স্তন ক্যানসারের রেডিওথেরাপি: কম সময়ে, কম খরচে, আরও বেশি জীবন বাঁচানোর সুযোগ

বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩৬ জন নারী স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং প্রায় ১৭ জন মৃত্যুবরণ করছেন। গ্লোবোক্যান ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর প্রায় ১৩ হাজার নারী স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন। অথচ সঠিক সময়ে যথাযথ চিকিৎসা পেলে অনেক রোগীই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারেন।
স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি, হরমোন থেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি, ইমিউনোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে অস্ত্রোপচারের পর অনেক রোগীর ক্যানসার পুনরায় ফিরে আসার ঝুঁকি কমাতে রেডিওথেরাপি অপরিহার্য।
কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় রেডিওথেরাপি গ্রহণ এখনো অনেক নারীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো মূলত ঢাকা ও কয়েকটি বড় শহরে কেন্দ্রীভূত। ফলে দূরবর্তী অঞ্চলের রোগীদের যাতায়াত, থাকা-খাওয়া ও কর্মদিবস হারানোর কারণে বিপুল আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হয়।
পাঁচ সপ্তাহের চিকিৎসা এখন এক সপ্তাহেও সম্ভবঃ
আগে স্তন ক্যানসারের রেডিওথেরাপি সাধারণত পাঁচ সপ্তাহে ২৫টি সেশনে দেওয়া হতো। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিতে অনেক রোগীর ক্ষেত্রে তিন সপ্তাহে ১৫টি সেশন এবং নির্বাচিত রোগীদের ক্ষেত্রে মাত্র এক সপ্তাহে পাঁচটি সেশনেই চিকিৎসা সম্পন্ন করা সম্ভব।
আন্তর্জাতিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ের স্তন ক্যানসারের উপযুক্ত রোগীদের ক্ষেত্রে পাঁচ সেশনের রেডিওথেরাপি তিন সপ্তাহের চিকিৎসার মতোই কার্যকর।
ভাবুন, রংপুর বা বরিশাল থেকে আসা একজন নারী পাঁচ সপ্তাহের পরিবর্তে মাত্র এক সপ্তাহে চিকিৎসা শেষ করে বাড়ি ফিরতে পারছেন। এতে তাঁর যাতায়াত, থাকা-খাওয়ার খরচ ও পারিবারিক দুর্ভোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।
তবে পাঁচ সেশনের চিকিৎসা সবার জন্য উপযুক্ত নয়। রোগের অবস্থা অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনা কতটা?
ধরা যাক, একটি হাসপাতালে ৩০০ জন রোগীকে ২৫টি করে সেশন দিলে মোট ৭ হাজার ৫০০টি সেশন প্রয়োজন। সবাই ১৫ সেশনের উপযুক্ত হলে প্রয়োজন হবে ৪ হাজার ৫০০টি, আর পাঁচ সেশনের উপযুক্ত হলে মাত্র ১ হাজার ৫০০টি।
এটি উদাহরণভিত্তিক হিসাব। বাস্তবে রোগীভেদে চিকিৎসার প্রয়োজন ভিন্ন। তবে উপযুক্ত রোগীদের কম সেশনে চিকিৎসা দিলে একই মেশিন ব্যবহার করে আরও বেশি রোগীকে সেবা দেওয়া সম্ভব।
এখন কী করা প্রয়োজন?
প্রথমত, আন্তর্জাতিক গবেষণার ভিত্তিতে কম সেশনের রেডিওথেরাপির জাতীয় চিকিৎসা গাইডলাইন প্রণয়ন করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ঢাকার বাইরে আঞ্চলিক ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
তৃতীয়ত, সাশ্রয়ী চিকিৎসা প্যাকেজ, সরকারি ভর্তুকি ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসার সুযোগ বাড়াতে হবে।
চতুর্থত, সার্জন ও ক্যানসার বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সমন্বয় এবং রোগী রেফারেলব্যবস্থা উন্নত করতে হবে, যাতে চিকিৎসা শুরুতে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব না হয়।
পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে রেডিওথেরাপির চাহিদা, প্রাপ্যতা ও চিকিৎসায় বিলম্বের তথ্য সংগ্রহ জরুরি।
প্রয়োজন বিদ্যমান সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারঃ
বাংলাদেশে আরও রেডিওথেরাপি মেশিন, প্রশিক্ষিত জনবল ও চিকিৎসাকেন্দ্র প্রয়োজন। তবে নতুন অবকাঠামো তৈরির পাশাপাশি বিদ্যমান সম্পদের দক্ষ ব্যবহারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কম সেশনের রেডিওথেরাপি মানে কম কার্যকর চিকিৎসা নয়; বরং উপযুক্ত রোগীদের জন্য সমান কার্যকর চিকিৎসা আরও কম সময়ে সম্পন্ন করা।
একজন নারী যদি এক সপ্তাহেই সমান কার্যকর চিকিৎসা পেতে পারেন, তাহলে তাঁকে অপ্রয়োজনে পাঁচ সপ্তাহ পরিবার থেকে দূরে থাকতে হবে কেন?
ক্যানসার চিকিৎসাব্যবস্থার সফলতা শুধু হাসপাতাল বা মেশিনের সংখ্যা দিয়ে নয়, বরং কতজন রোগী সময়মতো, কার্যকর ও সাশ্রয়ী চিকিৎসা পাচ্ছেন, তা দিয়ে বিচার করা উচিত।
কম সময়ে স্তন ক্যানসারের রেডিওথেরাপি বাংলাদেশে আরও সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও রোগীবান্ধব ক্যানসার চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তোলার একটি বাস্তবসম্মত সুযোগ।
লেখক: সিনিয়র কনসালটেন্ট, রেডিয়েশন অনকোলজি, এভারকেয়ার হাসপাতাল, ঢাকা
source: Asia Post







