News

নতুন অস্ত্র-বিস্তৃত হামলা— বিশ্বকে ‘অবাক করে দিতে’ প্রস্তুতি ইরানের

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আবারও যুদ্ধ শুরু হতে পারে— এমন আশঙ্কায় সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করছে ইরান। দেশটির সামরিক কর্মকর্তারা দাবি করছেন, নতুন অস্ত্রের বড় মজুত গড়ে তোলা হয়েছে, যা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো সম্ভব। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রয়েছে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি অবকাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ডেটা সেন্টার এবং সমুদ্রতলের ইন্টারনেট কেবল।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘বিশ্ব অবাক হয়ে যাবে।’ এমন কিছু নতুন লক্ষ্যবস্তু রয়েছে, যেখানে এখনো হামলা চালানো হয়নি বলেও জানান তিনি।

গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রায় ৯ পেরিয়ে গেলেও সংঘাতের স্থায়ী সমাধান মেলেনি। দুপক্ষই নিজেদের বিজয়ী দাবি করছে। তেহরানের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক হামলার পরও ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো টিকে আছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন দাবি করছে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও শাসনব্যবস্থাকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলা হয়েছে।

এ অবস্থায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। প্রকাশ্যে তিনি মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নতুন সামরিক পদক্ষেপ না নেওয়ার কথা বললেও তার প্রশাসনের কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত আলোচনায় জানিয়েছেন, সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত কি না, তা তারা নিশ্চিত নন। আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের আগে বা পরে আবারও যুদ্ধ শুরু হতে পারে— এমন আশঙ্কা থেকেই ইরান প্রস্তুতি নিচ্ছে।

নতুন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত বিপ্লবী গার্ড

ইরানের সামরিক নেতৃত্বের বক্তব্যে এবার আগের তুলনায় আরও আক্রমণাত্মক অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তেহরান শুধু সম্ভাব্য মার্কিন হামলা প্রতিহত করার কথা বলছে না, বরং নতুন করে হামলার শিকার হওয়ার আগেই পালটা আঘাত হানার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছে না।

মোহেবি বলেছেন, যুদ্ধ শেষ হয়নি এবং ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।

গত সপ্তাহে বিপ্লবী গার্ডের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলোতে দেশ জুড়ে সামরিক মহড়ার খবর প্রকাশ করা হয়। এতে একসঙ্গে ৩০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের কথাও জানানো হয়। এসব মহড়ার মাধ্যমে ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও একযোগে হামলা চালানোর প্রস্তুতি তুলে ধরতে চাইছে।

ইরানের সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা শুরু করলে তার জবাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি সামরিক স্থাপনায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। সংঘাতের পরিধি বাড়িয়ে দেওয়া হতে পারে, যাতে নতুন যুদ্ধের মূল্য ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের আরও বেশি দিতে হয়।

ইরানের সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা আলিরেজা শেখ শনিবার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘মাদার অব অল বম্ব’ নামে পরিচিত শক্তিশালী বোমা ব্যবহারের হুমকি মূলত ইরানের জনগণকে ভয় দেখানোর প্রচেষ্টা। তার ভাষায়, ‘ইরানের জনগণই মাদার অব অল বম্ব।’

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তাদের বরাতে সিএনএন জানিয়েছে, ট্রাম্পের নির্দেশে যুদ্ধ পুনরায় শুরু হলে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলার পরিকল্পনা তৈরি করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। সম্ভাব্য অস্ত্রের তালিকায় রয়েছে জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট বোমা বা ‘মোয়াব’। এটি যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারের সবচেয়ে বড় অ-পারমাণবিক বোমা। এ বোমার ব্যবহার সংঘাতকে আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।

সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে ইউরোপের মার্কিন ঘাঁটি

ইরানের নতুন সামরিক হুমকির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— যুদ্ধের পরিধি মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। তেহরান যদি নতুন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইউরোপে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সেখানে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক নীতিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান দ্য ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক ফারজিন নাদিমির মতে, এমন পরিস্থিতিতে ইংল্যান্ডে অবস্থিত মার্কিন বিমানঘাঁটি কিংবা জার্মানির রামস্টাইন সামরিক স্থাপনা সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। রামস্টাইন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে তাদের সবচেয়ে বড় সামরিক স্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ রসদ সরবরাহকেন্দ্র।

তবে নাদিমি মনে করেন, ইরান এমন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বিবেচনা করবে সংঘাতের একেবারে চরম পর্যায়ে পৌঁছালে।

চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাজ্যে মোতায়েন থাকা যুক্তরাষ্ট্রের দূরপাল্লার বোমারু বিমানগুলো ফিরিয়ে নেওয়া হয়। মার্কিন কর্মকর্তারা এর পেছনে নতুন একটি অনির্দিষ্ট হুমকির কথা উল্লেখ করেছেন। এর কয়েক দিন আগে যুক্তরাজ্য সরকার ওই বিমানগুলো যে ঘাঁটিতে অবস্থান করছিল, সেখানে হামলার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে। অভিযোগটির সঙ্গে ইরানের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও তদন্তের আওতায় এসেছে।

নাদিমির মতে, ভবিষ্যতে ইরান আরও উন্নত প্রযুক্তির ড্রোন ব্যবহার করতে পারে। ক্যামেরা ও ডেটা সংযোগযুক্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর এসব ড্রোন পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করে গতিপথ ও গতি পরিবর্তন করতে পারবে। এতে সেগুলোকে ইলেকট্রনিক জ্যামিং ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিহত করা কঠিন হতে পারে।

