খেলাপি ঋণের পাহাড়, সেই ফজলুল হকই এখন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের উজ্জ্বলতম প্রচার ছিল নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ‘প্লামি ফ্যাশনস লিমিটেড’। ২০১৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল (ইউএসজিবিসি) থেকে রেকর্ড ৯২ পয়েন্ট অর্জন করে বিশ্বের এক নম্বর ‘লিড প্লাটিনাম’ নিট পোশাক কারখানার গৌরব অর্জন করেছিল এটি। তবে পরিবেশ সুরক্ষার সেই চোখঝাঁনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আড়ালে যে এক ভয়াবহ আর্থিক ভঙ্গুরতা গড়ে উঠছিল, তা এতদিন ছিল সবার অজানা।
বিশ্বের সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব সেই কারখানার নামে এবার বের হয়ে এসেছে বিপুল ব্যাংক খেলাপি ঋণের চিত্র। ব্যাংক নথির চাঞ্চল্যকর তথ্য বলছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিবেশ রক্ষার মডেল দেখানো এই প্রতিষ্ঠানটি এবং এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল হক বর্তমানে প্রায় ২৪৫ কোটি টাকার চূড়ান্ত ঋণখেলাপি। ক্ষমতা হারানো প্রথানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্ঠা সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন আইএফআইসি ব্যাংক তাকে এই ঋণ দিয়েছিল।
আরও বিস্ময়ের বিষয় হলো, খেলাপির দায়ে জর্জরিত এই প্রভাবশালী ব্যবসায়ীকেই দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)-এর সংস্কার ও নির্বাচন পরিচালনার গুরুদায়িত্ব দিয়ে নতুন প্রশাসক বানিয়েছে বিএনপি সরকার। ফলে প্রশ্ন উঠেছে সরকারের লক্ষ্য উদ্দেশ্য নিয়েও।
সবুজ কারখানার ২৪৫ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ
আইএফআইসি ব্যাংক তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ব্যাংকটির ফতুল্লা শাখায় থাকা প্লামি ফ্যাশনস লিমিটেডের ঋণ হিসাবটি ২০২৫ সালের ৩০ জুন থেকে ব্যাংকের খাতায় ‘মন্দ বা ক্ষতিজনক’ শ্রেণির খেলাপি তালিকাভুক্ত।
প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল হক, চেয়ারম্যান রেশমা আক্তার এবং অন্য দুই পরিচালকের অনুকূলে অনুমোদিত ঋণসীমা ছিল ১৯১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। কিন্তু বছরের পর বছর বকেয়া পরিশোধ না করায় এবং অনাদায়ী সুদের ভার জমে গত ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ব্যাংকের মূল হিসাব অনুযায়ী বকেয়া স্থিতি দাঁড়ায় ২২৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকার বেশি। এর সঙ্গে অনারোপিত সুদ হিসাব ধরে পূর্ণাঙ্গ সমন্বয় প্রস্তাবনায় ব্যাংকের সর্বমোট পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪৫ কোটি টাকা। বিশাল অঙ্কের এই খেলাপির টাকা আদায়ে আইএফআইসি ব্যাংক ইতোমধ্যে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে।
নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস (এনআই) অ্যাক্টের আওতায় গত ৩১ আগস্ট ২০২৫ তারিখে প্রতিষ্ঠানটিকে চূড়ান্ত আইনি নোটিশ বা লিগ্যাল নোটিশও পাঠিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। তবে গ্রাহক কোনো সাড়া দিচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির কর্মকর্তারা। জানা গেছে, গ্রাহক প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি করে ব্যাংকের পাওনা শোধ করার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে কিনতে ইচ্ছুক গ্রাহকেরা ঋণের অর্ধেক দাম হাকাচ্ছে না।
সম্পত্তি বিক্রি করেও অর্ধেক ঋণ উঠবে না
আইএফআইসি ব্যাংকের নথিতে বন্ধক রাখা সম্পদের যে হিসাব উঠে এসেছে, তা যেকোনো ব্যাংকারের চাকরি কঠিন করে দিয়েছে। ওই নথির মূল্যায়নে দেখা যায়, নারায়ণগঞ্জে প্লামি ফ্যাশনসের ২৩৭.৫০ শতক জমি ও তৈরি কারখানা ভবনের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৪৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। কারখানার আধুনিক যন্ত্রপাতির মূল্যায়িত দর ৭২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
অর্থাৎ, বিশ্বখ্যাত এই গ্রিন ফ্যাক্টরির জমি, কারখানা ও যাবতীয় যন্ত্রপাতি শতভাগ নীলামে বিক্রি করা হলেও ব্যাংক উদ্ধার করতে পারবে সর্বোচ্চ ১২২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। অথচ ঋণের পাহাড় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪৫ কোটি টাকায়। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের হিসেব অনুযায়ী, কারখানার যাবতীয় সম্পদ বেচে দিলেও ঋণের অর্ধেকের বেশি টাকা আদায় করা সম্ভব নয়। ফলে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকিতে পড়েছে ব্যাংকটি।
সংস্কারের কাণ্ডারি নাকি রক্ষকই ভক্ষক?
গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর এফবিসিসিআইয়ের ভেতরে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। সাবেক সভাপতি মাহবুবুল আলমের পদত্যাগের পর একাধিকবার প্রশাসক বসানো হলেও তারা নির্বাচন দিতে ব্যর্থ হন। এই প্রেক্ষাপটে গত ২৬ জুলাই ২০২৬ তারিখে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সাবেক বিকেএমইএ সভাপতি ও আইসিসি বাংলাদেশের পরিচালক মো. ফজলুল হককে ১২০ দিনের জন্য নতুন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয় এবং গত ২ আগস্ট তিনি দায়িত্ব নেন।
দায়িত্ব নেওয়ার পর ফজলুল হক গণমাধ্যমে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছিলেন, সরকার যে দায়িত্ব দিয়েছে তা নিরপেক্ষভাবে পালন করে একটি সুন্দর ও স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের হাতে নেতৃত্ব ফিরিয়ে আনাই তার মূল লক্ষ্য।
তবে তার নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা। তাদের প্রশ্ন, নিজের প্রতিষ্ঠানের শতকোটি টাকার খেলাপি ঋণ ও আইনি নোটিশের বিষয় থাকা একজন ব্যক্তি কীভাবে দেশের প্রধান ব্যবসায়ী সংগঠনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবেন?
সাধারণ ব্যবসায়ীদের দাবি, দেশের শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠনের অভিভাবক পদে এমন কাউকেই থাকা উচিত, যার ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বচ্ছতা প্রশ্নাতীত।
অভিযোগের বিষয়ে এবং ব্যাংক ঋণের আইনি পদক্ষেপ নিয়ে প্লামি ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল হক বলেন, ‘ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অলরেডি এটি সেটেলড করা হয়ে গেছে।’ তবে কি ধরণের সেটেলড হয়েছে এটি নিয়ে আর বিস্তারিত কিছু তিনি বলেননি।
source: Asia Post







