এসআইআর থেকে ভোটার তালিকার নিয়ন্ত্রণ— তোপের মুখে ভারতের নির্বাচন কমিশন

নতুন ভোটার নিবন্ধন, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া, নির্বাচনি তথ্যভাণ্ডারের নিয়ন্ত্রণ, সফটওয়্যারের নিরাপত্তা— নির্বাচন ব্যবস্থার একেবারে কেন্দ্রে থাকা এসব বিষয় নিয়ে এবার তোপের মুখে পড়েছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। এ বিতর্ক এবার শুধু বিরোধী দল বনাম ক্ষমতাসীন বিজেপির রাজনৈতিক অভিযোগে সীমাবদ্ধ নেই, দেশটির তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের দুই নির্বাচন কমিশনারই গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার এমন সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন, যেগুলো তাদের ভাষায় তাদের না জানিয়েই নেওয়া হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এসব বিতর্ক সামনে নিয়ে এসেছে। এরপরই দেশটির নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিরোধী দলগুলো প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছে। বৃহস্পতিবার ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) তাকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পদত্যাগের আলটিমেটামের পাশাপাশি দেশ জুড়ে আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে।
বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশ হিসেবে পরিচিত ভারতের নির্বাচন কমিশন নিয়ে ওঠা এই বিতর্ক কতটা তাৎপর্যপূর্ণ? কেন এবারের ঘটনাকে আগের রাজনৈতিক অভিযোগগুলোর চেয়ে আলাদা করে দেখা হচ্ছে? ভারতের নির্বাচন কমিশনের ভেতরে আসলে কী ঘটছে?
ভারতীয় সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদের অধীনে গঠিত একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশন। সংসদ, রাজ্য বিধানসভা এবং রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তত্ত্বাবধান, নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব এর ওপর।
বর্তমানে কমিশনে রয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং দুই নির্বাচন কমিশনার— সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী। তিনজনই সমমর্যাদার কমিশনার, সিইসি কমিশনের চেয়ারম্যান হলেও এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তার নেই।
২০২৩ সালের আইনে কমিশনের কাজ পরিচালনার নিয়মও নির্ধারণ করা হয়েছে। আইনের ১৮ ধারা অনুযায়ী, কমিশনের কাজ যতটাসম্ভব সর্বসম্মতভাবে হওয়ার কথা। মতভেদ হলে সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। একই সঙ্গে কমিশনের কাজের পদ্ধতি ও দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রেও সর্বসম্মতির কথা বলা হয়েছে।
ভারতের নির্বাচন কমিশন নিয়ে চলমান বিতর্কে বড় প্রশ্নটি এখানেই— কমিশনের দুই সদস্য অভিযোগ তুলেছেন, বিভিন্ন সময়ে তাদের আপত্তি সত্ত্বেও নেওয়া হয়েছে সিদ্ধান্ত। শুধু তাই নয়, কোনো কোনো সিদ্ধান্তের বিষয়ে তারা জানেনই না। প্রশ্ন উঠেছে— নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরে তাহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটি কীভাবে চলছে?
১০ মাসে ১৪টি আপত্তি
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধান বলছে, সান্ধু ও যোশী গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বা নির্দেশের বিরুদ্ধে লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন। একদিনেই চারটি আপত্তিও জানানো হয়েছিল।
ভোটার তালিকায় নতুন নাম যুক্ত করা, নাম বাদ দেওয়া বা পুনর্বহাল করা, ভোটার তালিকা-সংক্রান্ত আপিল, পুরো নির্বাচনি তথ্যভাণ্ডারের নিরাপত্তা এবং এসব তথ্যের ওপর কার নিয়ন্ত্রণ থাকবে— এসব বিষয়ে ছিল আপত্তিগুলো।
একটি আপত্তিতে সান্ধু অভিযোগ করেন, দুই কমিশনারের লিখিত পরামর্শের বিপরীতে কমিশনের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং সেটিকে তিনি ‘অননুমোদিত ও বেআইনি’ বলে উল্লেখ করেন। অন্য এক বিষয়ে সান্ধু ও যোশী দুজনেই কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে চিঠি দেন। তাদের অভিযোগ ছিল, নির্বাচনি তথ্যভাণ্ডারের আইটি অবকাঠামোর ওপর নজরদারির একটি স্তর এমনভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার বিষয়ে তাদের আগে জানানো হয়নি।
এর মধ্যে গত ৯ সেপ্টেম্বর তিন কমিশনার বৈঠকে বসেন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, চার মাসের মধ্যে সেটিই ছিল কমিশনের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বৈঠক।
কেন এসআইআর এত গুরুত্বপূর্ণ
এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে রয়েছে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর), যেটি দেশ জুড়ে ভোটার তালিকা ব্যাপকভাবে পুনর্বিবেচনার একটি প্রক্রিয়া।
