সবচেয়ে শক্তিশালী সমরাস্ত্র নিয়েও ইরান যুদ্ধের ফাঁদে আটকা ট্রাম্প

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সব সময়ই নিজের অপ্রত্যাশিত, হঠাৎ ও কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে গর্ব করেন। তিনি এই ক্ষমতাকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে তুলে ধরেছেন। তার হঠাৎ ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার মানসিকতা শত্রু ও মিত্র উভয় পক্ষকেই হতচকিত করে রাখে। কিন্তু ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত এখন তার প্রশাসনের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত সংকটে পরিণত হয়েছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পরিস্থিতি বদলে গেছে। এখন মনে হচ্ছে, তিনি এমন একটি যুদ্ধে আটকে গেছেন, যেখান থেকে বের হওয়ার পথ তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না। তিনি তার ক্ষমতার এমন সীমাবদ্ধতা আবিষ্কার করেছেন, যা তিনি ২৮শে ফেব্রুয়ারি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ অভিযান শুরু করার সময় কল্পনাও করতে পারেননি।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা ও দেশটির সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে ট্রাম্প বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করেছিলেন। তবে পাঁচ মাস পরও তার ঘোষিত লক্ষ্যগুলো প্রায় পূরণ হয়নি। ব্যাপক সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেও ইরানকে কাঙ্ক্ষিতভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি তিনি। ফলে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযানে যাওয়ার বিষয়ে ট্রাম্প এখন দ্বিধায় রয়েছেন।
যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, আর হরমুজ প্রণালিসহ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিনের হামলা ও পাল্টা হামলার কারণে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থার মজুত কমে গেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরেও যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। একদিকে প্রেসিডেন্ট ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করার কথা বলছেন, অন্যদিকে তার রাজনৈতিক মিত্রদের একটি অংশ দ্রুত সংঘাত শেষ করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
সম্প্রতি সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি এবং কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কেও ট্রাম্পের আকস্মিক সিদ্ধান্ত বিভ্রান্তি তৈরি করেছে।
প্রথমে ট্রাম্পের জ্বালানিমন্ত্রী সৌদি আরবের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক শক্তি সহযোগিতা নিয়ে একটি ঐতিহাসিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। ১৮ মাস ধরে আলোচনার পর হওয়া এই চুক্তিকে ট্রাম্প ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই প্রশ্নবিদ্ধ করেন। তিনি ঘোষণা দেন, সৌদি আরব যদি আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ না দেয় এবং ইসরাইলকে স্বীকৃতি না দেয়, তাহলে চুক্তিটি কার্যকর হবে না।
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে অভিজ্ঞ সাবেক মার্কিন কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ‘ট্রাম্প আবারো সৌদিদের বিচ্ছিন্ন করেছেন, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে খুশি করেছেন।’
তিনি কানাডার সঙ্গে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের গর্ডি হাও আন্তর্জাতিক সেতু প্রকল্পের মূল চুক্তিও বাতিল ঘোষণা করেছেন।
দীর্ঘ আলোচনার পর হওয়া কিছু চুক্তি তিনি হঠাৎ পরিবর্তন বা বাতিলের হুমকি দেওয়ায় মিত্র দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে।
দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ট্রাম্পের ক্ষোভ ও হতাশার প্রভাব পড়ছে। রিপাবলিকানরা ক্যাপিটলে একটি বড় আবাসন বিল স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল, যা ছিল বিরল দ্বিদলীয় সমঝোতার ফল এবং হোয়াইট হাউসও একে স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ট্রাম্প এতে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানান।
ওয়াশিংটন পোস্ট ও ইপসোসের জরিপ অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ পরিচালনার বিষয়ে ট্রাম্পের ভূমিকার প্রতি মাত্র ২৯ শতাংশ মার্কিন সমর্থন জানিয়েছেন।
গত সপ্তাহে প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন বলেন, ‘আমাদের এটি শেষ করতে হবে।’ ট্রাম্পের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সমর্থকদের মধ্যেও এখন যুদ্ধ শেষ করার দাবি বাড়ছে।
কিন্তু প্রেসিডেন্টের হাতে ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনের স্পষ্ট কোনো পথ নেই। বিজয়ের কোনো সুস্পষ্ট কৌশল ছাড়াই যুদ্ধে প্রবেশ করার পর এখন সম্মানজনকভাবে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন তিনি ।
বর্তমানে ট্রাম্পের সামনে মূলত তিনটি বিকল্প রয়েছে—ইরানে আরও বড় সামরিক হামলা চালানো, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরো কঠোর করা, অথবা বিজয় ঘোষণা করে সংঘাত থেকে সরে আসা। তবে প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গেই রয়েছে বড় ধরনের ঝুঁকি।
সামরিক অভিযান বাড়ালে বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। নিষেধাজ্ঞার পথ বেছে নিলে দ্রুত ফল পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। আর সংঘাত থেকে সরে এলে ট্রাম্পের আগের ঘোষিত লক্ষ্য পূরণ না হওয়ার অভিযোগ উঠতে পারে।
জানুয়ারিতে ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন তার ক্ষমতার কোনো সীমা নেই। কিন্তু বাস্তবে ট্রাম্পের ধারণার চেয়েও তার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা অনেক বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের জন্য এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে তার শক্তি প্রয়োগের ক্ষমতার পাশাপাশি বাস্তব সীমাবদ্ধতাগুলোও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সংঘাতের শেষ কীভাবে হবে, তা এখন তার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
আরএ
source: Daily Amar Desh







