ক্ষুব্ধ ট্রাম্প, বলছেন জেলেনস্কিই রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতায় বাধা

রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ করতে ইউক্রেনকে চাপ দেওয়ার পরও দেশটির বড় ধরনের ড্রোন হামলায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি অভিযোগ করেছেন, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যুদ্ধ শেষ করতে চান না। তবে জেলেনস্কি এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইউক্রেন নিজেদের পক্ষ থেকে সবকিছু করছে।
এদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও ট্রাম্পকে নিয়ে সম্ভাব্য ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের আলোচনা নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা বলেছেন, এমন বৈঠক পুতিনকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করতে পারে।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অবস্থান, রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পদক্ষেপ এবং ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে বিরোধ— সব মিলিয়ে ওয়াশিংটন ও কিয়েভের সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
জেলেনস্কিকে দুষলেন ট্রাম্প
রোববার রাতে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প বলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে তিনি আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। আলোচনার টেবিল থেকে রাশিয়াকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে— এমন কিছু করতে চান না তিনি। তার দাবি, শান্তি আলোচনায় ‘বড় অগ্রগতি’ হচ্ছে।
একই পোস্টে জেলেনস্কিকে আক্রমণ করে ট্রাম্প লিখেছেন, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ‘এই যুদ্ধ শেষ করতে চান না, সম্ভবত কখনোই চাননি।’
তবে ট্রাম্পের এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন জেলেনস্কি। রোববার মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সিদ্ধান্ত মস্কোর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাকে শক্তিশালী করছে। অথচ যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়া ব্যর্থ হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
জেলেনস্কি আরও বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ চায়নি এবং সম্মানজনক পরিণতির মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শেষ করার জন্য অংশীদারদের প্রতিটি উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে।
ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছে কিয়েভ। রোববার মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে কথা বলেছেন বলে জানান জেলেনস্কি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, দীর্ঘমেয়াদি শান্তি নিশ্চিত করতে ‘নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ’ চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে শক্তিশালী করে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ এগিয়ে নিতে ইউক্রেন সবকিছু করছে বলেও জানান তিনি।
রাশিয়ার তেল স্থাপনায় বড় হামলা
ট্রাম্পের অসন্তোষের পেছনে রয়েছে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনের ধারাবাহিক হামলা। রোববার ভোরে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল টার্মিনালে ড্রোন হামলা চালায় ইউক্রেন। রুশ কর্তৃপক্ষের দাবি, হামলায় এক ব্যক্তি নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছেন। আবাসিক ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওই রাতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইউক্রেনের এক হাজার ১৫টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে তাদের বাহিনী। সেন্ট পিটার্সবার্গ অয়েল টার্মিনালটির বছরে সর্বোচ্চ এক কোটি ২৫ লাখ টন তেল পরিবহন ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা রয়েছে। ইউক্রেনের ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফায়ার পয়েন্ট জানিয়েছে, হামলার পর টার্মিনাল প্রাঙ্গণে আগুন লাগে। একই রাতে শহরের একটি লজিস্টিকস কেন্দ্র এবং রুশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভিকোনতাকতের একটি ডেটা সেন্টারেও হামলার খবর পাওয়া গেছে।
এর আগে রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে ইউক্রেনের হামলাকে ‘লজ্জাজনক’ বলেছিলেন ট্রাম্প। তার প্রশাসন তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানি বাজারের ওপর চাপ কমাতে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে।
এক সপ্তাহ আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন পরস্পরের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে। কিন্তু কিয়েভ ও মস্কো কেউই এমন কোনো চুক্তির কথা স্বীকার করেনি। ইউক্রেন সাময়িকভাবে হামলা বন্ধ রাখলেও রাশিয়া ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনা ও শহরগুলোতে আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে বলে কিয়েভের অভিযোগ।
জেলেনস্কির দাবি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে রাশিয়া ইউক্রেনের জ্বালানি, তেল ও গ্যাস খাতে ৭৬ বার হামলা চালিয়েছে। রোববার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ইউক্রেনজুড়ে ১১ জন নিহত এবং প্রায় ৫০ জন আহত হয়েছেন বলে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা শিথিল, ক্ষোভ রিপাবলিকানদেরও
রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ও যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় ট্রাম্পের অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও সমালোচনা হচ্ছে। শুক্রবার কংগ্রেসের আইনে নির্ধারিত ব্যাপক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে রাশিয়াকে অব্যাহতি দেওয়ার একটি বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করেন তিনি। এর আগে রুশ ডিজেল আমদানির ওপরও নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ট্রাম্পের এ পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন তার নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির কয়েকজন সদস্যও। সমালোচকদের আশঙ্কা, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করলে রাশিয়ার অর্থনৈতিক চাপ কমবে এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য মস্কো বাড়তি সুযোগ পাবে।
জেলেনস্কির বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত পুতিনের যুদ্ধকে আরও শক্তিশালী করছে। অন্যদিকে ট্রাম্পের যুক্তি, রাশিয়াকে আলোচনার টেবিলে ধরে রাখতে হবে, যেন যুদ্ধের অবসান ঘটানো সম্ভব হয়।
এ বিরোধের আরেকটি দিক ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে। জেলেনস্কি জানিয়েছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে স্বল্পপাল্লার ও ড্রোন পরিচালনায় ব্যবহৃত স্টারলিংক ব্যবস্থায় ইউক্রেনের প্রবেশাধিকার এখনো সীমিত রয়েছে। তার দাবি, ইউক্রেনের ড্রোনের গতি সীমিত করার বিষয়ে এটি মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে একটি বার্তা ছিল। তবে ট্রাম্প প্রশাসন স্টারলিংক সেবা সীমিত করার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
পুতিন-জিনপিং-ট্রাম্প বৈঠক নিয়ে নতুন বিতর্ক
এর মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান নিয়ে ট্রাম্প, পুতিন ও শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের আলোচনা নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। উজবেকিস্তান সফররত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সাংবাদিকদের বলেন, বৈঠক নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে তিনি জানেন, তবে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, তা তার জানা নেই।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ সোমবার বলেন, তিন নেতার সম্ভাব্য বৈঠকের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে বৈঠক আয়োজন কিংবা এর আলোচ্যসূচি নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব বা সমঝোতা হয়নি। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য দিতে পারেনি।
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা বলেছেন, এমন বৈঠক পুতিনকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করতে পারে। কিয়েভের আশঙ্কা, ইউক্রেনকে আলোচনার কেন্দ্র থেকে সরিয়ে রেখে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে সমঝোতা হলে তা দেশটির স্বার্থ ও নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে ইউক্রেনের সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা প্রয়োজন। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন যদি মস্কোর ওপর চাপ কমিয়ে কিয়েভের ওপর যুদ্ধ বন্ধের চাপ বাড়ায়, তাহলে ইউক্রেনের দর-কষাকষির অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
অন্যদিকে ট্রাম্পের লক্ষ্য রাশিয়াকে আলোচনার টেবিলে রেখে যুদ্ধের অবসান ঘটানো। কিন্তু জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা, নিষেধাজ্ঞা শিথিল, সামরিক সহায়তা ও গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান নিয়ে ওয়াশিংটন ও কিয়েভের বিরোধ ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। ফলে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার ট্রাম্পের প্রচেষ্টা এখন ইউক্রেনের সঙ্গে তার সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেই এগোচ্ছে।
সিএনএন অবলম্বনে
source: Rajneete