নির্বাচন কমিশনের ভাষ্য, এর উদ্দেশ্য ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা এবং মৃত, স্থান পরিবর্তন করা ও একাধিক জায়গায় নিবন্ধিত বা অযোগ্য ব্যক্তিদের নাম বাদ দেওয়া। কমিশনের দাবি, বহু বছর ধরে ব্যাপকভাবে তালিকা পুনর্বিবেচনা না হওয়ায় এই কাজ প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
কিন্তু এসআইআর শুরু থেকেই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের হিসাবে, ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ পড়েছে। লাখ লাখ ভোটার অভিযোগ করেছেন, তাদের নাম তালিকায় নেই এবং নতুন করে ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের প্রক্রিয়ায় এমন নথি চাওয়া হচ্ছে, যা অনেকের কাছে নেই।
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের ভোটারদের বাদ দেওয়া হচ্ছে, যেন কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি ও তার মিত্র দলগুলো রাজ্য নির্বাচনে সুবিধা পায়। সবশেষ পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনেও ব্যাপক বিতর্ক হয়েছে এই এসআইআর নিয়ে। বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
নতুন ভোটার হতে গিয়ে নতুন প্রশ্ন
বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো ভোটার নিবন্ধনের ফরম-৬। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, চলতি বছরের জুলাইয়ে নতুন ভোটারদের জন্য ব্যবহৃত এই ফরমে এমন একটি প্রশ্ন যুক্ত করা হয়, যেখানে আবেদনকারীকে জানাতে বলা হয়— তার নিজের, মা-বাবা অথবা দাদা-দাদির নাম আগের এসআইআরের ভোটার তালিকায় ছিল কি না।
দুই নির্বাচন কমিশনার আগেই এই পরিবর্তন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। যোশী মে মাসে সতর্ক করেছিলেন, বিধি অনুযায়ী পরিবর্তন না করে এভাবে ফরম-৬ বদলানো যায় না। সান্ধুও এতে সম্মতি দিয়েছিলেন। পরে ১৩ আগস্ট সান্ধু পরিবর্তনটিকে ‘অননুমোদিত ও বেআইনি’ বলে দ্রুত সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান।
প্রশ্ন উঠছে, তাহলে দুই কমিশনার আপত্তি জানানোর পরও পরিবর্তনটি কীভাবে কার্যকর হলো?
ভোটার তালিকার নিয়ন্ত্রণ কোথায়?
আরেকটি বড় প্রশ্ন উঠেছে ভোটার তালিকার ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। ভারতের নির্বাচনব্যবস্থায় ভোটার তালিকা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা হলো এর বিকেন্দ্রীকরণ। স্থানীয় পর্যায়ের ইলেকটোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার (ইআরও) ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও সংশোধনের দায়িত্বে থাকেন।
কিন্তু দুই কমিশনার অভিযোগ করেছেন, গত এক বছরে নির্বাচনি তথ্যভাণ্ডার ধীরে ধীরে দিল্লির কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের দিকে যাচ্ছে।
যোশী মে মাসে ‘ভোটার তালিকার তথ্যভাণ্ডারের ধীরে ধীরে কেন্দ্রীকরণ’ নিয়ে সতর্ক করেন। তিনি এমন একটি অডিটের প্রস্তাব দেন, যেন নিশ্চিত হওয়া যায় যে আইন অনুযায়ী যেসব কর্মকর্তার পরিবর্তন করার ক্ষমতা আছে, তাদের বাইরে আর কেউ ভোটার তথ্য পরিবর্তন করতে পারছেন না।
আগস্টে সান্ধুও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। রাজ্য পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, তারা ইরোনেট পোর্টালে যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ প্রবেশাধিকার পাচ্ছেন না। তার অভিযোগ ছিল, নির্বাচন কমিশনের আইটি বিভাগের মহাপরিচালকের এমন প্রবেশাধিকার সীমিত করার আইনি ক্ষমতা নেই।
অর্থাৎ, বিতর্কটি শুধু ‘কে কত ভোটার বাদ দিল’— এমন প্রশ্ন নয়, বরং এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ভোটার তালিকার ওপর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে— সেই প্রশ্নও।
গোয়ায় ৯৭ ভোটারের ঘটনা
এই প্রযুক্তিগত বিতর্কের বাস্তব প্রভাব বোঝাতে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস গোয়ার একটি ঘটনা তুলে ধরেছে। এসআইআরের সময় সফটওয়্যার কিছু ভোটারের তথ্যের মধ্যে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ শনাক্ত করে। পরে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ভোটারদের নথি জমা দিয়ে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ দেওয়া হয়।
গোয়ায় স্থানীয় ইআরওরা শুনানি করে ৯৭ জনকে ভোটার তালিকায় থাকার জন্য যোগ্য বলে সিদ্ধান্ত দেন। কিন্তু তাদের সিদ্ধান্ত সফটওয়্যারে নথিভুক্ত করার ব্যবস্থা তখন কার্যকর ছিল না। রাজ্যের প্রধান নির্বাচন কর্মকর্তার দপ্তর কয়েক দফা চিঠি দিয়ে সেই ব্যবস্থা চালুর অনুরোধ জানায়। সময়মতো তা চালু না হওয়ায় ৯৭ জনের নাম চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় যুক্ত করা যায়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সংখ্যা ছোট হলেও বড় প্রশ্নটি উঠে এসেছে এখানেই— মাঠপর্যায়ে আইনিভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যদি একজন নাগরিককে ভোটার হিসেবে যোগ্য ঘোষণা করেন, তাহলে কেন্দ্রীয় সফটওয়্যার কি সেই সিদ্ধান্ত কার্যত বাতিল করে দিতে পারে?
