News

৭৯ বছরেও পৈতৃক জমিতে যেতে পারছে না শতাধিক বাংলাদেশি কৃষক

কাগজে-কলমে জমির সব বৈধ দলিল ও খতিয়ান আছে, কিন্তু সীমান্তে গিয়ে নিজস্ব পৈতৃক ভিটেমাটিতে পা রাখাতে পারছেন না শত শত বাংলাদেশি কৃষক। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর দীর্ঘ ৭৯ বছর পার হলেও ফেনীর পরশুরাম সীমান্তে মুহুরি নদীর বুক চিরে জেগে ওঠা চরের ভূখণ্ডের হিসাব মেলেনি।

সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, ফেনীর পরশুরাম সীমান্তে ১৯৪৭ সালের পর থেকে চলে আসছে বিরোধ। এর মধ্যে হয়েছে ১৯৭৪ সালের ইন্দিরা-মুজিব স্থলসীমান্ত চুক্তি, ২০১১ সালের প্রটোকল, দুই দেশের একাধিক যৌথ জরিপ এবং সীমারেখা চিহ্নিত করতে বসানো হয়েছে ৪৪টি অস্থায়ী কাঠের খুঁটি। তবে এখনো হয়নি স্থায়ী সীমান্ত পিলার নির্মাণ।

ফলে কাগজে জমির মালিকানা থাকলেও মাঠে ভোগদখল নেই অনেক বাংলাদেশি কৃষকের। এছাড়া সীমান্ত নিরাপত্তা, নদীর গতিপথ, দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও রয়েছে জটিল সমীকরণ। এই দীর্ঘস্থায়ী জটিলতার অবসান ঘটাতে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী স্থানীয় বাসিন্দারা।

বিরোধের মূল উৎস ও ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তন

রেডক্লিফ লাইনে ১৯৪৭ সালে মুহুরি নদীর ‘মধ্যস্রোত’কে আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু আশির দশকে নদীটি তার স্বাভাবিক গতিপথ বদলে পশ্চিমে সরে গেলে পুরোনো নদী খাদ শুকিয়ে নতুন চর জেগে ওঠে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সীমান্ত বর্তমান নদী খাদ অনুসরণ করবে, নাকি পুরোনো সীমারেখা বহাল থাকবে— এই আইনি ও কৌশলগত বিতর্কেই বিরোধটি স্থায়ী রূপ নেয়।

সরকারি ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ-ত্রিপুরা সীমান্তের মোট ৮৭৪ কিলোমিটারের মধ্যে পরশুরামের এই ২ কিলোমিটার অংশ ছাড়া বাকি সীমানা চিহ্নিতকরণ শেষ হয়েছে। সরকারি ও গণমাধ্যমের তথ্যে মুহুরির চরের আয়তন ৯২ দশমিক ১৪ একর বলা হলেও এর দখল নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ২০১১ সালের প্রতিবেদনে এই ৯২ দশমিক ১৪ একরের মধ্যে বাংলাদেশের অংশ ৭১ দশমিক ৯৪ একর এবং ভারতের অংশ ২০ দশমিক ২০ একর উল্লেখ করা হয়। তবে স্থানীয় সূত্র মতে, চরের প্রায় ৩১ দশমিক ১৮ একর বাংলাদেশের দখলে, ৮ একর ভারতের দখলে এবং বাকি ৫২ দশমিক ৯৬ একর ভূমি অমীমাংসিত রয়েছে।

যৌথ জরিপ ও পিলারের অনিশ্চয়তা

২০১০-১১ জরিপ মৌসুমে মুহুরি নদী এলাকায় যৌথ জরিপ করে একটি ইনডেক্স ম্যাপ তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৩-১৪ মৌসুমে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ জরিপ দল পরশুরামের মুহুরির চরে ৪৪টি কাঠের খুঁটি স্থাপন করে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে।

তবে কাঠ বা বাঁশের খুঁটি স্থায়ী সীমানা চিহ্ন না হওয়ায় তা নষ্ট হয়ে গেছে এবং লোহার পাতের নম্বরও বিবর্ণ হয়ে গেছে। ২০২০ সালে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে স্থায়ী কংক্রিট পিলার স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হলেও ভারতের সাড়াশব্দ মেলেনি। জানা যায়, ২০১৪ সালের যৌথ জরিপের পর ত্রিপুরা রাজ্য সরকারের অভ্যন্তরীণ ও রাজনৈতিক আপত্তির কারণে ভারত সরকার চূড়ান্তভাবে স্থায়ী সীমানা পিলার নির্মাণে অপারগতা প্রকাশ করে।

