News

শাহবাজ শরিফের পর সৌদি আরবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট, নতুন কৌশলগত জোটের ইঙ্গিত?

পশ্চিম এশিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং তুরস্কের নতুন কৌশলগত সমীকরণ তৈরির সম্ভাবনা এই মুহূর্তে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বৃহস্পতিবার তিনদিনের সরকারি সফরে সৌদি আরবে গিয়েছেন। একই সময়ে সৌদি আরব সফরে গিয়েছেন প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইপ এরদোয়ান। তিন দেশের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে আগে থেকেই একটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি রয়েছে। সেই চুক্তি অনুযায়ী, এক দেশের ওপর আগ্রাসন হলে অন্য দেশ সহযোগিতা করবে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় এক বছর আলোচনার পর এই প্রতিরক্ষা কাঠামো চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। সেই নিরাপত্তা কাঠামোয় তুরস্ককে অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ত্রিপাক্ষিক এই জোট আঞ্চলিক নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা এবং ইরানের পাল্টা হামলার জেরে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতা জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেও প্রভাবিত করছে। এই প্রেক্ষাপটে নেটো সদস্য তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

এদিকে, তিনটি দেশের শীর্ষনেতাদের বৈঠক এবং তাদের সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা জোট ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের ঘনিষ্ঠতা। এদিকে ইসরায়েল ভারতের দীর্ঘদিনের বন্ধু। অন্যদিকে, পাকিস্তান ইসরায়েলের অস্তিত্ব স্বীকার করে না।

এই পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার রাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। প্রধানমন্ত্রী মোদী জানিয়েছেন, ভারত-ইসরায়েল কৌশলগত অংশীদারিত্বের অগ্রগতির পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়েও তাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।

ফলে একদিকে যখন সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা সমীকরণ ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে, তেমনই ভারত-ইসরায়েলের শীর্ষনেতাদের মধ্যে বার্তালাপও বিশেষভাবে অর্থবহ।

এই সম্ভাব্য ত্রিপাক্ষিক জোটের প্রতিটি পদক্ষেপের উপর দিল্লির নজরও রয়েছে। দিল্লির প্রতিরক্ষা ও বিদেশনীতি বিশেষজ্ঞ কমার আঘা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, “নিজের স্বার্থের জন্যই ভারতকে এদিকে নজর রাখতে হবে কারণ পাকিস্তান, তুরস্ক এবং সৌদি আরবের মধ্যে একটা সমান্তরাল শক্তি অক্ষ তৈরি হচ্ছে।”

তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, এই শক্তি ভারত বা ইসরায়েল কারও স্বার্থের পক্ষে নয়। তাই দুই দেশই চাইবে এই বিষয়টিকে নজরে রাখতে এবং দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ঝালিয়ে নিতে।

পাকিস্তান ও তুরস্কের শীর্ষনেতৃত্বের সৌদি আরব সফর

শাহবাজ শরিফের তিন দিনের সৌদি আরব সফরে তার সঙ্গে রয়েছেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল।

এই প্রসঙ্গে মি. শরিফের কার্যালয়ের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছিল, “আঞ্চলিক পরিস্থিতির স্বল্পমেয়াদী প্রভাবের প্রেক্ষাপটে এই সফরটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতা, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং সমন্বয় ও অংশীদারিত্বকে আরও প্রসারিত করবে।”

অন্যদিকে, বৃহস্পতিবারই স্পষ্ট হয়ে যায় যে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানও সৌদি আরবে পৌঁছাচ্ছেন। তুরস্কের তরফে জানানো হয় সৌদি সফরে এরদোয়ান, মোহাম্মদ বিন সালমান এবং শাহবাজ শরিফেরর সঙ্গে একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে অংশগ্রহণ করবেন। তারপর থেকেই ত্রিপাক্ষিক এক অক্ষের সম্ভাবনা নিয়ে ব্যাপক জল্পনা শুরু হয়ে যায়। আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না করা হলেও রয়টার্স -সহ একাধিক সংবাদ মাধ্যম সৌদি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে যে, এই তিন দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সম্পর্কিত সমঝোতা নিয়ে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

কাতারের লুসাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড. মুহাম্মদ মাজহার শাহিন মনে করেন যে, এই বৈঠকের পর তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি সামরিক জোট গঠনের বিষয়ে ঘোষণা হতে পারে। বেশ কয়েক মাস ধরেই এই নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

‘অনেক কিছু বদলে যেতে পারে’

ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক সময়ে এই সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইয়েমেনের হুথি হামলা থেকে জলসীমা সুরক্ষিত করার লক্ষ্যে তৈরি সৌদি নেতৃত্বাধীন লোহিত সাগর নৌ জোটে পাকিস্তান সদ্য যোগ দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ‘ভঙ্গুর’ যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ প্রণালী আবার খোলার আলোচনা চলছে এবং সংঘাতের আবহে থাকা দেশগুলির মধ্যে অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী হলো পাকিস্তান।

তিন দেশের শীর্ষনেতৃত্বের সাক্ষাতের ঠিক আগেই তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান, মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাতি, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানের মধ্যে জর্ডানে একটি বৈঠক হয়েছিল। মিশর, পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং তুরস্ক নিয়ে গঠিত এই কূটনৈতিক জোট ‘আর-ফোর’ নামে পরিচিত।

মার্চ মাসে রিয়াদে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর চালু হওয়া এই ‘আর-ফোর’ মেকানিজমের লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের প্রভাব সীমিত করা, কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সমন্বয় বৃদ্ধি করা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত ঝুঁকির মোকাবিলা করা।

