সাক্ষাৎকার

লকডাউনে সমস্যার কোনো সমাধান নেই

চীনের উহানে শুরু হওয়ার পর কভিড-১৯ এর সংক্রমণ এখন বিশ্বব্যাপী। কভিড-১৯ এর জন্য দায়ী সার্স সিওভি২ ভাইরাসকে মোকাবিলার কৌশল হিসেবে আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক লকডাউন ও সামাজিক দূরত্বের নীতি গ্রহণ করেছে বিশ্বের প্রায় সব দেশ। এর ফলে স্থবির জীবনযাত্রা কবে আবার স্বাভাবিক হবে- তা নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র অনিশ্চয়তা।

সারা বিশ্বের সংক্রমণ রোগ বিশেষজ্ঞরা দুটি বিষয়ে মোটামুটি একমত। তা হলো, অঞ্চলভিত্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে হার্ড ইমিউনিটি গড়ে না ওঠা পর্যন্ত ভাইরাসটির বিস্তার স্বাভাবিকভাকে বন্ধ হওয়া অসম্ভব। আর এই হার্ড ইমিউনিটি তৈরির জন্য জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগ অংশকেই কোনো না কোনোভাবে আক্রান্ত হতে হবে। এর বাইরে অন্য প্রক্রিয়াটি হলো- একটি সঠিক মানের টিকা উদ্ভাবন, তবে সেটি পেতে অপেক্ষা করতে হবে আরো অন্তত এক বছর।

টিকা প্রাপ্তির আগে তাহলে কী হবে? এক্ষেত্রে হার্ড ইমিউনিটি অর্জনকেই অনেকে মনে করছেন সুবিধাজনক উপায়। তবে সামাজিক দূরত্বের নীতি এই হার্ড ইমিউনিটি তৈরির প্রক্রিয়াকে দীর্ঘ করবে, অন্যদিকে দীর্ঘ অচলাবস্থা ভঙ্গুর করে তুলবে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে। আবার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর আকস্মিক চাপ কমাতে সামাজিক দূরত্বের নীতিও বেশ কার্যকর। সব মিলিয়ে গভীর টানাপড়েনের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন দেশ। কভিড-১৯ মোকাবিলায় সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার ওপরেই জোর দিচ্ছেন বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞ, তবে ভিন্ন মতও রয়েছে। বিশেষ করে প্রলম্বিত অচলাবস্থায় বিশ্বের অর্থনৈতিক মন্দা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন অনেকেই।  

যুক্তরাষ্ট্রের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ড. নুট উইটকাওস্কি মনে করছেন, ভাইরাসটিকে কৃত্রিমভাবে আটকে রাখার কৌশল অযৌক্তিক ও আত্মঘাতী। এর পরিবর্তে স্বাভাবিক সংক্রমণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখে জনগোষ্ঠীতে দ্রুত হার্ড ইমিউনিটি গড়ে তোলা উচিত।

উইটকাওস্কির দাবি, কভিড-১৯ কে যতটা ভয়ঙ্কর ভাবা হচ্ছে, তার কোনো ভিত্তি নেই। এটি সাধারণ ফ্লুর চেয়ে বড়জোর কিছুটা বেশি জটিলতা তৈরির ক্ষমতা রাখে।

যুক্তরাষ্ট্রের দ্য প্রেস অ্যান্ড পাবলিক প্রজেক্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, স্বাভাবিক সংক্রমণ অব্যাহত থাকলে, একটি জনগোষ্ঠীতে কভিড-১৯ এর প্রকোপ থাকবে মাত্র এক মাস।

উইটকাওস্কি কভিড-১৯ কে বায়ুবাহিত রোগ দাবি করছেন, যদিও বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা এখন পর্যন্ত এটিকে ‘বায়ুবাহিত’ রোগ বলেনি।

উইটকাওস্কির কৌশল নিয়ে আপত্তি রয়েছে বেশিরভাগ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের। যুক্তরাজ্যের মতো দেশ শুরুর দিকে উইটকাওস্কির প্রস্তাবিত ‘হার্ড ইমিউনিটি’র কৌশল নিলেও পরে তারা সামাজিক দূরত্বের নীতি গ্রহণ করে। তবে সুইডেনের মতো কিছু দেশ এখনো হার্ড ইমিউনিটিকেই গুরুত্ব দিচ্ছে।      

উইটকাওস্কির সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয় ৩ এপ্রিল। দ্য প্রেস অ্যান্ড পাবলিক প্রজেক্টের পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জন কিরবি, লিব্বি হ্যান্ডরস ও লি ডেভিস।              

কিছুটা সংক্ষেপিত আকারে সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন সঞ্জয় দে

জন: শুরুতে আপনার নাম ও পরিচয় সম্পর্কে কিছুটা যদি আমাদের বলেন।

উইটকাওস্কি: আমার নাম নুট উইটকাওস্কি। আমি ২০ বছর রকফেলার বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োস্ট্যাটিক্স এপিডেমিওলজি অ্যান্ড রিসার্চ ডিজাইন বিভাগের প্রধান ছিলাম। এর আগে আমি জার্মানির টিউবিনজেনের এবারহার্ড কার্লস ইউনিভার্সিটির অন্যতম বিশ্বসেরা সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ক্লস ডিয়েটসের সঙ্গে ১৫ বছর কাজ করেছি।

জন: কভিড-১৯ কে সর্বোত্তম মোকাবিলার উপায় সম্পর্কে আপনি কিছু সুপারিশ দিয়েছেন। বিষয়টি কি একটু ব্যাখ্যা করবেন?

