দ.কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক মহড়া কমাতে বলেছেন ট্রাম্প, কিমকে ঘিরে নতুন কৌশল?

দীর্ঘদিনের মিত্র দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া ‘উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো’র নির্দেশ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মহড়ার ব্যয় বেশি এবং ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন অভিযানে দক্ষিণ কোরিয়ার অংশ না নেওয়ার কথা তুলে ধরে এ নির্দেশ দেন তিনি।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, রোববার ট্রাম্প এই নির্দেশের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে নিজের ‘খুব ভালো সম্পর্কে’র কথাও উল্লেখ করেন। ট্রাম্পের ইঙ্গিত, পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করাও তার এ সিদ্ধান্তের একটি লক্ষ্য হতে পারে।
ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে এসব সামরিক মহড়া শুধু ব্যয়বহুলই নয়, উত্তর কোরিয়ার মতো এমন একটি দেশের কাছেও ‘সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত ও বৈরী’ বার্তা পাঠায়। ট্রাম্প বলেছেন, তার প্রেসিডেন্ট থাকার সময়ে কিম যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ‘হুমকিমূলক নয় এবং সম্মানজনক’ আচরণ করেছে। মহড়া শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগেই তিনি এই মন্তব্য করেন।
তবে ট্রাম্পের নির্দেশের পরও বার্ষিক ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ যৌথ সামরিক মহড়া নির্ধারিত সময়েই শুরু হয়েছে। সোমবার দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ জানিয়েছে, মহড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী শুরু হয়েছে এবং এটি ২৭ আগস্ট পর্যন্ত চলবে। এতে প্রায় ১৮ হাজার দক্ষিণ কোরীয় সেনা অংশ নিচ্ছেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, তারা ট্রাম্পের বক্তব্য পর্যালোচনা করছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ও সিউলের যৌথ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং সামরিক মহড়া নিয়ে সমন্বয় অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে তারা।
উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে ট্রাম্প ও কিমের ব্যক্তিগত সম্পর্ক যদি দুই দেশের মধ্যে অর্থবহ সংলাপের সুযোগ তৈরি করে, তাহলে তা কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য কাজে লাগানো উচিত বলেও আশা প্রকাশ করেছে সিউল।
ট্রাম্প অবশ্য তার বক্তব্যে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ংয়ের সঙ্গে ইরান প্রসঙ্গও টেনে এনেছেন। তিনি দাবি করেন, সম্প্রতি তিনি লিকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধের মার্কিন প্রচেষ্টায় যোগ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চেয়েছিলেন এবং দক্ষিণ কোরিয়া তাকে ‘না, ধন্যবাদ’ বলেছে। তবে সিউল বলেছে, ইরানসংক্রান্ত সম্ভাব্য সামরিক সহায়তা নিয়ে তারা আলোচনা করছে এবং কোরীয় উপদ্বীপে নিজেদের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি ও দেশের আইনি প্রক্রিয়াও বিবেচনায় নিচ্ছে।
ট্রাম্পের সামরিক মহড়া কমানোর সিদ্ধান্তকে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের ওঠানামা করা সম্পর্কের প্রেক্ষাপটেও দেখা হচ্ছে। পিয়ংইয়ং বরাবরই যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়াকে আক্রমণের প্রস্তুতি হিসেবে বর্ণনা করে এসেছে। গত সপ্তাহেও উত্তর কোরিয়া পূর্ব উপকূল থেকে জাপান সাগরের দিকে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এর কয়েক দিন আগেও দেশটি একই ধরনের স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছিল।
তবে মহড়া কমানোর মধ্য দিয়ে ট্রাম্প কিমের সঙ্গে নতুন করে কূটনৈতিক উদ্যোগের পথ তৈরি করতে চাইছেন কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্টিমসন সেন্টারের থার্টি এইট নর্থ কর্মসূচির প্রধান জেনি টাউন মনে করেন, এ সিদ্ধান্ত পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে কূটনৈতিক সুযোগ তৈরির বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরনটি এতটাই আকস্মিক যে উত্তর কোরিয়ার ওপর এর বড় কোনো প্রভাব পড়বে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের কোরিয়া কর্মসূচির প্রধান ভিক্টর চাও মনে করেন, ট্রাম্পের আরেকটি লক্ষ্য হতে পারে উত্তর কোরিয়ার ওপর প্রভাব বাড়ানো। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠা পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে মস্কোর সম্পর্কও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
চাও বলেন, উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে সেনা পাঠিয়েছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেছেন। ইউক্রেনও সম্প্রতি জানিয়েছে, জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলে রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় উত্তর কোরিয়ার তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।
অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ রয়েছে। মার্কিন নর্দার্ন কমান্ডের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল জোসেফ জ্যারার্ড গত সপ্তাহে সতর্ক করে বলেছেন, উত্তর কোরিয়া এমন আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছে, যেগুলোর পর্যাপ্ত বুস্ট ক্ষমতা রয়েছে এবং যা উত্তর আমেরিকার যেকোনো স্থানে পারমাণবিক অস্ত্র পৌঁছে দিতে পারে।
ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পেছনে অবশ্য অর্থনৈতিক হিসাবও রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রায় ২৮ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা মোতায়েনের ব্যয় বহনে সিউলকে দীর্ঘদিন ধরেই আরও বেশি অবদান রাখার জন্য চাপ দিয়ে আসছেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নিয়েও টানাপোড়েন রয়েছে।
গত বছর একটি বাণিজ্য চুক্তির আওতায় মার্কিন গাড়ির ওপর ট্রাম্পের শুল্ক কমানোর বিনিময়ে দক্ষিণ কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রে ৩৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে সেই বিনিয়োগের বিস্তারিত পরিকল্পনা এখনও প্রকাশ করেনি সিউল।
ফলে সামরিক মহড়া কমানোর নির্দেশকে শুধু ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে নতুন কূটনৈতিক যোগাযোগ, রাশিয়া-পিয়ংইয়ং ঘনিষ্ঠতা মোকাবিলা, ইরান ইস্যুতে দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থান এবং ওয়াশিংটন-সিউল অর্থনৈতিক টানাপোড়েন— সবকিছুর যোগসূত্র রয়েছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে আপাতত মহড়া নির্ধারিত সময়েই শুরু হওয়ায় ট্রাম্পের নির্দেশ বাস্তবে যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় কতটা পরিবর্তন আনবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
source: Rajneete