পশ্চিমবঙ্গে সবচেয়ে বড় সংঘাত
এসআইআর নিয়ে সবচেয়ে তীব্র বিতর্ক হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। নির্বাচন কমিশনের হিসাবে, এসআইআরের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে ২৭ লাখ ১৬ হাজার ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে ২২ লাখ ২১ হাজার বা প্রায় ৮২ শতাংশ নাম পুনর্বহালের জন্য আপিল করেন। সব মিলিয়ে ট্রাইব্যুনালগুলোতে ৩৮ লাখ ৩১ হাজার আপিল জমা পড়ে।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর প্রক্রিয়ার একপর্যায়ে সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ করেন এবং নির্দিষ্ট ভোটারদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বিচারিক কর্মকর্তাদের যুক্ত করা হয়। পরে আপিলের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়।
এতে নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থার প্রশ্নটি আরও জটিল হয়। কারণ ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো কমিশনের মূল দায়িত্বের একটি অংশে আদালত-নির্দেশিত বিচারিক তদারকি যুক্ত হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর প্রক্রিয়াটি নিয়মিত পর্যবেক্ষণও করেছেন।
কমিশনের ভেতরের বিরোধ কতটা নজিরবিহীন?
ভারতের নির্বাচন কমিশনের ভেতরে মতবিরোধ একেবারে নতুন নয়। কিন্তু বর্তমান ঘটনাকে আলাদা করে দেখাচ্ছে মতবিরোধের বিষয় ও তার লিখিত রূপ।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বলছে, অতীতে কমিশনারদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও এবার দুই কমিশনার একই সময়ে ভোটার তালিকা, নতুন ভোটার, নাম বাদ দেওয়া এবং পুরো নির্বাচনি তথ্যভাণ্ডারের নিয়ন্ত্রণের মতো মূল নির্বাচনি প্রক্রিয়া নিয়ে বারবার লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন।
বিবিসির বিশ্লেষণও বলছে, এবারকার বিতর্কের গুরুত্ব এখানেই যে এবার অভিযোগগুলো কেবল বাইরের বা রাজনৈতিক দলগুলোর নয়, বরং কমিশনের ভেতরের দুই সদস্যও একই প্রক্রিয়ার বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তবে কমিশনের তিন সদস্যের মধ্যে দুজন তাদের আপত্তির বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য প্রকাশ্যে দেননি। নির্বাচন কমিশন বলছে, অভ্যন্তরীণ নোট, পর্যবেক্ষণ ও মতামত একটি প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার অংশ।
নির্বাচন কমিশনের জবাব কী?
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন প্রকাশের পর কমিশন বলেছে, বিভিন্ন সদস্যের ‘ভিন্নমত ও পর্যবেক্ষণ’ প্রতিষ্ঠানটির সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাভাবিক অংশ। কমিশনের দাবি, গত এক বছরে নেওয়া সব সিদ্ধান্তই পূর্ণ কমিশনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত।
কমিশন আরও বলেছে, ১০ মাসের কিছু নির্দিষ্ট অভ্যন্তরীণ নোট সামনে এনে বৃহত্তর সিদ্ধান্ত, অনুমোদন ও সংস্কারের বিষয়গুলো বাদ দিলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। তাদের হিসাবে গত এক বছরে প্রায় ৪০টি নতুন উদ্যোগ ও বিভিন্ন নির্বাচনি সংস্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং এসব সিদ্ধান্ত পূর্ণ কমিশনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তেই হয়েছে।
অর্থাৎ কমিশনের অবস্থান হলো— আপত্তি থাকা মানেই সিদ্ধান্তে বিভক্তি নয়। অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবেই হয়েছে।
আইনে কী বলা আছে?