উইটকাওস্কি: প্রতিটি শ্বাসকষ্টজনিত রোগের মতো এ ক্ষেত্রেও আমাদের বয়স্ক ও দুর্বলদের সুরক্ষা দেয়া উচিত। কারণ, যখন তারা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন তখন তাদের মারা যাওয়ার উচ্চ ঝুঁকি থাকে। সুতরাং এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আমাদের মনে রাখা উচিত। অন্যদিকে, শিশুরা এই রোগ মোকাবিলায় খুব ভালো করে। শৈশবে সমস্ত ধরনের ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার জন্য শিশুরা বিবর্তনীয়ভাবে উপযুক্ত। তাই তাদের স্কুলে যাওয়া এবং একে অপরকে সংক্রমিত করার ব্যবস্থা চালু রাখা উচিত। এটি হার্ড ইমিউনিটি তৈরিতে ভূমিকা রাখবে, যার অর্থ হলো- প্রায় চার সপ্তাহ পরে বয়স্ক ব্যক্তিরা তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করতে পারবেন, কারণ তত দিনে ভাইরাসটি নির্মূল হতে শুরু করবে।

জন: আপনি আপনার লেখায় বলেছেনসঙ্গনিরোধ (লকডাউন) পদ্ধতি ভাইরাসের টিকে থাকার সময়কাল দীর্ঘায়িত করবে। এ বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করুন।

উইটকাওস্কি: সমস্ত শ্বাসকষ্টজনিত রোগের ক্ষেত্রে রোগটি বন্ধ করার একমাত্র উপায় হলো- হার্ড ইমিউনিটি তৈরি করা। প্রায় ৮০% মানুষের ভাইরাসের সংস্পর্শে আসা দরকার এবং তাদের বেশিরভাগ বুঝতেই পারবেন না যে, তারা সংক্রমিত হয়েছেন। তাদের- বিশেষত শিশুদের ক্ষেত্রে খুবই হাল্কা লক্ষণ থাকবে। সুতরাং, ভাইরাসটি ছড়ানোর জন্য স্কুল খোলা রাখা এবং শিশুদের মেলামেশার পরিবেশ নিশ্চিত করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এর পরে বয়স্ক ব্যক্তিদের আলাদা করা উচিত। ভাইরাস নির্মূল হয়ে গেলে প্রায় ৪ সপ্তাহ পরে বয়স্করা তাদের বাচ্চাদের এবং নাতি-নাতনিদের সঙ্গে দেখা করুক।

জন: তাহলে যুক্তরাষ্ট্রযুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে সঙ্গনিরোধ ও বাড়িতে থাকার মতো যেসব নীতি নেয়া হয়েছে সে সম্পর্কে আপনার মতামত কী?

উইটকাওস্কি: আচ্ছা, লোকেরা যা করার চেষ্টা করছে তা হলো- সংক্রমণের বক্ররেখাকে সমতল (ফ্ল্যাটেন দ্য কার্ভ) করা। আমি আসলে জানি না এটা কেন! তবে, আপনি বক্ররেখা সমতল করলে যা হবে সেটি হলো- আপনি বিষয়টিকে আরো দীর্ঘ, বিস্তৃত করবেন এবং আরো বেশি সময় নেবেন। শ্বাসকষ্টজনিত রোগটিকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময় ধরে লোকজনের মধ্যে টিকিয়ে রাখার কোনো ভালো দিক আমি দেখতে পাচ্ছি না।

জন: আপনি সেসব মানুষের উদ্দেশে কী বলবেনযারা বলছেনআমরা এই ভাইরাসের ভয়াবহতা সম্পর্কে জানতাম না এবং সবাইকে আটকে রাখাই ছিল সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি- যেখানে আমাদের কাছে কোনো সঠিক পরিসংখ্যান ছিল না।

উইটকাওস্কি: এর আগে আমাদের আরো দুটি সার্স ভাইরাস বা করোনাভাইরাস মোকাবিলা করতে হয়েছে। এবারেরটিই প্রথম কোনো করোনাভাইরাস নয়- আমরা যার মুখোমুখি হয়েছি এবং এটিও টিকবে না। শ্বাসতন্ত্র সম্পর্কিত সমস্ত রোগের জন্য আমরা একই ধরনের মহামারীর সম্মুখীন হয়েছি। আপনি এটিকে নিজের মতো চলতে দিলে দুই সপ্তাহের মধ্যে সংক্রমণ শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছাবে এবং পরের দুই সপ্তাহে চলে যাবে।

জন: আপনি সে দিন টেলিফোনে আমার প্রযোজককে বলছিলেনমহামারীটি শেষ হয়ে গেছে। এর মানে কী বোঝাতে চাইছেন?

উইটকাওস্কি: চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ায় নতুন আর কোনো সংক্রমণ হয়নি। ইউরোপে ইতোমধ্যে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। ভাইরাসটি যুক্তরাষ্ট্রে পরের দিকে এসেছে, সুতরাং আমরা এখানে কিছুটা প্রবণতা দেখছি, সম্ভবত পরের কয়েক দিনের মধ্যে এখানেও সংক্রমণ বন্ধ হয়ে যাবে। যদি আমরা দেখি যে আক্রান্তের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বাড়ছে না, তার অর্থ হলো নতুন সংক্রমণ ইতোমধ্যে যথেষ্ট পরিমাণে কমছে এবং প্রায় এক সপ্তাহ আগেই সংক্রমণটি শীর্ষ মাত্রা স্পর্শ করেছে।

লিব্বি: আপনি কি চীনা পরিসংখ্যান বিশ্বাস করেনআপনি কি মনে করেন তারা আমাদের মিথ্যা বলেছে?