রক্তাক্ত ইতিহাস ও সীমান্ত অপরাধের ঝুঁকি

মুহুরির চর শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, স্থানীয়দের জন্য বয়ে এনেছে সংঘাতের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস। স্থানীয় বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম বলেন, সিএস ও বিএস খতিয়ান থাকা সত্ত্বেও আমরা জমির মালিক হয়েও জমিতে যেতে পারছি না। ভারতের একতরফা সিদ্ধান্তের কারণে সেখানে দখলে যেতে পারছি না। ১৯৯৯ সালে নুরুল আলম নামে এক বাংলাদেশি কৃষক নিজের জমিতে ঘাস কাটতে গেলে বিএসএফের গুলিতে নিহত হন। এরপর থেকে মুহুরির চরের জমিতে বাংলাদেশি কৃষকদের যাতায়াত ও চাষাবাদ আরও কঠিন হয়ে পড়ে। সীমান্তের এই চর একসময় দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সংঘাতের ক্ষেত্রও ছিল।

১৯৭৯ থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) ও বিএসএফের মধ্যে মোট ৫৮ দিন গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটে। বর্তমানে স্থায়ী সীমান্ত চিহ্ন না থাকায় ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে, যা সীমান্তে চোরাচালান ও অপরাধ বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করছে।

এদিকে আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর ফেনীর পরশুরামে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফরকে ঘিরে নতুন করে আশার আলো দেখছেন মুহুরির চরের জমি হারানো বাংলাদেশি কৃষকেরা। সম্প্রতি একনেকে অনুমোদন পাওয়া প্রায় ১ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে মুহুরি-কহুয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের উদ্বোধনের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধপূর্ণ মুহুরির চরের জমির মালিকানা ও দখল সমস্যার সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চান তারা।

কৃষকদের প্রত্যাশা ও জেলা প্রশাসনের বক্তব্য

মির্জানগর ইউনিয়নের নিজ কালিকাপুর, উত্তর কাউতলী ও ফকিরের খিল গ্রামের মো. ইউনুছ, আবদুল মালেক, ফকির নূরনবীসহ শতাধিক কৃষকের জমি মুহুরির চরে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে জমিগুলোতে চাষাবাদ করতে না পারায় তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাদের দাবি, বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি পরশুরাম-সুবার বাজার সড়কে মুহুরি সেতু নির্মাণ এবং মুহুরির চরের বাংলাদেশি কৃষকদের জমি উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হলে এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান হবে।

স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের বাধার কারণে বছরের পর বছর তারা নিজেদের জমিতে যেতে ও চাষাবাদ করতে পারছেন না। তাদের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর পরশুরাম সফরকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের এ সীমান্ত ও জমিসংক্রান্ত বিরোধের একটি স্থায়ী সমাধানের যদি উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে একদিকে সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের নিরাপত্তা ও স্বস্তি ফিরবে, অন্যদিকে নিজেদের জমিতে চাষাবাদের সুযোগ পেয়ে জীবিকা ফিরে পাবেন শতাধিক কৃষক।

নিজ কালিকাপুর গ্রামের বাসিন্দা ও উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি আলমগীর মজুমদার এশিয়া পোস্টকে বলেন, মুহুরির চরে শতাধিক বাংলাদেশি কৃষকের জমি রয়েছে। একসময় সেখানে অনেকের ভিটেমাটিও ছিল। এখন সেগুলো ভারতের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ১৯৪৭ সাল থেকে চরের জমি নিয়ে বিরোধের অবসান হয়নি। বাংলাদেশি কৃষকদের জমিগুলো উদ্ধার করে চাষাবাদের আওতায় আনা গেলে অনেকে নতুন করে জীবিকা ফিরে পাবেন। অনেকের রুটি-রুজির ব্যবস্থা হবে। প্রধানমন্ত্রী উদ্যোগ নিয়ে বিষয়টির সমাধান করলে কৃষকরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন।

উত্তর কাউতলী গ্রামের ফকির নুর মোস্তফাদের পরিবারের প্রায় ১০ একর জমি রয়েছে মুহুরির চরে। বিএসএফের বাধার কারণে দীর্ঘদিন ধরে তারা এসব জমিতে যেতে পারছেন না। তিনি বলেন, আমাদের ভাইদের বেশিরভাগ জমি মুহুরির চরের মধ্যে। ৩০ থেকে ৪০ বছর ধরে এসব জমিতে চাষাবাদ করতে পারছি না।

নিজ কালিকাপুর গ্রামের মহিউদ্দিন ফোরকানের পৈতৃক প্রায় দুই একর জমিও রয়েছে মুহুরির চরে। জমির খতিয়ানসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকলেও ভারতের আধিপত্যের কারণে তিনি সেখানে যেতে বা জমি ভোগদখল করতে পারছেন না। তিনি বলেন, সীমান্ত বিরোধের স্থায়ী সমাধানের পাশাপাশি আমাদের জমিতে নিরাপদে যাতায়াত ও চাষাবাদের অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারকে ভূমিকা রাখার দাবি জানাই।

এ বিষয়ে ফেনী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহবুবুল করিম এশিয়া পোস্টকে জানান, মুহুরি চরের বিরোধপূর্ণ জায়গার মালিকানা নিয়ে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে তা আসলে দীর্ঘদিনের। এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা লিখিতভাবে আবেদন জানালে জেলা প্রশাসন বিষয়টি খতিয়ে দেখে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলে অবহিত করবে।

source: Asia Post

Back to top button