এদিকে, তুরস্ক ইসরায়েলের উপর ‘চাপ বাড়াতে’ বৃহত্তর আঞ্চলিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞতা। তুরস্কের অভিযোগ, ইসরায়েলের সামরিক কার্যকলাপ ও এই অঞ্চলে সে দেশের ক্রমবর্ধমান প্রভাব অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। বৃহস্পতিবার আঙ্কারায় তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এবং সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি একটি যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফিদান সিরিয়া ও গাজায় ইসরায়েলি সামরিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন।

এই আবহে তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা জোট ইসরায়েলের স্বার্থে যাবে না বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

সৌদি গণমাধ্যমেও এ নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছে।

ড. মুহাম্মদ মাজহার শাহিন এক্স-এ লিখেছেন, “যদি এই জল্পনাগুলি সত্যি হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য একটি নতুন যুগে প্রবেশ করতে পারে এবং অনেক কিছু বদলে যেতে পারে।”

দিল্লির জিন্দাল স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স-এর সহকারী অধ্যাপক ড. গীতাঞ্জলি সিনহা রায়ের কথায়, “সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং তুরস্কের এই প্রতিরক্ষা জোট বাস্তবায়িত হলে তা পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে পারে। নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দিক থেকে তাদের এই পদক্ষেপ ভুল নয় এবং নিজস্ব স্বার্থেই একটি বলিষ্ঠ উদ্যোগ।”

“সৌদি আরবের প্রচুর অর্থসম্পদ রয়েছে এবং তারা কৌশলগত প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করে তুলছে। এবং এ কথাও ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের সুসম্পর্ক ও যোগাযোগ বজায় রয়েছে। এই সমস্ত বিষয়ের কথা মাথায় রেখে এই বৈঠকের দিকে বিশ্বের নজর রয়েছে।”

কেন ভারত ও ইসরায়েলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ

তিন দেশের এই বৈঠক ভারত ও ইসরায়েলের জন্যও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এরই মাঝে বৃহস্পতিবার রাতে নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু। কৌশলগত অংশীদারিত্বে ধারাবাহিক অগ্রগতি এবং দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থে বিভিন্ন খাতে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। তবে অনুমান করা হচ্ছে শাহবাজ শরিফ ও রেচেপ তাইপ এরদোয়ানের সৌদি সফরও এই বার্তালাপের নেপথ্যে ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞ কমার আঘা এর মতে, এক্ষেত্রে একাধিক সমীকরণ কাজ করছে।

তার কথায়, “ভারতের কৌশলগত অবস্থানের দিক থেকে ইসরায়েল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী। ভারত-ইসরায়েল-সংযুক্ত আরব আমিরাত ত্রিপক্ষীয় জোট অর্থনৈতিক, প্রযুক্তি বিনিময়, নিরাপত্তার অংশীদারিত্বের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরব ও ভারতের মধ্যে জ্বালানি, বাণিজ্য এবং প্রতিরক্ষা কেন্দ্রিক একটি শক্তিশালী কৌশলগত অংশীদারিত্ব রয়েছে।”

“একইসঙ্গে পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের নৈকট্যও ভারতের কাছে বড় বিষয়। তুরস্ক প্রকাশ্যে পাকিস্তানকে সমর্থন করে এসেছে। ভারতও তুরস্ক, আজারবাইজান ও পাকিস্তানের মধ্যকার ঘনিষ্ঠ সামরিক ও কূটনৈতিক জোটের কৌশলগত প্রতিক্রিয়া হিসেবে আর্মেনিয়ার সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ককে আরো প্রসারিত করেছে।”

কাজেই একটি নতুন শক্তি অক্ষ তৈরি হলে তা ভারতের উদ্বেগের কারণ হবে বলেই মনে করেন তিনি। তার কথায়, “পাকিস্তান ও তুরস্ক সৌদি আরবের সঙ্গে মিলে একটা সমান্তরাল শক্তি অক্ষ তৈরির চেষ্টা করছে। নিজের স্বার্থের কথা ভেবে ভারতকে এই নতুন অক্ষের দিকে নজর দিতে হবে।”

“পাশাপাশি, তার দীর্ঘদিনের বন্ধু ইসরায়েলের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। তবে এই সম্পর্ক বজায় রাখা ইসরায়েলের দিক থেকেও ততটাই গুরুত্বেপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দিক থেকে ব্যাখ্যা করতে গেলে এই দেশগুলির একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কের বেশিরভাগই ট্রানজ্যাকশানাল (লেনদেন ভিত্তিক)।”

এই প্রসঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের নিজস্ব শক্তির কথা উল্লেখ করেছেন ড. গীতাঞ্জলি সিনহা রায়।

তার কথায়, “তুরস্কের সামরিক প্রযুক্তি অত্যন্ত উন্নত, বিশেষত ড্রোন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে। একই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, উন্নত সামরিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ইসরায়েলও অত্যন্ত শক্তিশালী একটি পক্ষ। অন্যদিকে, পাকিস্তানের রয়েছে উল্লেখযোগ্য পারমাণবিক সক্ষমতা ও শক্তিশালী সামরিক বাহিনী। তবে তুরস্ক বা সৌদি আরবের সরাসরি সেই সক্ষমতা ব্যবহারের সুযোগ নেই।”

“পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে; তবে তারা এখন অন্যান্য শক্তিকেও এর অন্তর্ভুক্ত করার কথা বিবেচনা করছে। তুরস্ক ছাড়াও অন্যান্য শক্তি যদি এতে যোগ দেয় তাহলে আর যদি তা ভারত বা ইসরায়েলের জন্য সুখকর হবে না।”

source: Rajneete

Back to top button