উইটকাওস্কি: হ্যাঁ, মহামারীটি সেখানে শেষ হয়েছে। কারণ তা না হলে, আমরা মানুষকে আক্রান্ত হতে দেখব। এমনকি চীন হলেও এখনকার দিনে তথ্য চেপে রাখা খুব কঠিন। যদি হাসপাতালে প্রচুর রোগী ভর্তি হয়, তাদের অস্থায়ী হাসপাতালগুলো যদি এখনো পরিপূর্ণ থাকে, আমরা তা শুনতে পারব। এটা গোপন রাখা যাবে না।

জন: গতকাল প্রেস ব্রিফিংয়ের সময়ে ফাউচি (যুক্তরাষ্ট্রে কভিড সংক্রান্ত টাস্ক ফোর্সের সদস্য) এবং প্রেসিডেন্ট (ট্রাম্প) ও অন্যরা বলছিলেনতারা সঙ্গনিরোধের কৌশলটি না নিলে যুক্তরাষ্ট্রে ২০ লাখের বেশি মানুষ মারা যেত। এই সংখ্যা সম্পর্কে আপনি কি মনে করেন?

উইটকাওস্কি: আমি সরকারের বেতনভুক নই, তাই আমি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকেই কথা বলব। সরকার যদি কোনো হস্তক্ষেপ না করত তাহলে এই মহামারীটি অন্য সব শ্বাসতন্ত্রের রোগের মহামারীর মতোই শেষ হয়ে যেত।

জন: তাহলে আপনার অনুমানে কতজন মারা যাবেসংখ্যাটি কি এই পরিমাণ হবে?

উইটকাওস্কি: এখনকার পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তব সংখ্যা হিসাব করা যাক। আমাদের এখানে প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার আক্রান্ত হচ্ছে, সম্ভবত এটিই উচ্চতর সীমা। ধরা যাক সংখ্যাটি ৩০ হাজার- কে জানে? তবে ২৫ হাজার সম্পর্কে কথা বলা যাক। তাদের মধ্যে ২% এর প্রকৃতপক্ষে গুরুতর লক্ষণ থাকবে- যা দিনে ৫০০ জন হবে। হতে পারে এই সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ বা পঞ্চমাংশ বা ধরা যাক অর্ধেক মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। তার মানে প্রতিদিন ২৫০ জন রোগী। যদি তারা প্রায় ১০ দিনের জন্য হাসপাতালে ভর্তি হন, তাহলে আমাদের হাসপাতাল ব্যবস্থাকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রতিদিন আড়াই হাজার রোগী নিয়ে কাজ করতে হবে। এটি ৩ বা ৪ সপ্তাহ পর্যন্ত ঘটতে পারে এবং তারপরে সংখ্যাটি আবার নাটকীয়ভাবে কমে যাবে এবং পুরো মহামারী শেষ হবে।

জন: তাহলে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে আপনার অনুমান অনুসারেকতজন মারা যাবেন?

উইটকাওস্কি: ২% মারা যাবেন।

জন: হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে?

উইটকাওস্কি: সমস্ত ক্ষেত্র মিলিয়ে।

জন: সমস্ত লক্ষণ সংক্রান্ত ক্ষেত্রে?

উইটকাওস্কি: সমস্ত লক্ষণ সংক্রান্ত ক্ষেত্রে। লক্ষণ সংক্রান্ত সমস্ত ক্ষেত্র মিলিয়ে ২% মারা যাবে। এটি এক দিনে ২৫ হাজারের ২%। সুতরাং প্রতিদিন ৫০০ জন এবং ৪ সপ্তাহ ধরে এটি ঘটতে পারে। সুতরাং, মৃতের সংখ্যাটি সর্বোচ্চ ১০ হাজার হতে পারে। এখনকার ফ্লু মৌসুমে সাধারণ মৃতের সংখ্যার সঙ্গে তুলনা করলে এই সংখ্যাটি সাধারণ এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর ফ্লু মৌসুমে ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ মারা যান। সুতরাং, এটি ফ্লু মৌসুমে স্বাভাবিক পরিস্থিতির অংশ হয়ে যাবে।

লিব্বি: তারা (কর্তৃপক্ষ) কি এ বছর ফ্লুর মৃত্যুর খবর দিচ্ছেনাকি সব কিছুকেই করোনা বলা হচ্ছেফ্লুতে মৃত্যুর কোনো পরিসংখ্যান আছে কি?

উইটকাওস্কি: হ্যাঁ, ফ্লুর জন্য একটি পরিসংখ্যান রয়েছে। এটি বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার। সুতরাং করোনার মৃত্যুর সঙ্গে মেলালে এটি একটি নিয়মিত ফ্লুর মৌসুম।

জন: আপনি কি সবশেষ প্রাপ্ত সংখ্যার ভিত্তিতে নিজের অনুমানটি প্রকাশ করছেন?

উইটকাওস্কি: হ্যাঁ।

লিব্বি: তাহলে আগের ফ্লু মৌসুমের তুলনায় হাসপাতালগুলোতে হঠাৎ কেন রোগী ছাপিয়ে যাচ্ছে এবং বিশ্বনেতা ও সংবাদমাধ্যম কেন অস্থির হয়ে পড়ছে?

