিয়াসের প্রতিষ্ঠাতা, মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সংগঠক, মুজিব বাহিনীর শীর্ষ নেতা, বাংলাদেশের দার্শনিক নেতা জনাব সিরাজুল আলম খান দাদার পিতা-মাতার কবরের প্রতি সম্মান দেখানো যেতো এবং সেগুলো রক্ষা করা যেতো। আমরা জানলে পারিবারিক ভাবে নিজ খরচে হলেও কবরস্থান স্থানান্তরের কাজটি সুন্দর ও সুপরিকল্পিত ভাবে করতে পারতাম।

লেখক : ব্যারিস্টার ফারাহ খান

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *