নেপালে নিহত বেড়ে ৫৩৮, নতুন হ্রদে পানি বাড়ায় ফের বন্যার শঙ্কা
নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৩৮ জনে দাঁড়িয়েছে। এই দুর্যোগে চীনের তিব্বত অংশে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। ফলে নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ৫৪৩ ছাড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ১ হাজার ৫০০ জনের বেশি। তাদের মধ্যে শত শত বিদেশি নাগরিক ও পর্যটক রয়েছেন।
বুধবার (২৬ আগস্ট) হিমালয়ের পার্বত্য এলাকায় হিমবাহ ধসের পর আকস্মিক বন্যা শুরু হয়। এতে নেপালের রাসুয়া জেলা ও চীনের তিব্বত অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার পানির সঙ্গে নেমে আসা কাদা ও ধ্বংসাবশেষে ঘরবাড়ি, সড়ক ও বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় উদ্ধারকাজও কঠিন হয়ে উঠেছে।
আজ শুক্রবার সকালে সাময়িক বিরতির পর নেপালে আবার উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছে। একটি প্রাকৃতিক বাঁধে তৈরি হ্রদের পানি উপচে পড়ায় সকালে কিছু সময়ের জন্য অভিযান বন্ধ রাখতে হয়েছিল। পরে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলে সেনাবাহিনী ও অন্যান্য উদ্ধারকারী দল আবার কাজ শুরু করে।
উদ্ধারকারীরা কাদায় আটকে পড়া মানুষকে বের করে আনছেন। পাশাপাশি হেলিকপ্টারে করে দুর্গম এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। নেপালে এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১৭ জন বিদেশি পর্যটকও রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৮৫ জন ভারতীয়, ১৬ জন চীনা, ৯ জন দক্ষিণ কোরীয়, দুজন ইতালীয় ও দুজন মার্কিন নাগরিক।
নতুন হ্রদে পানি বেড়ে বাড়ছে বন্যার ঝুঁকি
প্রথম দফার বন্যার পর হিমালয়ের উঁচু এলাকায় নতুন একটি হ্রদ তৈরি হয়েছে। হিমবাহ ধসের ফলে তৈরি হওয়া এই হ্রদের পানি উপচে পড়তে শুরু করায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নেপাল ও চীনের কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে সতর্ক করেছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, নতুন হ্রদটি নেপালের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তপথ গ্যিরং বন্দর থেকে ১০ কিলোমিটারের বেশি দূরে। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ হাজার ৯৫০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত।
শুক্রবার তিব্বতের দিকে একটি বাঁধ ভেঙে যাওয়ার খবর পাওয়ার পর নেপালের পুলিশও নতুন সতর্কতা জারি করে। নিরাপত্তাকর্মী, উদ্ধারকারী ও ত্রাণকর্মীদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকতে বলা হয়। প্রয়োজন হলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
তবে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ঘটনাটি নতুন হ্রদ থেকে বন্যার আশঙ্কার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। নেপাল ও চীনের কর্তৃপক্ষ আগেই সতর্ক করে বলেছিল, হ্রদের পানি উপচে পড়ায় আরও পানি ও ধ্বংসাবশেষ নিচের দিকে নেমে আসতে পারে। এ আশঙ্কায় শুক্রবার সকালে দুর্যোগকবলিত এলাকার দিকে যাওয়া উদ্ধারকারী দলগুলোকে সাময়িকভাবে থামিয়ে দেওয়া হয়। সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষকেও নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়।
সুড়ঙ্গে শতাধিক মানুষ, চলছে উদ্ধার
নেপালের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত রাসুয়া জেলার একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সুড়ঙ্গে শতাধিক মানুষ আটকা পড়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের উদ্ধারে সেনাবাহিনীর বিশেষ দল কাজ করছে।

দেশটির সেনাবাহিনীর প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, উদ্ধারকারীরা পুরু কাদার মধ্য দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে সুড়ঙ্গে প্রবেশ করছেন। সেখান থেকে উদ্ধার করা ব্যক্তিদের শরীর ও পোশাক কাদায় পুরোপুরি ঢেকে ছিল। পরে তাদের হেলিকপ্টারে করে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়।
নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত সুড়ঙ্গ থেকে দুজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। ভেতরে আরও কতজন আটকা রয়েছেন, তা জানতে তল্লাশি চলছে। কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম ও বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত দল ব্যবহার করে উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে।
এদিকে রেড ক্রস জানিয়েছে, হিমালয়ের এই ভূমিধস ও বন্যায় ৯০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সংস্থাটি আরও বন্যার আশঙ্কায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। নেপালে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিগুলোর ফেডারেশনের প্রতিনিধি দলের প্রধান ডেভিড ফিশার বলেন, তারা দ্বিতীয় দফার বন্যা নিয়ে ‘খুবই উদ্বিগ্ন’।
তিনি জানান, ভূমিধসের পর তৈরি হওয়া একটি হ্রদের পানি বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসায় ত্রাণসামগ্রী নিয়ে যাওয়া তাদের ট্রাকও আটকে গেছে।
নিখোঁজ ১৫ শতাধিক
নেপালে এখনো ৯৭৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতে নিখোঁজ ৫৫৮ জন। এ ছাড়া নেপালের অংশে প্রায় ১০০ চীনা নাগরিকেরও কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
নিখোঁজদের মধ্যে ভারতীয় ৩২০, মার্কিন ৯০, ইউক্রেনীয় ৫৫, মালয়েশীয় ৫১, অস্ট্রেলীয় ৩৯, ব্রিটিশ ৩৩ এবং কানাডীয় ২৫ নাগরিক রয়েছেন। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, জার্মানি, রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, লাটভিয়া, জাপান, নিউজিল্যান্ড, ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও স্পেনের নাগরিকও নিখোঁজ রয়েছেন। আরও কয়েকটি দেশের নাগরিকেরও নিখোঁজ থাকার খবর পাওয়া গেছে।
দুর্যোগকবলিত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও নতুন করে বন্যার আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। পাহাড়ি এলাকায় পানি ও কাদা আরও নেমে এলে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নতুন এলাকাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান ও এপি
source: Rajneete