উইটকিউস্কি: সবাই জানেন হাসপাতালগুলোর জন্য অনুদান সাম্প্রতিক সময়ে বাড়েনি। সুতরাং হাসপাতালগুলোকে ব্যয় সঙ্কোচন করতে হয়েছে। অতএব, এখন তাদের জরুরি পরিকল্পনায় চলতে হবে, যদিও এটি ভয়াবহ কিছু নয়। কয়েক দশক ধরেই তারা এই পরিকল্পনা করছিল, তাই এখন যদি তাদের সেন্ট্রাল পার্কে কিছু তাঁবু খাটাতেও হয়- সেটা বিশ্বের নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার মতো কিছু নয়। তাঁবুগুলো সেখানে আছে, সেগুলো ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং কয়েক সপ্তাহের জন্য সেগুলো থাকবে- তিন, চার সপ্তাহ সম্ভবত এবং তারপরে সংকট শেষ হয়ে যাবে। এটি এমন কোনো পরিস্থিতি নয়, যা সম্পর্কে আগে কেউ কখনো ভাবেনি।

জন: আপনি কি সত্যিই মনে করেনমাস্ক এবং এ ধরনের সরঞ্জামের একটি বড় ঘাটতি রয়েছে?

উইটকাউস্কি: কীসের?

জন: মাস্ক এবং পিপিই- এসবেরআপনি এ সম্পর্কে কী মনে করেনকেন এসব জিনিসের সংকট থাকতে পারে?

উইটকাওস্কি: কারণ লোকজন এখন পাগল হয়ে যাচ্ছে এবং এটি প্রায় টয়লেট পেপারের মতো…।

জন: দুই সপ্তাহ আগে নিউ ইয়র্কেএনওয়াইইউতে হঠাৎ সমস্ত মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার উধাও হয়ে গেল। সেখানে কী ঘটেছে বলে আপনি মনে করেন?

উইটকাওস্কি: টয়লেট পেপারের মতো। বর্তমান ও অতীত সব সময়েই এ ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে।

জন: হ্যাঁসেটি ঠিক আছে।

উইটকাওস্কি: এটি শুধু যে নিউইয়র্কের হাসপাতাল ব্যবস্থাপনাকে প্রতিফলিত করেছে, তেমনটিও না।

জন: তা ঠিক। তাদের সবশেষ যে হিসাব- সে সম্পর্কে আপনি কী মনে করছেনযেখানে তারা দাবি করছেন- সামাজিক দূরত্বের মাধ্যমে তারা আমাদের ২০ লাখ মৃতের সংখ্যা থেকে বাঁচিয়েছেনতবে এরপরেও আমরা ২ লাখ পর্যন্ত মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছি। তারা এটিও বলছেনএটি কম সংখ্যাটিও নিশ্চিত হতে পারে খুব ভালোভাবে সামাজিক দূরত্ব কার্যকর করার মাধ্যমে। মৃত্যুর এই নতুন অনুমান সম্পর্কে আপনি কী মনে করছেন?

উইটকাওস্কি: সামাজিক দূরত্ব অবশ্যই ভালো। এটি আসমান ভেঙে পড়তে পড়তে বাধা দেয়।

জন: আপনি কি কৌতুক করছেন?

উইটকাওস্কি: অবশ্যই! এই সংখ্যাগুলো কোত্থেকে আসছে আমি জানি না- এগুলো সম্পূর্ণ অবাস্তব। এই ফ্লু অন্য আর সব ফ্লু থেকে মৌলিকভাবে আলাদা- এমন কোনো ইঙ্গিত নেই। আমরা জানি চীনে কী ঘটেছিল, আমরা জানি দক্ষিণ কোরিয়ায় কী ঘটেছিল, আমরা জানি ইউরোপে কী ঘটেছে বা কী ঘটছে। এটা আর সব নিয়মিত ফ্লু থেকে আলাদা- তেমন কোনো ইঙ্গিত নেই। এটি অন্যান্য ফ্লুর চেয়ে হয়ত কিছুটা খারাপ হতে পারে- তাই তো?

জন: আমরা এখন বাড়ির ভেতরে বেশি সময় কাটাচ্ছি। আমাদের বাড়ির ভিতরে থাকতে বলা হয়েছে। এটি কি ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করবে না?

উইটকাওস্কি: হ্যাঁ, এতে ভাইরাস বহাল তবিয়তে থাকবে।

জন: চীন শেষ পর্যন্ত কি তাহলে এ কারণেই কঠোর লকডাউন থেকে বেরিয়ে এসেছিলআপনি কী বলবেন?

উইটকাওস্কি: তাদের একটি সুবিধা ছিল। শুরুতে তারা জানত না তারা কী নিয়ে কাজ করছে। সুতরাং, নিয়ন্ত্রণ বা সামাজিক দূরত্ব শুরু করতে তাদের দীর্ঘ সময় লেগেছে। এটি মহামারী ছড়ানোর পক্ষে ভালো হয়েছে, কারণ সামাজিক দূরত্ব শুরু হওয়ার আগেই ভাইরাসের বিরুদ্ধে হার্ড ইমিউনিটি তৈরির পর্যাপ্ত সময় পাওয়া গেছে।

জন: আপনি বেশ দারুণ বলেছেন। আপনি জানেন ইম্পেরিয়াল কলেজের নেইল ফার্গুসন যুক্তরাজ্যে সম্ভাব্য মৃতের সংখ্যা ৫ লাখ থেকে কমিয়ে এখন ২০ হাজার বা তার চেয়ে কম হবে বলছেন। এর কারণ হিসেবে তিনি সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। এখন আমরা এটাও জানিযুক্তরাজ্যে যেভাবে সামাজিক দূরত্বের বিষয়টি কার্যকর করা হয়েছিল তা খুব কঠোর বা যথাযথ ছিল নাতাই লকডাউনের একদিন পরেই তিনি ঘোষণা করেছিলেনবাস্তবে মৃতের সংখ্যা ২০ হাজার বা তারও কম হবে। সামাজিক দূরত্বের কারণে সংখ্যাটি এভাবে পরিবর্তিত হতে পারে- এমন কোনো সম্ভাবনা আছে কি?

উইটকাওস্কি: না, আসলে আমাদের কাছে এ বিষয়ে উপাত্ত রয়েছে।

সামাজিক দূরত্ব চীন এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় মহামারী নিয়ন্ত্রণে সফলভাবে সাহায্য করেছে- এমন দাবির দিকে আমি নজর দিয়েছি। লোকজন আসলে যখন সামাজিক দূরত্ব শুরু করেছিল- সেই তারিখগুলো আমি দেখেছি। চীনে মহামারীটি ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চূড়ান্ত মাত্রায় ছিল। কিন্তু ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্কুল বন্ধ ছিল না। স্কুল বন্ধ হয় ২ সপ্তাহ পরে। দক্ষিণ কোরিয়াতেও একই বিষয় ঘটেছে। দায়েগুতে বা যে শহরটির নাম বেশি উচ্চারিত হচ্ছে সেখানকার চার্চ অব শিনচিয়াওজিতে এই প্রাদুর্ভাব হয়েছিল। সামাজিক দূরত্বের নির্দেশনা দেয়া হয় ২৩ ফেব্রুয়ারিতে। তবে ইতোমধ্যে শহরটিতে সংক্রমণ চূড়ান্ত মাত্রায় পৌঁছে গিয়েছিল। ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জাতীয়ভাবে সামাজিক দূরত্বের পরামর্শ দেয়া হয়নি, ততক্ষণে জাতীয়ভাবে সংক্রমণের মাত্রা শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছিল। সুতরাং চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া উভয় ক্ষেত্রেই সংক্রমণের সংখ্যা কমে আসার অনেক পরে সামাজিক দূরত্ব শুরু হয়েছিল এবং সে কারণে মহামারীর ক্ষেত্রে এটি খুব কম প্রভাব ফেলেছে। এর অর্থ হলো- তারা ইতোমধ্যে হার্ড ইমিউনিটিতে পৌঁছেছিল বা পৌঁছানোর খুব কাছাকাছি পর্যায়ে ছিল। তবে সামাজিক দূরত্ব কার্যকর করার মাধ্যমে তারা প্রকৃতপক্ষে চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি। এ কারণেই আমরা দক্ষিণ কোরিয়ায় শীর্ষ মাত্রায় পৌঁছানোর কয়েক সপ্তাহ পরেও নতুন নতুন আক্রান্ত দেখতে পাচ্ছি।

জন: আপনি বলেছেন- এটি ছোঁয়াচ সংক্রান্ত সমস্যাকারণ এটি বায়ুবাহিত। যে কারণে আপনি রোগী শনাক্ত বা সামাজিক দূরত্বের মাধ্যমে রোগটির মোকাবিলা করতে পারবেন না। বিষয়টি ব্যাখ্যা করুন।

উইটকাওস্কি: বায়ুবাহিত একটি রোগে আক্রান্তকে শনাক্ত করা যৌনরোগ সংক্রমিতকে শনাক্ত করার চেয়েও কঠিন। বিষয়টি আমরা এইডস থেকেই জানি। বেশিরভাগ লোক জানেন, তারা গত দুই সপ্তাহে কার সঙ্গে মিশেছেন, কার সঙ্গে যৌন সংসর্গে গেছেন। কিন্তু একজন মানুষ যিনি নিউইয়র্কের পাতাল রেল ভ্রমণ করছেন এবং নিউইয়র্কে অন্যান্য কাজ করছেন, আমি আপনাকে বলতে পারব না যে, গত দুই সপ্তাহে আমি কোনো দুই, তিন বা চার হাজার লোকের সংস্পর্শে গিয়েছি। সুতরাং শ্বাসতন্ত্রের রোগের ক্ষেত্রে বিপরীত দিকের মানুষের সংস্পর্শ চিহ্নিত করা অসম্ভব।

জন: বায়ুবাহিত রোগের ক্ষেত্রে সঙ্গনিরোধ কেন কাজ করে না?

উইটকাওস্কি: আপনি পরিবারের মধ্যে, প্রতিবেশীর মধ্যে শ্বাসতন্ত্রের রোগ ছড়ানো বন্ধ করতে পারবেন না। যারা জোগান দিচ্ছেন, যারা চিকিৎসা দিচ্ছেন- কারো মধ্যে না। মানুষ সামাজিক জীব, তাই এমনকি সামাজিক দূরত্বের সময়েও তাদের মধ্যে যোগাযোগ রয়েছে এবং এই যোগাযোগের যে কোনোটি থেকে এই রোগ ছড়াতে পারে। এটি ধীরে ধীরে ছড়াবে এবং এর মাধ্যমে হার্ড ইমিউনিটি গড়ে উঠবে না, কিন্তু ছড়াবে। এটি অনন্তকাল চলবে, যতক্ষণ আমরা এটিকে চলতে দেব।

জন: আপনার কি মনে হয় না এর জন্য একটি টিকা লাগবে?