তবে এ ধরনের সমন্বিত ড্রোন সক্ষমতা ইরান এখনো প্রদর্শন করেনি। অতীতে এমন প্রযুক্তি তৈরির বিষয়ে আলোচনা করলেও তা কতটা কার্যকর, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই।

এ ছাড়া শব্দের গতির চেয়ে দ্রুতগতির ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা এবং সামরিক যোগাযোগ ও নজরদারিতে ব্যবহৃত স্যাটেলাইটের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটানোর সক্ষমতা বাড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে বলে মনে করেন নাদিমি।

মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ও প্রযুক্তি অবকাঠামোও ঝুঁকিতে

ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, সামরিক কমান্ডার, শীর্ষ কর্মকর্তা ও বেসামরিক মানুষ নিহত হন। নিহতদের মধ্যে শিশুও ছিল। এরপর ইরানের পালটা হামলার বড় অংশ গিয়ে পড়ে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর ওপর, যাদের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সহযোগিতার অভিযোগ এনেছিল তেহরান।

ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে বাধা তৈরি হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। একই সঙ্গে আরব দেশগুলোর বেসামরিক অবকাঠামোতেও হামলা চালানো হয়।

দুবাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র হামলার লক্ষ্য হয়, কুয়েতের পানি শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কয়েকটি দেশে ডেটা সেন্টারে হামলার কারণে ব্যাংকিং সেবায় বিঘ্ন ঘটে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইরান দেশটির ওপর আড়াই হাজারের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে, ইসরায়েলসহ অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় যা বেশি। আমিরাতের দাবি, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এসব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের প্রায় সবই প্রতিহত করেছে।

গত সপ্তাহে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান মোহসেন রেজাই হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন সম্পদও ইরানের পালটা আঘাতের লক্ষ্য হবে। এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাও রয়েছে।

রেজাইয়ের ভাষায়, নতুন যুদ্ধ শুরু হলে এ অঞ্চলের অসংখ্য সমুদ্রতলের ইন্টারনেট কেবল, ডেটা সেন্টার, এআই স্থাপনা ও অন্যান্য অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

এই হুমকি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আধুনিক অর্থনীতি শুধু তেলক্ষেত্র ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগ, আর্থিক লেনদেন, ক্লাউড কম্পিউটিং ও এআই প্রযুক্তির কার্যক্রমও নির্দিষ্ট কিছু অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে। এসব স্থাপনায় হামলা হলে সামরিক সংঘাতের প্রভাব সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রস্তুতি বাড়ছে

নতুন করে যুদ্ধ শুরু হোক, তা চায় না সংযুক্ত আরব আমিরাত। তবে দেশটির কর্মকর্তারা বলছেন, ফেব্রুয়ারির তুলনায় এবার সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় তারা অনেক বেশি প্রস্তুত।

আমিরাতের ফেডারেল ন্যাশনাল কাউন্সিলের প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান আলী আল-নুয়াইমি বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, তাদের দেশ যুদ্ধ চায় না। তবে আজ যুদ্ধ শুরু হলেও ২৮ ফেব্রুয়ারির তুলনায় যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় তারা ভালো অবস্থানে থাকবে। জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণকে রক্ষার জন্য যা প্রয়োজন, আমিরাত তা-ই করবে।

আল-নুয়াইমির অবস্থান থেকে এটি স্পষ্ট, উপসাগরীয় দেশগুলো নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার শঙ্কাকে একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছে না। তবে তাদের সামরিক প্রস্তুতি বাড়ানো মানেই তারা যুদ্ধে জড়াতে চায়— এমন নয়। বরং ইরানের হামলার হুমকি এবং আগের সংঘাতের অভিজ্ঞতা তাদের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা জোরদার করতে বাধ্য করছে।

সংঘাত এড়ানোর চেষ্টা, ভুল হিসাবেরও ঝুঁকি

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির উপপরিচালক আলী ভায়েজের মতে, ইরানের সামরিক নেতৃত্ব সম্ভাব্য যুদ্ধকে অনিবার্য বলে ধরে নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝাতে চাইছে, নতুন হামলার মূল্য আগের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।

ভায়েজ বলেন, তেহরান স্পষ্ট করতে চায়, পরবর্তী দফার যুদ্ধ আরও বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে, এতে বিধিনিষেধ কম থাকবে এবং প্রাণহানির আশঙ্কাও বাড়বে।

কিন্তু এখানেই রয়েছে বিপদের জায়গা। ইরান যে হুমকিকে যুদ্ধ ঠেকানোর কৌশল হিসেবে দেখছে, ওয়াশিংটন সেটিকে উসকানি হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারে। ফলে যে যুদ্ধ এড়াতে তেহরান হুমকি দিচ্ছে, সেই হুমকিই উলটো নতুন সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে।

এ অবস্থায় দুই পক্ষের সামরিক প্রস্তুতি ও পালটাপালটি হুমকি একদিকে প্রতিপক্ষকে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা, অন্যদিকে ভুল হিসাবের ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। আর সংঘাত আবার শুরু হলে তার প্রভাব শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং হরমুজ প্রণালি, উপসাগরীয় জ্বালানি স্থাপনা, আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক ও ইউরোপে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

সিএনএন অবলম্বনে

source: Rajneete

Back to top button