ঋণ করে সৌদি যান সাব্বির, দেনা রেখেই ফিরছেন লাশ হয়ে

‘মা, এখন তো যেতে পারব না। বোনের বিয়ের সময় দেশে তোমাদের কাছে আসব।’ মায়ের সঙ্গে এটাই ছিল সৌদি আরবে থাকা সাব্বিরের শেষ কথাগুলোর একটি। কথা ছিল, উপার্জন করে পরিবারের ঋণ শোধ করবেন, ছোট বোনের বিয়েতে দেশে ফিরবেন। তবে তার কোনোটিই আর হলো না। সৌদি আরবে সোফা তৈরির একটি কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে মারা গেছেন নাটোরের এই যুবক।
নিহত সাব্বির নাটোরের বাসিন্দা জাকির হোসেন ও সাবিনা খাতুনের ছেলে। কৃষক পরিবারের সন্তান সাব্বিরদের নিজেদের তেমন জমিজমা নেই। বাবা-মা ও ছোট বোনকে নিয়ে কষ্টে দিন কাটত তাদের। পরিবারের স্বচ্ছলতা ফেরানোর আশায় প্রায় তিন বছর আগে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধারদেনা করে সৌদি আরবের রিয়াদে যান সাব্বির। সেখানে একটি সোফা তৈরির কারখানায় কাজ করতেন তিনি।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বিদেশ যাওয়ার জন্য সাব্বিরের বড় মা একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়ে তাকে দিয়েছিলেন। এ ছাড়া অন্য আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকেও টাকা ধার করেছিলেন তিনি। বর্তমানে তার পরিবারের প্রায় ৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা ঋণ রয়েছে।
সাব্বিরের বড় মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, সাব্বির খুব ভালো ছেলে ছিল। আমাকে বলেছিল, বড় মা, আমাকে কিছু টাকা ধার দাও। আমি বিদেশ গিয়ে টাকা উপার্জন করে ধীরে ধীরে তোমার টাকা শোধ করে দেব। কিন্তু ছেলেটার সেই আশা পূরণ হলো না। সাব্বিরের নেওয়া ঋণের টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে তাঁরা দুশ্চিন্তায় আছেন।
সন্তান হারিয়ে শোকে মুহ্যমান সাব্বিরের বাবা জাকির হোসেন ও মা সাবিনা খাতুন বলেন, সংসারে স্বচ্ছলতা আনা এবং দারিদ্র্য দূর করার আশায় তাদের ছেলে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কয়েক দিন আগেও মোবাইল ফোনে তার সঙ্গে কথা হয়েছিল। কে জানতেন, সেটিই ছেলের সঙ্গে তাদের শেষ কথা হবে।
পরিবার জানায়, গত রোববার (৯ আগস্ট) সকাল ১০টার দিকে তারা খবর পান সৌদি আরবের একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে সাব্বির মারা গেছেন। এর আগে মোবাইল ফোনে দেশে আসার কথা বললে মাকে তিনি জানিয়েছিলেন, ‘এখন তো যেতে পারব না। বোনের বিয়ের সময় তোমাদের কাছে আসব।’ তবে বোনের বিয়েতে আসার আগেই না ফেরার দেশে চলে গেলেন তিনি।
ভাইকে হারিয়ে সাব্বিরের ছোট বোনও শোকে কাতর। পরিবারের সদস্যরা এখন দ্রুত তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার অপেক্ষায় রয়েছেন।
সাব্বিরের বাবা-মা জানান, ছেলের মৃত্যুতে একদিকে যেমন তারা সন্তান হারানোর শোকে মুহ্যমান, অন্যদিকে তার রেখে যাওয়া প্রায় ৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা ঋণ কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে দিশেহারা। তারা দ্রুত মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা এবং ঋণ পরিশোধে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন।
প্রতিবেশী মেরাজ আলী ও আবুল হোসেনসহ স্থানীয়রা জানান, সাব্বির সবার প্রিয় ছিলেন। এলাকার মানুষের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক ছিল। তার এমন মৃত্যুতে পুরো গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন বলেন, নিহতদের মরদেহ দেশে আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।
source: Asia Post