উইটকাওস্কি: সাধারণ সর্দি ঠেকানোর জন্য আমাদের কোনো টিকা নেই। ফ্লুর বিরুদ্ধে আমাদের কিছু টিকা রয়েছে, তবে সেগুলো কার্যকর নয়। সার্সের বিরুদ্ধে একটি টিকা থাকলে কি আপনি ভালো বোধ করবেন? হ্যাঁ সেটি হলে ভালো। এটি হার্ড ইমিউনিটি তৈরির ক্ষমতা কিছুটা গতি আনতে সহায়তা করবে, কারণ যাদের টিকা রয়েছে তারা ইতোমধ্যে প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন, আর যাদের সেটি নেই তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সংস্পর্শে যাওয়া প্রয়োজন।

জন: আপনি কি প্রাকৃতিকভাবে এই প্রতিরোধ ক্ষমতা পেতে পারেন?

উইটকাওস্কি: কিছু কারণ- যেটি এখনো আমরা পুরোপুরি বুঝতে পারিনি- তার ফলে সব ধরনের শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগের পরেও মানবজাতি টিকে আছে। প্রকৃতি আমাদের বেঁচে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করার একটি উপায় রেখেছে।

লিব্বি: আজ সকালে সমস্ত টেলিভিশনে সমস্ত চিকিৎসকেরা বলেছেনএটি যে কোনো মৌসুমী ফ্লু বা এইচওয়ানএনওয়ানের চেয়ে বেশি সংক্রামক এবং এ জন্য আমাদের এটিকে এত গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের কথা কি হাস্যকর?

উইটকাওস্কি: আমি জানি না এসব মতামত কোত্থেকে এসেছে। রোগটির ভয়াবহতার বিষয়ে আমরা যা বলছি- তার সমর্থনে কোনো তথ্য নেই।

জন: তাহলে আমাদের কাছে কী তথ্য আছে এবং আপনি সেগুলো কোথায় পাচ্ছেন?

উইটকাওস্কি: আপনি প্রতিদিন ইউরোপীয় সিডিসি থেকে সারা বিশ্বের তথ্য ডাউনলোড করতে পারেন এবং সেগুলো বিশ্লেষণ করতে পারেন। আমি এটাই করেছি এবং সম্ভবত অন্যরাও করেছে।

জন: ২০০৯ সালে সোয়াইন ফ্লুর তুলনায় এখনকার প্রতিক্রিয়ার মাত্রায় পার্থক্যের কারণ কী বলে মনে করছেনকেন আমরা হঠাৎ এত বেশি আতঙ্কিত হয়ে বিশ্বকে অচল করে দিচ্ছিআপনার কী মনে হচ্ছে?

উইটকাওস্কি: আমি মনে করি এক্ষেত্রে অন্তত একটি ফ্যাক্টর হচ্ছে- ইন্টারনেট। লোকজন এখন প্রায় সব সময় ইন্টারনেট ব্যবহার করে। আর তাই সংবাদ ভুল বা মিথ্যা যাই হোক- কয়েক মিনিটের মধ্যে না হলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ধরা যাক, ৫০ বছর আগে আমরা খবরের কাগজে পড়তাম যে, প্রায় এক সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্র বা চীন বা অন্য কোথাও ফ্লু মহামারী দেখা দিয়েছে। অথচ এই খবরটি পড়ার আগেই হয়ত সেটি শেষ হয়ে গিয়েছে। সুতরাং লোকজন বলত- ‘ঠিক আছে, এমনটা ঘটেই থাকে।’ আর এখন আমরা যা পড়ি তা হলো- ‘ওহ! ভ্যাটিকানে দু’দিনে ৭৮৫টি ঘটনা ঘটেছে।’ হয়ত ঘটনাগুলো ঘটেনি, এমনকি রিপোর্টিংয়ে হয়ত ত্রুটিও ছিল, কিন্তু এটি বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে এবং বিশৃঙ্খলার ভূমিকা রাখছে। যেসব নিয়ে লোকজনের ভয় পাওয়ার কথা নয়, তা নিয়েও তারা ভয় পাচ্ছে।

জন: আমাদের এখন দ্বিতীয় ধাক্কা সম্পর্কে বলা হচ্ছেযেটি শরৎকালে আসবে। দ্বিতীয় ধাক্কা সম্পর্কে আপনার চিন্তাভাবনা আমাদের বলুন। আপনি যেমনটি বলছেন তা থেকে মনে হচ্ছেসামাজিক দূরত্বের কারণেই আমাদের একটি দ্বিতীয় ধাক্কার মুখে পড়তে হবে-

উইটকাওস্কি: হ্যাঁ।

জন: আপনি কি বিষয়টি একটি বাক্যে বলতে পারেন?