২০২৩ সালের আইনের ১৮ ধারায় বলা হয়েছে, কমিশনের কাজ যতটাসম্ভব সর্বসম্মতভাবে সম্পন্ন হবে। তবে মতভেদ হলে সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তই কার্যকর হবে। একই ধারায় কমিশনের কাজের পদ্ধতি ও দায়িত্ব বণ্টন সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
ফলে দুই কমিশনারের লিখিত আপত্তি নিজে থেকেই কোনো সিদ্ধান্তকে বেআইনি প্রমাণ করে না। বরং মূল প্রশ্ন হচ্ছে— চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছে, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল কি না এবং আইন অনুযায়ী তিন সদস্যের কমিশনের ক্ষমতা ও দায়িত্ব কীভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে।
এ কারণেই ফরম-৬ পরিবর্তন, ভোটার তালিকার কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কিংবা পশ্চিমবঙ্গে আপিল দায়েরের মতো নির্দিষ্ট ঘটনাগুলো এখন রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে।
বিজেপি ও বিরোধীদের অবস্থান
বিরোধী দলগুলো বলছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ তুলেছেন এবং কমিশনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর মন্তব্য করেছেন। তৃণমূল কংগ্রেসের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের গ্রেপ্তার দাবি করেছেন এবং এসআইআরের আগের ভোটার তালিকা ফিরিয়ে আনার কথা বলেছেন।
অন্যদিকে বিজেপি অভিযোগগুলোকে ‘স্মিয়ার ক্যাম্পেইন’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। দলটির মুখপাত্র সম্বিত পাত্র বলেছেন, কমিশনের ভেতরে মতপার্থক্য থাকাটা গণতন্ত্রের প্রাণবন্ততার লক্ষণ এবং বিরোধী দলগুলো নির্বাচনে জিততে না পেরে প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে।
ককরোচ জনতা পার্টির ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম এই রাজনৈতিক চাপকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। দলটি সিইসির পদত্যাগের পাশাপাশি এসআইআর স্থগিত, আগের ভোটার তালিকা পুনর্বহাল ও নির্বাচন কমিশনের কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার স্বাধীন তদন্তের দাবি তুলেছে।
প্রশ্নের মুখে ভোটার তালিকার বিশ্বাসযোগ্যতা
পুরো বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্নই ফিরে ফিরে আসছে— ভোটার তালিকা তৈরির প্রক্রিয়ায় নাগরিকের ভোটাধিকার রক্ষার জন্য যথেষ্ট স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আছে কি না।
এসআইআরের পক্ষে কমিশনের যুক্তি— ভোটার তালিকা থেকে মৃত, স্থানান্তরিত, দ্বৈত বা অযোগ্য নাম বাদ দেওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে সমালোচকদের আশঙ্কা, একই প্রক্রিয়ায় যোগ্য ভোটারের নামও বাদ পড়ে যেতে পারে, বিশেষ করে যাদের কাছে প্রয়োজনীয় নথি নেই বা যাদের তথ্য পুরোনো রেকর্ডের সঙ্গে মেলে না।
পশ্চিমবঙ্গে বাদ পড়া প্রায় ২৭ লাখ ভোটারের মধ্যে ২২ লাখের আপিল করার তথ্য দেখাচ্ছে, বিপুলসংখ্যক মানুষ বাদ পড়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা চাইছেন।
আর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রকাশিত অভ্যন্তরীণ নোটগুলো নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যেখানে কমিশনের দুই সদস্যই ভোটার তালিকার প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ, নতুন ভোটার নিবন্ধন ও নাম বাদ দেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
এখন তাই বিতর্কটি শুধু এসআইআর কত নাম বাদ দিয়েছে তা নিয়ে নয়, বরং প্রশ্ন উঠছে— যে প্রতিষ্ঠানকে ভারতের নির্বাচনের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার শেষ প্রাতিষ্ঠানিক ভরসা হিসেবে দেখা হয়, সেই প্রতিষ্ঠানের ভেতরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ কতটা স্বচ্ছ, কতটা সমষ্টিগত এবং ভোটার তালিকার নিয়ন্ত্রণ কতটা সুরক্ষিত।
এই প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পাওয়া পর্যন্ত জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও বিতর্ক চলতে থাকবে।
সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, বিবিসি, আনন্দবাজার, দ্য হিন্দু, টাইমস অব ইন্ডিয়া
source: Rajneete