উইটকাওস্কি: এখন আমাদের হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়ে থাকলে শরতে আর দ্বিতীয় ধাক্কা আসবে না। হার্ড ইমিউনিটি কয়েক বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এ কারণেই আমরা ২০০৩ সালে সবশেষ সার্স মহামারীটি পেয়েছি। এটি পরবর্তী ১৫ বছর ধরে একই ধরনের ভাইরাসের মাধ্যমে নতুন মহামারী ঠেকাতে কার্যকর ছিল। সাধারণত এখানে এমন কিছু জিনিস রয়েছে যার জন্য ক্রস-ইমিউনিটি প্রয়োজন। যদি আপনি কোনো সার্স ভাইরাসের সংস্পর্শে আসেন তাহলে পরে অন্য আরেকটি সার্স ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। সুতরাং, আমাদের হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়ে থাকলে সামনে আর দ্বিতীয় ধাক্কা থাকত না। তবে আমরা হার্ড ইমিউনিটি তৈরিতে বাধা দিচ্ছি বলে এটি প্রায় নিশ্চিত যে, সামাজিক দূরত্ব তুলে নেয়া বা শীত আসার সঙ্গে সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন বা এ ধরনের কিছু ঘটা মাত্রই আমাদের দ্বিতীয় ধাক্কায় পড়তে হবে।

জন: তবে এটি বায়ুবাহিত রোগ হওয়ার কারণে আমার মনে হচ্ছে সামাজিক দূরত্বও এর বিস্তারে বাধা তৈরি করতে পারে নাতাই কিমানে এটি ইতোমধ্যে ছড়িয়েছে কারণএটি বায়ুবাহিতকারণ ভাইরাসটি পৃষ্ঠতলে টিকে থাকে। যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্র অচল হওয়ার আগেই সম্ভবত এটি চারপাশে ছড়িয়ে গেছেতাই না?

উইটকাওস্কি: দুর্ভাগ্যক্রমে মনে হচ্ছে, চীনের ঘটনা পশ্চিমা দেশগুলোতে আগেই জানাজানি হওয়ার কারণে লোকজন সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করেছিল। অসম্পূর্ণ মহামারীটি হার্ড ইমিউনিটির প্রয়োজনীয় স্তরে পৌঁছানোর আগেই এটি ঘটতে শুরু করেছিল।

আমরা ইতোমধ্যে জানি, সামাজিক দূরত্বের জন্য মার্কিন করদাতাদের ২ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি সমস্ত কিছুর ব্যয়- আমাদের সামাজিক জীবনের জন্য মারাত্মক পরিণতিও বয়ে আনছে। সেই সঙ্গে অবশ্যই হতাশা- যা নিয়ে আমাদের গবেষণা করতে হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে বলতে পারি, এই মুহূর্তে নিউইয়র্ক সিটি দিয়ে হেঁটে যাওয়া হতাশাজনক।

জন: বিস্তৃত পরিসরে পরীক্ষার একটি বন্দোবস্ত কি থাকা উচিতযাতে করে পুরো জনগোষ্ঠীকে পরীক্ষা করা যায় এবং এটি কি আমাদের ঘরের বাইরে বের হওয়ার পূর্বশর্ত হওয়া উচিত?

উইটকাওস্কি: দুটি বর্ণে এর উত্তর হলো- না।

জন: পরীক্ষা কেন ফলদায়ক নয় বলে মনে করছেন?

উইটকাওস্কি: পরীক্ষা নিজে থেকে কিছুই থামায় না। পরীক্ষা আমাদের কাজে লাগতে পারে- যদি আমরা ভাইরাসের পরীক্ষা না করে অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করি। অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করলে বাস্তবে আমরা হার্ড ইমিউনিটির কতটা কাছাকাছি তার একটি অনুমান পেতে পারি। এটি কাজে লাগতে পারে। আর সংক্রামিত মানুষকে শনাক্ত করার মানে হলো তারা সম্ভবত দু’তিন দিন আগে থেকেই সংক্রমিত বা সংক্রমণের অর্ধেক সময় পার করে ফেলেছেন। এখন সংক্রমিত হিসেবে চিহ্নিত হলে তারা কী করবেন? তারা তো ইতোমধ্যেই সামাজিক দূরত্বের মধ্যে আছেন। ইতোমধ্যে তারা যা করছেন তার চেয়ে বেশি কিছু করতে পারবেন না। ফলে শ্বাসতন্ত্রের রোগের ক্ষেত্রে পরীক্ষা করা প্রয়োজনীয় বা কার্যকর নয়।

জন: এর আগে বলেছিলেন আপনার হাঁপানি রয়েছে। আমি অনুমান করছি আপনার বয়স ৪০ এর বেশি?

উইটকাওস্কি: হ্যাঁ।

জন: বিষয়টি নিয়ে কি আপনি উদ্বিগ্ন?

উইটকাওস্কি: না।

জন: আপনি ভয় পাচ্ছেন না কেন?

উইটকাওস্কি: আমরা ভাইরাসে মারা যাব না। আমরা নিউমোনিয়ায় মারা যাই। ভাইরাসের কারণে আমাদের শ্বাসতন্ত্রের রোগ হলে- দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থা অ্যান্টিবডি তৈরি করে। সেই অ্যান্টিবডি বা প্রতিরোধ ব্যবস্থা সমস্ত সংক্রামিত কোষকে মেরে ফেলে, যা মিউকাসের অনেকাংশকেই ধ্বংস করে দেয়। আর ব্যাকটেরিয়া সহজেই সেই ধ্বংস হওয়া মিউকাসে জেঁকে বসতে পারে এবং তারপর নিউমোনিয়া হতে পারে। যদি চিকিৎসা না হয় তবে এই নিউমোনিয়াই মানুষকে মেরে ফেলতে পারে। তিন সপ্তাহ আগে আমাকে একটি ভাইরাস আক্রমণ করেছিল, সেটি যে ভাইরাসই হোক- যদি ভালো হয়ে ওঠার পর রোগটি আবার খারাপের দিকে যায় তাহলে চিকিৎসকের দেয়া অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হবে। কারণ, এটি নিউমোনিয়ার লক্ষণ এবং আমাদের নিউমোনিয়ার চিকিৎসা নিতে হবে।

জন: এবং নিউমোনিয়ার চিকিৎসা অ্যান্টিবায়োটিকের মাধ্যমে করা হয়-

উইটকাওস্কি: নিউমোনিয়ার চিকিৎসা অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে করা হয়। ভাইরাসের নয়।

জন: ঠিক আছে। তাহলে আপনি মনে করছেন- আপনার ইতোমধ্যে কভিড-১৯ হয়ে থাকতে পারে?

উইটকাওস্কি: হুম। এই অভিজ্ঞতা শেষ পর্যন্ত আমাকে কামুর প্লেগের কথা মনে করিয়ে দেয়। আপনি যদি সেটি পড়েন তবে দুর্ভাগ্যক্রমে প্রচুর সমান্তরাল ঘটনা দেখতে পাবেন। আর সেজন্যই- না, আমি ভয় পাই না। অন্য মানুষের মতো আমারও এটি হতে পারে, যাদের আমার মতো হালকা জ্বর ছিল বা কোনো লক্ষণই ছিল না। শেষ পর্যন্ত ৭০% বা এমনকি ৭৫% মানুষের ক্ষেত্রে এটি খুব স্বাভাবিক এবং বাকি যারা অসুস্থ হয়ে পড়েন তাদের চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। তাদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিকিৎসা নেয়া উচিত- এক্ষেত্রে অপেক্ষা করা উচিত নয়।

জন: আপনি বলছেন ৭৫% ক্ষেত্রে কোনো উপসর্গ পাওয়া যাবে নাসম্ভবত ৮০%ঠিক আছেনাকি আরো বেশিআমি বলতে চাই- সঠিক হারটি কি এই মুহূর্তে আমরা জানি?

উইটকাওস্কি: হারটি কত- এখনো আমরা জানি না। তার জন্য আমাদের ব্যাপকভিত্তিক অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করা দরকার। যাই হোক, আমরা ইতোমধ্যে মহামারীটির নিম্নমুখিতা দেখতে পাচ্ছি। এটি একটি লক্ষণ যে, জনগোষ্ঠীর উল্লখযোগ্য একটি অংশের প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। যদিও এটি সম্ভবত হার্ড ইমিউনিটির জন্য যথেষ্ট নয়। আমরা এখনো প্রয়োজনীয় ৮০%-এ নাও পৌঁছাতে পারি। তবে আমাদের ৫০% অর্জন হয়ে থাকতে পারে।

জন: তাহলে এ মুহূর্তে আমাদের কী করা উচিতআপনি আগে যে পরামর্শ দিয়েছিলেন সেদিকে কী নজর দেয়া উচিতনাকি তার জন্য খুব দেরি হয়ে গেছে?

উইটকাওস্কি: এটি বলা মুশকিল। হয়ত অনেক দেরি হয়ে গেছে, আবার বেশি দেরি নাও হতে পারে। সমস্যাটি হলো, আমরা যদি স্কুল শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের মতো কম ঝুঁকিপূর্ণ লোকজনের মধ্যে কৃত্রিমভাবে সংক্রমণের মাত্রা কম রাখি, তাহলে আমরা এখনো হার্ড ইমিউনিটিতে সম্ভবত পৌঁছাতে পারিনি। তাই এখন থেমে গেলে নতুন করে সংক্রমণের সংখ্যা বাড়তে পারে। নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির এটি হলো খারাপ দিক। আমাদের বিশ্বাস করা উচিত নয় যে, আমরা যখন অভিযোজিত হচ্ছিলাম তখন বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপ নিয়ে প্রকৃতির চেয়ে এগিয়ে থাকব। প্রকৃতিই এটি নিশ্চিত করছিল- কী করে আমরা রোগটির সঙ্গে মানিয়ে নেব, কার্যত যেটি প্রতি বছরই আমরা দেখতে পাই।

লি: তবে কি এটি মহামারীএটাই বড় প্রশ্ন।

উইটকাওস্কি: এটি প্রতি বছরে আসা ফ্লুর মতোই একটি মহামারী।

লি: মহামারী?

জন: আপনি কি এ সম্পর্কে আরো কিছু বলতে চান- যা আপনাকে সবচেয়ে বেশি উত্তেজিত করে চলেছেঅথবা আপনি মানুষকে কী জানাতে চান?

উইটকাওস্কি: আমি মনে করি যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশের মানুষ যতটা মেনে নেয়ার কথা তার চেয়ে বেশি মেনে নিচ্ছে। জনগণকে তাদের রাজনীতিবিদদের সঙ্গে কথা বলা উচিত, তাদের প্রশ্ন করা উচিত, তাদের ব্যাখ্যা করতে বলুন। কারণ, লোকজন তাদের অধিকারের পক্ষে না দাঁড়ালে নিজেদের অধিকারগুলো ভুলে যাবে। আমি নুট উইটকাওস্কি। আমি রকফেলার ইউনিভার্সিটিতে ছিলাম, আমি ৩৫ বছর সংক্রমণবিদ্যা নিয়ে কাজ করছি এবং আমি ৩৫ বছর ধরে মহামারীর মডেলিং করছি। বোঝার ক্ষেত্রে মানুষকে সাহায্য করার বিষয়টি আনন্দের, তবে তাদের শোনানোর কাজটি রীতিমতো একটি যুদ্ধ।

সঞ্জয় দে: হেড অব ডিজিটাল মিডিয়া, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *